লোডশেডিং থেকে লোড শিফটিং-যেভাবে বিদ্যুৎ বিল ও অপচয় কমাবে এআই
‘আমাদের ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ বর্গফুটের অফিসে আগে টানা এসি ব্যবহার করা হতো, যার ফলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল আসত। সম্প্রতি আমরা এসির সাথে কিছু সেন্সর ও অটোমেশন যুক্ত করেছি। এটি অফিসে লোকজনের উপস্থিতি ও সময়ের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন অংশের তাপমাত্রা ম্যানুভার বা নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। আগে যেখানে আমাদের অফিসের বিদ্যুৎ বিল আসত মাসে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা, গত মাসে তা নেমে এসেছে ৪২ হাজার টাকায়! অর্থাৎ, শুধু একটি ৩,০০০ বর্গফুটের অফিসে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে লোড শিফটিং করে আমরা মাসে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা সাশ্রয় করতে পেরেছি।’-এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা জানালেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও স্মার্টল্যাব-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ হাসনাইন।
এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), শক্তি খাতের আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। এ সময় বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় ‘লোড শিফটিং’, ডেটা সিকিউরিটি, ন্যাশনাল এআই কমান্ড সেন্টার স্থাপন এবং ফ্রিল্যান্সারদের এআই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আইসিটি খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের বিশাল সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তিনি। আর এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরছেন শাহজালাল রোহান।
এনটিভি অনলাইন: এআই কি সরাসরি লোডশেডিং কমিয়ে দিতে পারবে?
রিয়াদ হাসনাইন: এআই সরাসরি লোডশেডিং কমাবে না, তবে এটি ‘লোড শিফটিং’-এ সাহায্য করতে পারবে। আর এই লোড শিফটিংয়ের মাধ্যমে এটি আপনার সামগ্রিক লোড ম্যানেজমেন্টকে আরও মসৃণ করে দিতে পারবে। এআই আপনাকে নির্দিষ্ট করে বলে দিতে পারবে যে কখন কোন লোডটি দু-এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিলে পিক আওয়ারে বড় সংকট তৈরি হবে না। উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কুলিং সিস্টেমে ১,০০০ মেগাওয়াটের লোড রয়েছে। এটি যদি দুই ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া যায়, তবে পিক টাইমে আপনার ১,০০০ মেগাওয়াট ডিমান্ড সহজেই কমে আসবে। অর্থাৎ, এআই সরাসরি লোডশেডিং না কমালেও এর কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, সঠিক জায়গায় ঘাটতি সামলে নিয়ে সেই ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনবে। দেশজুড়ে যদি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় এআই ইমপ্লিমেন্ট করা যায় এবং সঠিক লোড শিফটিং ও ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করা হয়, তবে অনেক বিদ্যুৎ ও অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব!
এনটিভি অনলাইন: এআই এবং স্মার্ট মিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ডেটা নিরাপত্তা ও পলিসির বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
রিয়াদ হাসনাইন: আপনি যখন ডেটা বা স্মার্ট মিটার নিয়ে কাজ করবেন, ডেটাই কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রথম ধাপ। তাই ডেটা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে ডেটা গভর্নেন্স ও ডেটা সিকিউরিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি যখন এআই বাস্তবায়ন করবেন, তখন দেখতে হবে আপনার ডেটা সিকিউরিটি সম্পর্কিত আইনগুলো যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না, ডেটা সঠিকভাবে সুরক্ষিত আছে কি না এবং ডেটা গভর্নেন্স পলিসি ঠিক আছে কি না।
এনটিভি অনলাইন: কোনো কারণে সাইবার হামলা বা ডেটা চুরির মতো ঘটনা ঘটলে পলিসির ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
রিয়াদ হাসনাইন: আপনি যতই ভালো ডেটা প্রটেকশন বা আধুনিক পলিসি তৈরি করেন না কেন, ঝুঁকির আশঙ্কা সবসময় থেকেই যায়। কোনো কারণে ডেটা চুরি বা অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটতেই পারে। তবে আসল বিষয় হলো-ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আপনি কত দ্রুত ব্যাকআপ থেকে সিস্টেমটি পুনরুদ্ধার করতে পারছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুনরুদ্ধার করার এই ব্যবস্থাপনাই আপনার নীতি বা পলিসির মূল অংশ হওয়া উচিত এবং এটিই মূলত একটি সিস্টেমের আসল দক্ষতা।
এনটিভি অনলাইন: বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এআই আসলে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে? এটি কি উৎপাদন বাড়িয়ে দেবে?
রিয়াদ হাসনাইন: এআই মূলত বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সরাসরি উৎপাদন করে না। কারিগরি ভাষায় বলতে গেলে, এটি একটি ‘এফিশিয়েন্সি মাল্টিপ্লায়ার’। অর্থাৎ, আপনার বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর কাজ। আমাদের দেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে, যেখানে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে কম সম্পদ ব্যবহার করে কখন, কীভাবে এবং কোথায় প্রয়োগ করলে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যাবে-এআই তা নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লস একটি বড় সমস্যা-প্রায় ৭.৫% এর মতো লস রয়েছে। এআই এই সিস্টেম লস ও চুরি নিখুঁতভাবে প্রেডিক্ট করতে পারে এবং পরিমাপযোগ্য সমাধান দিতে পারে। আমরা প্রায়ই বলে থাকি-‘সবচেয়ে সাশ্রয়ী মেগাওয়াট হলো সেটি, যা অপচয় করা হয়নি।’ বর্তমানে তেল বা গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই বিদ্যুৎ চুরি ঠেকিয়ে এবং অপচয় রোধ করে যে মেগাওয়াট সাশ্রয় করা সম্ভব, সেটিই হবে জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া সবচেয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানি। আর এআই ঠিক এই জায়গাতেই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশে কি আজকেই দেশজুড়ে এআই বাস্তবায়ন সম্ভব? এর জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো কী হওয়া উচিত?
রিয়াদ হাসনাইন: আজকেই চাইলেই দেশজুড়ে এআই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ এআই-এর জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ডেটা, যা এখনো আমাদের কাছে পর্যাপ্ত নয়। এর জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে সারাদেশে বিদ্যুৎ গ্রিডে স্মার্ট মিটারের ডেপ্লয়মেন্ট নিশ্চিত করা, সঠিক স্থানে প্রয়োজনীয় সেন্সরগুলো যুক্ত করা এবং পুরো গ্রিডকে স্মার্ট গ্রিডে রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রথম ধাপে একটি ‘ন্যাশনাল এআই এনার্জি কমান্ড সেন্টার’ গঠন করা দরকার, যাতে সব এলাকার ডেটা এক জায়গায় একত্রিত করা যায়। সব ডেটা এক জায়গায় চলে আসলে এআই কয়েক ধাপে কাজ পরিচালনা করতে পারবে। প্রথমত, বিদ্যুতের চাহিদা পূর্বাভাস দেওয়া ও ভবিষ্যদ্বাণী করা। দ্বিতীয়ত, চুরি বা সিস্টেম লস কমিয়ে নিয়ে আসা। তৃতীয়ত, সম্পদের সঠিক ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত (অপটিমাইজ) করা এবং পরিশেষে সামগ্রিক এনার্জি সিস্টেমের এফিশিয়েন্সি বা কার্যক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
এনটিভি অনলাইন: পুরো ব্যবস্থাটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে কত সময় লাগতে পারে?
রিয়াদ হাসনাইন: যুক্তরাজ্যে (ইউকে) পুরো এনার্জি সিস্টেম এআই দিয়ে অটোমেট করা হয়েছে। আমরা যদি সেটিকে মডেল হিসেবে ধরে কাজ করি, তবে বাংলাদেশে এই পর্যায় পৌঁছাতে ৩ থেকে ৫ বছরের একটি যাত্রার প্রয়োজন হবে। তবে মূল বিষয় হলো, এই লক্ষ্যে কাজ আমাদের এখনই শুরু করতে হবে।
এনটিভি অনলাইন: এআই আসার ফলে কি মানুষের চাকরি কমে যাবে বা কাজ হারিয়ে যাবে?
