ঢাকা-বেইজিং সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে : প্রধান উপদেষ্টা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি এই দপ্তরে থাকব না, একটি নতুন সরকার গঠিত হবে। তবে আমাদের দুই দেশের মধ্যে চলমান কাজগুলো অবশ্যই অব্যাহত থাকবে।’
গত বুধবার (২৭ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ‘চীন-বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ফোরাম’-এর একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠককালে অধ্যাপক ইউনূস এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মধ্যে চীনের জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী ও বায়োমেডিকেল, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও আইন খাতের নেতারা।
এ সময় সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক ও প্রখ্যাত বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী শিন-ইউয়ান ফু অধ্যাপক ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশি শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কাজ করার ও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অবদান রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এছাড়া ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজির বোর্ড অব ডিরেক্টরসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওং এবং ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেক (সিঙ্গাপুর)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউকিং ইয়াও বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। ওয়ালভ্যাক্স অন্তত ২২টি দেশে তাদের টিকা রপ্তানি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানীয় সাবসিডিয়ারি গড়ে তুলেছে এবং নিউমোকোকাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) ও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকার স্থানীয় উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। ইন্দোনেশিয়ায় একটি ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন— সিঙ্গাপুর রোবোটিক্স সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জিনসং ওয়াং, ফোরডাল ল’ ফার্মের ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান ইউয়ান ফেং, বেইজিং উতং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লি রান, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রকল্পবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট গাও ঝিপেং, চায়না হুনান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের বিনিয়োগ পরিচালক শু তিয়ানঝাও, চায়না সিসিসি ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুয়া জিয়ে, পাওয়ারচায়না ওভারসিজ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের ওভারসিজ মার্কেটসের জেনারেল ম্যানেজার চেন শুজিয়ান, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মা শিয়াওইউয়ান এবং চীন–বাংলাদেশ পার্টনারশিপ ফোরামের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যালেক্স ওয়াং জেকাই।
বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন, যেটি ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি চীনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো পরিদর্শনের ও মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার দৃশ্য দেখার সুযোগ পেয়েছি। পরবর্তীতে চীনা সরকার এই নীতির ওপর ভিত্তি করে তাদের নিজস্ব কর্মসূচি চালু করেছিল।’
প্রধান উপদেষ্টা গত মার্চে চীন সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘তিনি (শি জিনপিং) আমাকে বলেছিলেন যে তিনি আমার বই পড়েছেন এবং এর নীতিগুলো অনুসরণ করেন। সেটি আমার জন্য একটি অত্যন্ত আনন্দের মুহূর্ত ছিল।’
অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বাস্থ্যখাতই সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কীভাবে স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত করা যায়—যাতে চিকিৎসক ও রোগীরা কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারেন, চিকিৎসা ইতিহাস ডিজিটালি সংরক্ষণ করা যায় এবং সহজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়—সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
অধ্যাপক ইউনূস ওষুধ শিল্পে সামাজিক ব্যবসা মডেলের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘ওষুধ তৈরিতে খরচ খুব কম হলেও তা চড়া দামে বিক্রি হয়। আমরা এমন ওষুধ কোম্পানি গড়ে তুলতে চাই যারা শুধু মুনাফা নয়, বরং মানুষের সেবার ওপর গুরুত্ব দেবে।’
কোভিড-১৯ মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত টিকার দাবির কথা স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা পেটেন্টমুক্ত টিকার পক্ষে কথা বলেছিলাম এবং বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। ভোটের সময় ১০টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। তারা বলেছিল, ধনী দেশগুলো টিকা কিনে দরিদ্র দেশকে দেবে। আমরা বলেছি—আমাদের দান দরকার নেই। মানুষ মারা যাচ্ছিল, আর কেউ কেউ টাকা কামাচ্ছিল—এটা লজ্জাজনক।’
প্রধান উপদেষ্টা উত্তরবঙ্গে একটি ‘হেলথ সিটি’ গড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, ‘চীন সফরের সময় আমি উত্তরবঙ্গে এক হাজার শয্যার একটি আন্তর্জাতিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এটি দরিদ্র অঞ্চল হলেও ভারত, নেপাল ও ভুটানের কাছাকাছি হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক। এই হেলথ সিটিতে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র এবং টিকা উৎপাদন সুবিধা থাকবে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর মানুষও ব্যবহার করতে পারবে।’
অধ্যাপক ইউনূস চীন সরকারের নিরন্তর সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বৈঠকে সরকারের এসডিজিবিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি)