৯ বছর পর ছেলেকে ফিরে পেল বাবা
এপারে হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে নিতে সেই চাঁদপুর থেকে এক বুক আশা নিয়ে এসেছেন বাবা শাহজালাল। আর ওপারে দীর্ঘ নয় বছর পর ভারতের শিশু নিবাস থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরছে ছেলে মনির খান। অপেক্ষা কেবল দুই দেশের সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতার। এক সময় বাবা-ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
urgentPhoto
আজ রোববার দুপুরে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের চেকপোস্টের দৃশ্য এটি। এই সীমান্ত দিয়েই আজ ভারতের অভিবাসন পুলিশ শিশু নিবাসে বন্দি থাকা মনিরসহ তিন শিশুকে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
শিশু মনিরের এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া মূলত এনটিভির দিনাজপুরের হিলি ও চাঁদপুর প্রতিনিধির প্রচেষ্টার ফল। হাকিমপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও এনটিভির হিলি প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম জানান, গত মার্চ মাসে ভারতে গেলে দক্ষিণ দিনাজপুরের এনজিও স্পারের সমন্বয়ক সুরজ দাসের সাথে পরিচয় হয়। কথায় কথায় তিনি জানালেন, বাংলাদেশের একটি ছেলে স্পারের শিশু নিবাসে আছে। সে ঠিকমতো পরিচয় বলতে পারে না। আপনি ছেলেটির সঙ্গে কথা বললে তার ঠিকানা বের করতে পারেন। তাহলে ছেলেটি হয়তো দেশে ফিরে যেতে পারবে।
এরপর জাহিদুল শিশু নিবাসে গিয়ে ছেলেটির সাথে কথা বলেন এবং জানতে পারেন তাঁর বাড়ি চাঁদপুর। এরপর ছেলেটির ছবি নিয়ে ফিরে এসে তিনি যোগাযোগ করেন এনটিভির চাঁদপুর প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান হাবিবের সাথে। হাবিব ছেলেটির ছবি নিয়ে মতলবের স্থানীয় পত্রিকা ‘দৈনিক ইলশেপাড়’-এ প্রতিবেদন প্রকাশ করলে খোঁজ মেলে মনিরের পরিবারের। এরপর স্পারের মাধ্যমে মনিরকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
আজ দুপুর ১২টায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশে হস্তান্তরের জন্য ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুঘাট শুভায়ণ অবজারভেশন হোমে (শিশু নিবাস) বন্দি থাকা তিন শিশুকে হিলি চেকপোস্টের ২৮৫/১১ নম্বর সাব সীমানা পিলার এলাকায় আনা হয়। এরপর সেখানে তাদের রেখে শুরু হয় ভারতের হিলি চেকপোস্ট অভিবাসন পুলিশের কার্যক্রম।
এদিকে শিশুদের ফিরে পেতে অধীর অপেক্ষায় থাকা অভিভাবকদের কাছে প্রতিটি সেকেন্ডই যেন কয়েক বছর অপেক্ষার মতো। অভিভাবকদের কান্নায় চেকপোস্ট এলাকায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতার পর দুপুর সোয়া ১টায় অপেক্ষার সব পালা শেষ হয়। এরপর তিন শিশু ফিরে আসে দেশে।
দীর্ঘ নয় বছর পর ছেলেকে ফিরে পাওয়া মনিরের বাবা দিনমজুর শাহজালাল বলেন, ‘পরিবারে অভাব থাকায় কাজের সুবাদে মনিরকে নিয়ে চাঁদপুরের মতলব উপজেলা থেকে ঢাকার পোস্তগোলায় আসি। তখন তার বয়স ছিল পাঁচ বছর। সেখান থেকে ২০০৬ সালে হারিয়ে যায় মনির। এমন কোনো জায়গা বাদ নেই যে তার খোঁজ করা হয়নি। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পায়নি। একপর্যায়ে ছেলের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন আমার এক আত্মীয় চাঁদপুরের এক পত্রিকায় ছেলের ছবি দেখেন। জানতে পারি, পাচার হয়ে ছেলে ভারতের একটি শিশু নিবাসে আটক। নতুন আশায় বুক বাঁধি মনিরকে নিয়ে। কিন্তু কী করে ফিরে পাই ছেলেকে। চাঁদপুরে এনটিভির সাংবাদিক খোঁজ দেন হিলির সাংবাদিক জাহিদের। তাঁর চেষ্টায় দীর্ঘ নয় বছর পর হারানো ছেলেকে ফিরে পেলাম।’
শাহজালাল জানান, মনির দীর্ঘদিন সেখানে থাকায় তার দুটি চোখ নষ্ট হওয়ার পথে। সে ভালো করে দেখতে পায় না।
ফিরে আসা ছেলে মনির হোসেন জানায়, ‘আমি কীভাবে ভারতে গেছি তা মনে নেই। আমার তেমন কিছু মনে ছিল না। শুধু জানি আমার বাড়ি বাংলাদেশের চাঁদপুরে। ভারতের দিল্লি থেকে আমাকে পুলিশ উদ্ধার করে সেখানকার একটি শিশু হোমে আটকে রাখে। পরে গত বছর সেখান থেকে বালুঘাট শিশুনিবাসে নিয়ে আসে।’
মনির আরো জানায়, ‘দিল্লিতে হিন্দি ভাষায় লেখাপড়া করে এসএসসি সমমানের সনদ অর্জন করেছি। এ কারণে ঠিকমতো বাংলা বলতে পারি না।’
বাংলাদেশের হিলি চেকপোস্টের অভিবাসন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুজ্জামান বলেন, ‘শাহজালালের ছেলে মনির খান নয় বছর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার মৌলভী জালাল উদ্দীনের ছেলে আকরাম দুই বছর ও জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার মালেপাড়ার আশরাফ মণ্ডলের ছেলে নিপুল দুই বছর ধরে সেখানে আটক ছিল। পাচারকারীরা বিভিন্ন সময়ে তাদের ভারতে নিয়ে যায়। আজ ভারতের হিলি চেকপোস্টের অভিবাসন পুলিশ এই তিনজনকে আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার পর তিনজনকেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
ভারতের বালুরঘাট শুভায়ন শিশু নিবাসের কর্মকর্তা পরেশ বলেন, ‘১৮ বছরের নিচে কেউ ভারতে আটক হলে তাদের শিশু নিবাসে রাখা হয়। পরে দুই দেশের মধ্যে আটককৃতদের ব্যাপারে তথ্য যাচাই-বাছাই করে সঠিক হলে দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।’
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা ভিত্তিক এনজিও স্পারের মালদা ও দক্ষিণ দিনাজপুর শিশু নিবাসের সমন্বয়ক সুরজ দাস জানান, ‘১৮ বছরের নিচে আটক করাদের দেশে ফেরতের ব্যাপারে দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এই প্রত্যাবর্তন বিলম্বিত হয়েছে। আমরা স্পারের সহযোগিতায় দুই দেশে যোগাযোগাগের মাধ্যমে তাদের মুক্তির বিষয়টি দ্রুত করি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক