মিলনের পর পুরুষ সঙ্গীকেই খেয়ে ফেলে স্ত্রী অক্টোপাস
আজ ৮ অক্টোবর, বিশ্ব অক্টোপাস দিবস। অদ্ভুত ও রহস্যময় এই সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবনযাত্রা চিরকালই মানুষকে অবাক করেছে। তবে ব্লু-লাইন্ড অক্টোপাস বা নীল বলয়যুক্ত অক্টোপাসের প্রেমের গল্পটি একটু বেশিই নাটকীয় ও ভয়ঙ্কর।
সাধারণত এই প্রজাতির ক্ষেত্রে মিলনের পর পুরুষ অক্টোপাসটি পরিণত হয় স্ত্রী অক্টোপাসের আহারে। তবে প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর নিয়ম এড়াতে পুরুষ অক্টোপাসরা বেছে নিয়েছে এক অবিশ্বাস্য কৌশল। স্ত্রী অক্টোপাসের প্রাণঘাতী ক্ষুধা থেকে বাঁচতে পুরুষ অক্টোপাস বিষ ঢেলে সঙ্গীকে অবশ করে দেয়। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে আসে এ তথ্য।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ডের গবেষক ফ্যাবিও কোর্তেসি মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরের আইশা রাসকোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এই গবেষণার বিস্ময়কর তথ্য প্রকাশ করেছেন।
গবেষক ফ্যাবিও কোর্তেসি জানান, প্রজনন মৌসুমে ডিম পাড়ার প্রায় ৪০ দিন আগে থেকে প্রস্তুতি নেয় স্ত্রী অক্টোপাস। একবার ডিম পাড়া হয়ে গেলে স্ত্রী অক্টোপাস কয়েক মাস ধরে সেগুলোর যত্ন নেয়। পুরো এই সময়টিতে সে কোনো খাবার গ্রহণ করে না। তাই ডিম পাড়ার আগেই নিজের শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয় করতে চরম ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে স্ত্রী অক্টোপাস।
সেই ক্ষুধা মেটাতে সে নিজের মিলন সঙ্গীকে শিকার করা শুরু করে। পুরুষ অক্টোপাসগুলো আকারে অনেক ছোট হওয়ায় স্ত্রী অক্টোপাসটির জন্য এটি একটি সহজ আহার হয়ে ওঠে। প্রকৃতির নিয়মে স্ত্রী অক্টোপাস নিজের প্রজনন ও ডিম সুরক্ষার স্বার্থে পুরুষটিকে খেয়ে ফেলে।
তবে সম্প্রতি কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খেয়াল করেছেন, কিছু বুদ্ধিমান পুরুষ অক্টোপাস স্ত্রী অক্টোপাসের এই ভোজের তালিকায় শেষ মুহূর্তের খাবার হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করার পথ বের করেছে।
গবেষণাগারে পর্যবেক্ষণকালে গবেষকরা দেখতে পান, মিলনের সময় পুরুষ অক্টোপাসটি স্ত্রী অক্টোপাসের পিঠে ওঠে। এরপর প্রায় ৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে স্ত্রী অক্টোপাসটির গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং তার সমস্ত নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রী অক্টোপাসটি এই নিস্তেজ অবস্থায় প্রায় এক ঘণ্টা অসাড় হয়ে পড়ে থাকে।
এরপর চেতনা ফিরে পেলে স্ত্রী অক্টোপাসটি মারাত্মক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং পুরুষ অক্টোপাসটিকে শরীর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ততক্ষণে পুরুষ অক্টোপাসটি নিরাপদে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে সরে পড়ার সুযোগ পেয়ে যায়।
গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, ব্লু-লাইন্ড অক্টোপাসের শরীরে অত্যন্ত মারাত্মক স্নায়ু বিষ থাকে। এর নাম ‘টেট্রোডোটক্সিন’ বা সংক্ষেপে টিটিএক্স। এটি প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী বিষগুলোর একটি, যার সামান্য পরিমাণ মানবদেহে প্রবেশ করলে মৃত্যু নিশ্চিত।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষ ব্লু-লাইন্ড অক্টোপাসের বিষগ্রন্থি স্ত্রী অক্টোপাসের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বড়। আকারে ছোট হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের কেন এত বড় বিষগ্রন্থি লাগবে, তা নিয়ে প্রথমে চিন্তায় পড়ে যান গবেষকরা। কারণ উভয়েই একই ধরনের খাবার খায়।
পরবর্তীতে জানা যায়, মিলনকালে নিজেকে রক্ষা করতে পুরুষ অক্টোপাস তার এই অতিরিক্ত বিষ ব্যবহার করে। তারা কামড় দিয়ে স্ত্রী অক্টোপাসের শরীরে বিষ প্রয়োগ করে তাকে সাময়িকভাবে অবশ বা প্যারালাইজড করে দেয়।
এনপিআরের প্রতিনিধি আইশা রাসকো জানতে চান, পুরুষ অক্টোপাস কি অন্য অভিজ্ঞ পুরুষদের দেখে এই কৌশল শেখে? জবাবে ফ্যাবিও কোর্তেসি বলেন, প্রাণিজগতে প্রজননকালে টিটিএক্স বিষ ব্যবহার করে সঙ্গীকে অসাড় করার ঘটনা এটিই প্রথম। অন্য প্রজাতির অক্টোপাসরা লম্বা বাহু বা প্রজনন অঙ্গ ব্যবহার করে স্ত্রী অক্টোপাসকে দূরে রাখে। কিন্তু ব্লু-লাইন্ড অক্টোপাস বিষাক্ত কামড় দেয়।
তবে অক্টোপাসরা এই কাজ অন্যদের দেখে শেখে না। কারণ মিলনের নির্দিষ্ট সময় শেষে এরা স্বাভাবিকভাবেই মারা যায়। তাই পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শেখার কোনো সুযোগ থাকে না। তারা মূলত নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকেই সঠিক শিক্ষা নেয়।
প্রথমবার বিষ প্রয়োগের সময় যদি কামড়টি সঠিকভাবে মহাধমনীর কাছাকাছি না পড়ে, তবে স্ত্রী অক্টোপাস খুব দ্রুত জেগে ওঠে। সেই সময় আক্রমণাত্মক স্ত্রী অক্টোপাসের হাতে পুরুষ অক্টোপাসটি তার দু-একটি বাহু বা হাত হারাতে পারে। তবে প্রাণ নিয়ে ফিরলে পরবর্তী মিলনের সময় পুরুষটি আগের ভুল শুধরে একদম নিখুঁত স্থানে কামড় দিতে সক্ষম হয়।
এই গবেষণার মানবকল্যাণমূলক দিক সম্পর্কে ফ্যাবিও কোর্তেসি জানান, টিটিএক্স অত্যন্ত শক্তিশালী স্নায়ু বিষ যা স্নায়ুকোষের মধ্যকার যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। অন্য যেকোনো প্রাণী এই বিষের শিকার হলে হৃদযন্ত্র ক্রিয়া বন্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। তবে স্ত্রী অক্টোপাস প্রায় এক ঘণ্টা অসাড় থাকার পরও মারা যায় না। পুরো গবেষণায় একটি অক্টোপাসেরও মৃত্যু হয়নি।
অক্টোপাস কীভাবে বিষ সামলে এত দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তা আণবিক পর্যায়ে বোঝা সম্ভব হলেও স্নায়ুতন্ত্রের উচ্চতর স্তরে কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, স্নায়ু অসাড় করার এই বিশেষ কৌশল ভবিষ্যতে মানুষের তীব্র ব্যথা কমানোর ওষুধ তৈরিতে নতুন দিশা দেখাতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক