এএমডি-ইনটেলকে দেশে আনতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ ও সঠিক নীতি: এনায়েতুর রহমান
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির উচ্চমানের ক্যারিয়ার ও জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য পেছনে ফেলে ২০০৭ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং চারজন প্রকৌশলীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দেশের প্রথম সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন প্রতিষ্ঠান উল্কাসেমি। ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে উল্কাসেমি আজ বিশ্বমানের সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ছয়টি অফিসে আন্তর্জাতিক মানের ডেটা সিকিউরিটি ও প্রটোকল মেনে শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় চিপ ডিজাইন প্রকৌশলীদের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে তিনি অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর প্রভাব এবং বৈশ্বিক বাজারের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে এনটিভি অনলাইনের সাথে কথা বলেছেন উল্কাসেমির সিইও এবং প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সেমিকন্ডাক্টর খাতে কাজের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান কথা বলেছেন বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, ডাটা সিকিউরিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশে এই খাতের অপার সম্ভাবনা নিয়ে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন শাহজালাল রোহান।
এনটিভি অনলাইন: বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টর খাতের বর্তমান অবস্থা এবং এতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
এনায়েতুর রহমান: সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল যে ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্পটি বিশ্বব্যাপী ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হবে। সেই বিশাল সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই আমাদের মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক পর্যায়ে এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে একটি বড় প্রতিযোগিতা চলছে।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে, আমরা প্রায় ১৯ বছর ধরে এই খাতে কাজ করছি এবং আরও নতুন অনেক কোম্পানি এগিয়ে এসেছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মূলত তিনটি ধাপ রয়েছে-ডিজাইন, ফেব্রিকেশন এবং প্যাকেজিং ও টেস্টিং। এর প্রতিটির ইকোসিস্টেম কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। সরকার যদি সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে পারে এবং আমরা আমাদের তরুণ জনবলকে সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে পারি, তবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের একটি শক্ত উপস্থিতি তৈরি হওয়া সম্ভব।
এনটিভি অনলাইন: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন?
এনায়েতুর রহমান: আন্তর্জাতিকভাবে একটি পরিচিতি কিন্তু আমরা ইতোমধ্যে তৈরি করতে পেরেছি। সবাই এখন জানে যে বাংলাদেশেও সেমিকন্ডাক্টরের কাজ হচ্ছে। তবে সত্য বলতে, ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো শীর্ষ দেশগুলোর পর্যায়ে পৌঁছাতে আমাদের এখনো অনেকটা পথ বাকি। বাংলাদেশকে এই খাতের আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনো অনেক বড় বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ নিয়ে আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও পরামর্শ দিচ্ছি। আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ও প্লাস পয়েন্ট হলো-আমাদের দেশের একটি বিশাল ‘ইয়ং পপুলেশন’ বা প্রমিজিং তরুণ প্রজন্ম রয়েছে। যদি যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সঠিক সরকারি সহায়তার মাধ্যমে এদের কাজে লাগানো যায়, তবে বৈশ্বিক এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই দারুণ সফলতা অর্জন করতে পারবে।
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশে নিজস্ব চিপ ডিজাইন এবং উৎপাদনের মতো সক্ষমতা তৈরি করা কতটুকু সম্ভব?
এনায়েতুর রহমান: এটি বেশ জটিল প্রশ্ন। তবে এক কথায় বললে, নিজস্ব চিপ ডিজাইন করা অবশ্যই সম্ভব। আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা ডিজাইন করতেই পারি, কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আমাদের সেই সক্ষমতা এবং টেকনিক্যাল জ্ঞান তৈরি করতে হবে। বিশ্বের খুব কম দেশই নিজস্ব চিপ তৈরি বা ডিজাইন করে থাকে। কারণ এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল করতে বিপুল পরিমাণ প্রোডাকশন ভলিউম এবং প্রচুর দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। আমরা যদি এই গ্লোবাল ইকোসিস্টেমে কাজ করে আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারি, তাহলে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে উঠবে। যেমন-ডিফেন্স বা মিলিটারি সেক্টরে সরকারি অর্থায়নে বিশেষ চিপ ডেভেলপ করা সম্ভব।
তবে বাণিজ্যিকভাবে বড় সফলতা পেতে বিশাল মার্কেট প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আইওটি, কৃষি বা মেডিকেল ডিভাইসের মতো খাতে বড় স্কেলে চিপ ডিজাইনের চেষ্টা করা যেতে পারে, কারণ এগুলোর ব্যবহার ও চাহিদা অনেক বেশি।
এনটিভি অনলাইন: চিপ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অন্যান্য ধাপ যেমন-ফেব্রিকেশন ও প্যাকেজিং টেস্টিং নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান উদ্যোগ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?
এনায়েতুর রহমান: সেমিকন্ডাক্টরের তিনটি ধাপের মধ্যে ‘ফেব্রিকেশন’-এ এখনই সরাসরি ফোকাস করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন, তবে ফেব্রিকেশন-সম্পর্কিত সার্ভিসিং নিয়ে আমরা অলরেডি কাজ করছি। অন্যদিকে, ‘প্যাকেজিং ও টেস্টিং’ সুবিধা বাংলাদেশে গড়ে তোলা শতভাগ সম্ভব। এমনকি যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এটি আরও আগেই শুরু করা উচিত ছিল। একবারে অ্যাডভান্সড বা হাই-এন্ড প্যাকেজিংয়ে না গিয়ে, আমরা মিড-রেঞ্জের প্যাকেজিং দিয়ে শুরু করতে পারি। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও টেকনিক্যাল জ্ঞান অর্জিত হলে পরবর্তীতে হাই-এন্ড প্যাকেজিংয়ে রূপান্তর হওয়া সহজ হবে। ঠিক যেমনটা আমরা ডিজাইনের ক্ষেত্রে করেছি-প্রথমে কিছুটা পুরোনো প্রযুক্তিতে কাজ শুরু করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর এখন আমরা অ্যাডভান্সড টেকনোলজিতে সফলভাবে কাজ করছি।
এনটিভি অনলাইন: সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল তৈরির ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান ভূমিকা এবং একাডেমিক সীমাবদ্ধতাগুলো কীভাবে দেখছেন?
এনায়েতুর রহমান: বিশ্বে এই খাতে প্রচুর দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও মাত্র ২০টির মতো প্রতিষ্ঠানে ভিএলএসআই সংক্রান্ত কোর্স চালু রয়েছে। বুয়েটের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যারা পাস করছেন, তাদের একটা বড় অংশ আবার দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। একটি বড় অমিল বা গ্যাপ হলো-অনেক শিক্ষার্থী পাওয়ার বা কমিউনিকেশনে পড়াশোনা শেষ করে জব মার্কেটে ঢুকতে গিয়ে দেখছেন সেখানে সুযোগ সীমিত। অপরদিকে, আমরা সেমিকন্ডাক্টরে যে ধরনের লোক খুঁজছি, তা পাবো না। তাই চাহিদা বুঝে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোর্স কারিকুলাম দ্রুত সময়ের উপযোগী করে আধুনিকায়ন করা জরুরি। চাহিদার জায়গাটিতে নজর দিলে তবেই তরুণ ইঞ্জিনিয়াররা স্নাতক শেষ করেই কর্মক্ষেত্রের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাবেন।
এনটিভি অনলাইন: দেশে দক্ষ শিক্ষকের অভাব বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এই শিল্পে জনবল বাড়ানোর উপায় কী হতে পারে?
এনায়েতুর রহমান: এটি ঠিক যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পর্যাপ্ত অধ্যাপক বা অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই। তবে বর্তমান যুগে তা আর বড় বাধা নয়; কারণ অনলাইনভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে দেশের বাইরে থেকেও বিশেষজ্ঞরা ক্লাস নিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কাঠামোতে ‘অন-ক্যাম্পাস’ ও ‘অনলাইন’-এই দুই পদ্ধতির সমন্বয় থাকা উচিত। এতে দূরদূরান্তের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক মানের ভিএলএসআই প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। আমরা নিজেরাও শিল্প খাতের চাহিদা মেটাতে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকা সম্ভাবনাময় তরুণদের এনে ট্রেইনিং দিয়ে গড়ে তুলছি। বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার ও ইন্ডাস্ট্রি-এই তিন পক্ষ যৌথ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে দেশের জব মার্কেটে এটি অনেক বড় ইতিবাচক পরিবর্তন ও সুসংবাদ নিয়ে আসবে।
এনটিভি অনলাইন: উল্কাসেমির শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল এবং এই পর্যন্ত আসার যাত্রায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে?
এনায়েতুর রহমান: ২০০৭ সালে যখন বাংলাদেশে আমরা কাজ শুরু করি, তখন আমাদের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র চারজন। এসে শুরুতেই যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই তা হলো-এ দেশে সেমিকন্ডাক্টর খাত নিয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা কিংবা টেকনিক্যাল জ্ঞান কোনোটিই ছিল না। বুয়েটসহ কিছু সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদের স্বপ্ন দেখে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদাও বাড়তে থাকে। আমরা তখন চাকরিতে জয়েন করার পর অন-জব ট্রেইনিং দেওয়া শুরু করি। চিপ ডিজাইনের ফ্রন্টএন্ড ও ব্যাকএন্ডের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে আমরা তরুণদের প্রস্তুত করেছি। এভাবে কাজ করতে করতে আজ ঢাকায় আমাদের প্রায় ৫০০ জন ইঞ্জিনিয়ারের একটি বিশাল টিম তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের ৪টি ডিজাইন সেন্টারে ৬০০+ ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে।
এনটিভি অনলাইন: এই শিল্পে দক্ষ জনবলের চাহিদা মেটাতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ইনস্টিটিউট নিয়ে আপনাদের নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
এনায়েতুর রহমান: ৬০০ জন ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করার পর আমরা বুঝতে পেরেছি যে, শুধু অন-জব ট্রেইনিং দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য নির্দিষ্ট ফোকাসড ভিএলএসআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য হলো-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাডেমিকে যতটুকু শেখাবে সেটির ওপর ভিত্তি করে আমরা এই ইনস্টিটিউটে ইন্ডাস্ট্রি-গ্রেড প্রশিক্ষণ দেব। আমাদের এই উদ্যোগের নাম ইউভিটিআই (উল্কাসেমি ভিএলএসআই ট্রেইনিং ইন্সটিটিউট)। এখান থেকে যেন প্রতি বছর কয়েক‘শ বিশ্বমানের ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হতে পারেন, যারা দেশে ও বিদেশে সমানভাবে কাজ করতে পারবেন। বর্তমানে আমরা সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থার সাথে কথা বলছি। যেন এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি প্রজেক্টে যুক্ত করা যায় এবং কোম্পানিতে এনে নতুন করে বাড়তি কোনো ট্রেনিং না দেওয়া লাগে। মূলত এই উদ্দেশ্যেই আমরা ইনস্টিটিউটটি নিয়ে এগোচ্ছি।
এনটিভি অনলাইন: ‘উল্কাসেমি’ ঠিক কোন কোন সেবা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছে এবং ক্লায়েন্টদের কীভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে?
এনায়েতুর রহমান: আমরা মূলত ‘ডিজাইন সার্ভিস’ বা চিপ ডিজাইনের সামগ্রিক সেবা দিয়ে থাকি। এর মধ্যে লেআউট , ফিজিক্যাল ডিজাইন, ডিজিটাল ডিজাইন, এনালগ ডিজাইনসহ একটি চিপের আর্কিটেকচার থেকে শুরু করে উৎপাদনে যাওয়ার আগের প্রতিটি ধাপ অন্তর্ভুক্ত। ভিন্ন ভিন্ন ক্লায়েন্টের চাহিদা ভিন্ন থাকে। যেমন-অনেকে আমাদের শুধু কোড ভেরিফিকেশন ও টেস্টবেঞ্চ তৈরি করে দিতে বলেন, আবার কেউ আর্কিটেকচার বা ফ্রন্টএন্ড ডিজাইন শেষ করে ফিজিক্যাল ইমপ্লিমেন্টেশনের (PnR/RTL to GDSII) দায়িত্ব দেন। চিপ উৎপাদনে যাওয়ার আগের বিশ্বমানের এ ধরনের জটিল সব কাজ আমরা এখন সফলভাবে ঢাকা থেকেই বাস্তবায়ন করতে পারছি।
এনটিভি অনলাইন: বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে উল্কাসেমির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বলবেন?
এনায়েতুর রহমান: শুরুতে আমরা শুধু ‘লেআউট’ ডিজাইন দিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম, কারণ সে সময় এর বৈশ্বিক চাহিদা অনেক বেশি ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা কোনো বাহ্যিক বিনিয়োগ বা ব্যাংক ঋণ না নিয়ে নিজেদের অর্জিত লভ্যাংশ দিয়েই ব্যবসাকে ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত করেছি। বর্তমানে বিশ্বসেরা ফ্যাবলেস ও ম্যানুফ্যাকচারিং হাবগুলোর সঙ্গে আমাদের সরাসরি পার্টনারশিপ রয়েছে। যেমন-আমরা তাইওয়ানের টিএসএমসির ডিসিএ (ডিজাইন সার্ভিস এলায়েন্স) পার্টনার। তাদের সাথে অ্যাডভান্সড নোডে কাজ করছি, যা বিশ্বজুড়ে মাত্র ২৯টি প্রতিষ্ঠানের সেই সক্ষমতা রয়েছে। এ ছাড়া আমরা বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে লিডিং প্রযুক্তি নির্মাতাদের সহযোগী হিসেবে তাদের ডিজাইন সার্ভিসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছি। বিশ্ববাজারের জটিলতম সমস্যাগুলোর সমাধান দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক সেমিকন্ডাক্টর খাতের নির্ভরযোগ্য অংশীদার, উল্কাসেমি সেটিই প্রমাণ করে চলেছে।
এনটিভি অনলাইন: আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের কাছ থেকে নীতিগত ও আর্থিক কী ধরনের সহায়তার প্রত্যাশা করেন?