রিয়াদ হাসনাইন: এআই মানুষের চাকরি কমাবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করবে। এআই মানুষের সব কাজ কেড়ে নেবে বা চাকরি চলে যাবে-এমনটা ভেবে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। বরং এআই ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন দক্ষতা অর্জন করে যেসব নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা সম্ভব। বৈশ্বিক বাজার এবং আউটসোর্সিং মার্কেটে এআই-সংক্রান্ত কাজের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কেউ যদি এআই বিষয়ে মৌলিক বা মাঝারি পর্যায়ের দক্ষতাও অর্জন করতে পারেন, তবে তিনি এমন সব নতুন কাজ করতে পারবেন যা গত ২-৩ বছর আগেও মানুষ জানত না।
এনটিভি অনলাইন: এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে আমাদের এখন কী করা উচিত?
রিয়াদ হাসনাইন: আমাদের প্রধান কাজ হলো বর্তমান কর্মীবাহিনীকে এআই বিষয়ে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে আমরা নতুন তৈরি হওয়া কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে প্রবেশ করতে পারি। আমরা যদি সঠিক এআই পলিসি বাস্তবায়ন করতে পারি এবং দেশের প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সারের একটি বড় অংশকে এআই প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তবে আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয়ে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সার রফতানিকারক দেশ। আমাদের এই বিশাল ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটিকে যদি এআই বিষয়ে দক্ষ করে বৈশ্বিক বাজারে এআই-সংক্রান্ত কাজগুলোতে যুক্ত করা যায়, তবে আইসিটি খাত থেকে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দ্রুততর হবে।
এনটিভি অনলাইন: এর ফলে আমাদের পূর্বনির্ধারিত ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কতটা সুবিধা হবে?
রিয়াদ হাসনাইন: ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, বর্তমানে আমরা তা স্পর্শ করতে পারিনি এবং প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আটকে আছি। তবে এআই নির্ভর ফ্রিল্যান্সিং বাজারকে কাজে লাগাতে পারলে এই ঘাটতি আগামী ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব। এই ফ্রিল্যান্সারদের এআই-ভিত্তিক কাজের জন্য প্রস্তুত করতে পারলে আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যেই আইসিটি খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। আমরা যদি সঠিক সময়ে এআই পলিসি বাস্তবায়ন না করি, জনবলকে সঠিক প্রশিক্ষণ না দিই, অবকাঠামো উন্নত না করি এবং স্টার্টআপগুলোকে সঠিক সুযোগ না দিই, তবে আমরা আবারো পুরোনো সমস্যায় স্থবির হয়ে পড়ব। ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা ও ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার অধীনে ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও দীর্ঘদিন আমরা মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারেই আটকে ছিলাম। নীতিমালার উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সংস্কার না করলে আগামী ৫ বছরেও আমাদের রপ্তানি আয় হয়তো ৫ বিলিয়ন থেকে বহু দূরে, ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই ঘোরাফেরা করবে।
এনটিভি অনলাইন: এই স্থবিরতা কাটিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সার্বিক কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন আনা জরুরি?
রিয়াদ হাসনাইন: আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরো আইসিটি খাতের একটি সামগ্রিক ও সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো-সময়োপযোগী এআই ও তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা তৈরি করা, আমাদের মানবসম্পদ ও ফ্রিল্যান্সারদের সঠিক এআই প্রশিক্ষণ প্রদান করা, আইসিটি এবং ডেটা অবকাঠামোকে একটি আধুনিক মানে উন্নীত করা এবং নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোকে কাজ করার সঠিক সুযোগ ও সহায়তা দেওয়া।
এনটিভি অনলাইন: আপনাকে ধন্যবাদ।
রিয়াদ হাসনাইন: এনটিভি অনলাইনসহ সকল পাঠককে ধন্যবাদ।

শাহজালাল রোহান