এনায়েতুর রহমান: বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে প্রতিটি দেশই খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে এবং বাড়াতে কর ছাড়, নগদ প্রণোদনা এবং সরাসরি অনুদান বা গ্র্যান্ট প্রদান করে থাকে। এমনকি আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও ইনটেলের মতো বিশাল কোম্পানিকে এগিয়ে নিতে সে দেশের সরকার অনুদান দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সেখানে স্বল্প সুদে ঋণের সুব্যবস্থাও রাখা হয়। বাংলাদেশেও যদি আমরা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে চাই, তবে সরকারিভাবে প্রতিযোগিতামূলক নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এই শিল্পের অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়াতে কর অবকাঠামো ও আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা অত্যন্ত জরুরি। যেমন-এই খাতে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় হাই-পারফরম্যান্স সার্ভার সরঞ্জাম আমদানি করতে আমাদের এখনো অনেক বেশি সময় লেগে যায়। তাই সার্ভার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি পণ্যের ট্যাক্স রেট কমানো এবং শুল্কায়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিকে দেশে আনতে হলে উচ্চমানের অবকাঠামোগত সুবিধা ও নীতিগত স্বস্তি দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। দ্রুত এসব সরকারি পদক্ষেপ ও সমন্বিত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত বিশ্ববাজারে খুব দ্রুত শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারবে।
এনটিভি অনলাইন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দ্রুত বিকাশে কর্মসংস্থান হারানোর যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এনায়েতুর রহমান: এআই এখন এক বাস্তব সত্য এবং এটিকে ভয় না পেয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি এআইকে ভয় পাই না, বরং যারা এআই-এর ব্যবহার জানে না তাদের নিয়েই আমার শঙ্কা। এআই আসার ফলে চাকরির বাজারের ধরন পরিবর্তন হবে। যেখানে ১০ জন মানুষ লাগত, সেখানে হয়তো ৩ জন এআই ব্যবহারে দক্ষ মানুষ দিয়েই কাজ চালানো যাবে। তবে তার মানে এই নয় যে বাকি ৭ জন চাকরি হারাবে; তারা ভিন্ন ও নতুন কোনো কাজে যুক্ত হতে পারবে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বিশ্বব্যাপী এখনো জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। সেখানে এআই-এর সহায়তায় কম মানুষ দিয়ে বেশি ও দক্ষ কাজ করানো সম্ভব হলে তা এ শিল্পের জন্য একটি ভালো খবর। চিপ ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমরা অলরেডি এআই-এর ব্যবহার শুরু করেছি এবং আমাদের আলাদা এআই গ্রুপ গঠন করে ক্লায়েন্টদের সাপোর্ট দিচ্ছি। অটোমেশনের মতো এআই-কে সঠিক ডেটা দিয়ে মডেল ট্রেইন করিয়ে ইনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন জটিল ফ্লো বা প্রসেস অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এআই কখনই মানুষকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত এআই যে চিপগুলো চালায়, সেগুলো কিন্তু মানুষই উদ্ভাবন করে। চিপ ডিজাইন, মেমরি ডিজাইন বা এনালিটিক্যাল থিংকিং অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়, যা গভীর মানবিক বোধ ও চিন্তাশক্তির ওপর নির্ভর করে। তাই রাতারাতি মানুষের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং এআই মানুষের কাজের সহযোগী হিসেবে উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করবে।
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশে বড় বড় বহুজাতিক সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিকে (যেমন-এএমডি, ইনটেল আনার ক্ষেত্রে কী ধরনের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
এনায়েতুর রহমান: এএমডি বা ইনটেলের মতো শীর্ষ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা সম্ভব হলে দেশে হাজার হাজার হাই-টেক কাজের সুযোগ তৈরি হবে এবং বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসবে। মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো আমাদেরও বড় ধরনের ডিপ্লোম্যাটিক লবিং ও সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে এটি বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ অবকাঠামো, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, পর্যাপ্ত সাইবার সিকিউরিটি এবং সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত স্পষ্টতা নিশ্চিত করতে হবে। গত ১৯ বছর ধরে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করার সময়ে উল্কাসেমি উচ্চমানের সাইবার নিরাপত্তা বজায় রেখেছে। ডাটা বা মেধাসম্পদ যাতে কোনোভাবেই চুরি বা কপি না হয়, সেজন্য আমরা কঠোর প্রটোকল মেনে চলি। এই আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি প্রটোকলগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার ফলেই বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডগুলো আজ আমাদের ওপর আস্থা রাখছে।
এনটিভি অনলাইন: সিলিকন ভ্যালির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার ছেড়ে ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ফিরে উল্কাসেমি প্রতিষ্ঠার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল এবং শুরুর দিনগুলোর অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
এনায়েতুর রহমান: বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে আমেরিকায় অরেগন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর আমি সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করেছি। সেখানে এএমডি-তে দীর্ঘ ১১ বছর সিয়ন টেকনোলজিস্ট ও চিপ ডিজাইনার হিসেবে এএম২৯সি৯৮৩ ( Am29C983)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ চিপ ডিজাইন করেছি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের সিলিকন ভ্যালিতে খোলা অফিসে ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার সূত্র ধরে দেশে বারবার আসার সুযোগ হয়। তখনই অনুধাবন করি যে বিদেশের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দেশে ফিরে নতুন কিছু করা প্রয়োজন। ২০০৭ সালে ঢাকায় এসে মাত্র চারজন প্রকৌশলী নিয়ে উল্কাসেমির যাত্রা শুরু করি। তবে শুরুতেই ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দার কারণে কঠিন চ্যালেঞ্জ ও শূন্য ব্যবসার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই প্রতিকূলতা কাটিয়ে পরবর্তীতে ব্যাঙ্গালোরসহ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্বমানের ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তায় নলেজ অগমেন্টেশনের মাধ্যমে আমরা ব্যবসাকে সফল ও টেকসই রূপ দিতে সক্ষম হই।
এনটিভি অনলাইন: আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে যেকোনো টেক সেবামুখী প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা এবং গ্রাহকের আস্থা অর্জনে মূল মন্ত্র কী হওয়া উচিত?
এনায়েতুর রহমান: বিশ্ববাজারে টেক সেবামুখী ব্যবসা সফল করার জন্য প্রথম ইমপ্রেশন ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায় নেমে কাজ অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ কারিগরি সহায়তা নিয়ে বা লোকসান মেনে নিয়ে হলেও প্রজেক্ট নির্দিষ্ট সময়ে ডেলিভারি করতে হবে। প্রজেক্ট ডেলিভারিতে কোনো জটিলতা বা দেরি হলে গ্রাহকের সাথে লুকোচুরি না করে সরাসরি সত্য তুলে ধরতে হবে। সেবামুখী ব্যবসায় নেতিবাচক অভিজ্ঞতা কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্টে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু শতভাগ সততা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখলে সেই গ্রাহক নিজেই রেফারেন্স হিসেবে নতুন ক্লায়েন্ট এনে দেয়।
এনটিভি অনলাইন: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এই বাজারের মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
এনায়েতুর রহমান: সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসার অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো এখানে রিপিটেড বা পুনরাবৃত্তিমূলক ক্লায়েন্ট বেশি পাওয়া যায়। একবার যদি কোনো গ্রাহকের সঙ্গে কাজের বোঝাপড়া ও কমফোর্ট জোন তৈরি হয়, তবে তারা অন্য কোথাও যেতে চায় না; বরং তারা এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার বা পার্টনার হয়ে ওঠে। এমনকি চুক্তি বা পার্চেজ অর্ডার বছরের পর বছর ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হতে থাকে। তবে নতুনদের ক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে সেমিকন্ডাক্টর অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগত একটি খাত। বাজারে সম্ভাবনা বা ‘সুইট স্পট’ দৃশ্যমান হলেও নিজেদের প্রস্তুতি না থাকলে এ শিল্পে সফল হওয়া কঠিন। নতুনদের জন্য বড় শিক্ষাগুলো হলো শুধুমাত্র বাজারের সুযোগ দেখলেই চলবে না, নিজেদের সক্ষমতা অ্যাসেস করতে হবে এবং অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী টিম গড়ে তুলতে হবে। সহজ উপায়ে স্বল্পমেয়াদি সাফল্য অর্জনের চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেমিকন্ডাক্টরের জটিল প্রক্রিয়া বোঝার জন্য গ্রাহকের চাহিদার সাথে প্রতিনিয়ত সমন্বয় রেখে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

শাহজালাল রোহান