ঈদে ভ্রমণপিপাসু পর্যটক বরণে প্রস্তুত চায়ের দেশ মৌলভীবাজার
পবিত্র ঈদুল আজহার টানা এক সপ্তাহের ছুটি সামনে রেখে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত চায়ের দেশ মৌলভীবাজার। পর্যটকদের জন্য জেলার পাঁচতারকা হোটেল-রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে নানা আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
প্রকৃতির অপুরূপ লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান টানা ছুটিতে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসবেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নৈসর্গিক অপরূপ প্রাকৃতিক এসব দৃশ্য দেখতে ছুটে আসবেন হাজার হাজার পর্যটক। একই সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিবেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে পর্যটকদের বড় একটি অংশ শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে চায়। তাই তাদের বরণ করতে ইতোমধ্যে শতাধিক রিসোর্ট, কটেজ, পাঁচতারকা মানের হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোর সাজসজ্জার কাজসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন নামিদামি চাইনিজ ও থাই খাবারের ক্যাফে-রেস্টুরেন্টগুলো নতুন সাজে সজ্জিত হচ্ছে। পর্যটকদের ঈদের বুকিংয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ছাড়। খাবারের মেন্যুতেও আনা হয়েছে নতুনত্ব। পাশাপাশি পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য শতাধিক চান্দের গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পর্যটকরা মূলত দেখতে আসেন প্রকৃতির রুপে সজ্জিত চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কার বিল, রাবার বাগান, আনারস বাগান, লেবু বাগান, চা গাছে সজ্জিত দার্জিলিং টিলা, খাসিয়াপুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, নীলকণ্ঠ টি কেবিন, সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট, বর্ষিজোড়া ইকোপার্কসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান।
এ ছাড়া জেলা সদরের মাতারকাপনে অবস্থিত মনু ব্যারেজ, মোগল আমলের শাহ সুজার মসজিদ, মনু নদী তীরবর্তী শহরের শান্তিভাগ ওয়াকওয়ে, হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (র.)-এর মাজার শরিফ, লাসুবন, শমসেরনগর গলফ মাঠ, ক্যামেলিয়া লেক, আদমপুর বনবিট, পদ্মছড়া চা বাগান লেক, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট, আগর বাগান, ৭১ বধ্যভূমি, দার্জিলিং টিলা, চা কন্যা ভাস্কর্য, টি মিউজিয়াম, ভাড়াউড়া চা বাগান লেক, সাত কালার নীল কণ্ঠ টি কেবিন, হরিণ ছড়া গলফ মাঠ, লাল টিলা, শঙ্কর টিলা, গরম টিলা, রাজনগরের কমলা রানির দীঘি, বরথল চা বাগান লেক, রবিরবাজার জামে মসজিদ, জুড়ীর কাশ্মির টিলা, লাঠি টিলাসহ জেলার বিভিন্ন চা বাগানও অনেকের কাছে পছন্দ।
জেলা পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, ঈদুল আজহার টানা ছুটি থাকলেও মুলত ঈদের পর দিন থেকে হোটেল-রিসোর্ট বুকিং হয়ে থাকে। গত ঈদুল ফেতরে ছুটিতে শেষদিকে অনেক বুকিং বাতিল করেছেন পর্যটকরা। ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে মোটামুটি ভালো পর্যটক সমাগমের আশা করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। আগামী ২৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বুকিং চলছে। তবে উল্লেখযোগ্য বুকিং হয়নি। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়েছে। এ বছর দেশব্যাপী শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকদের আগমন কমে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে তারা। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াও কারণ হিসেবে দেখছে অনেকে। ঢাকা সিলেট মহা-সড়কের বেহালদশা ও জেলার পর্যটন এলাকার সংযোগ সড়কের অবস্থা খারাপ থাকায় পর্যটকদের আগমন বেশ কয়েক মাস থেকে কম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও নিসর্গ নিরব ইকো কটেজের মালিক কাজী সামছুল হক বলেন, পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট রয়েছে শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায়। গেল ঈদুল ফিতরে আশানুরূপ বুকিং মেলেনি। আজ সোমবার ১৮ মে পর্যন্ত ৩০ ভাগ বুকিং হয়েছে। ঈদের দিন পর্যন্ত অমুসলিম পর্যটকরা বুকিং বেশি দিচ্ছেন। ঈদের পরের দিন থেকে মুসলিমদের বুকিং সাধারণত হয়ে থাকে। ঈদের ছুটি আরও কয়েকদিন রয়েছে। আমরা অপেক্ষায় আছি, আরও কিছু বুকিং হতে পারে। জেলায় শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল এলাকায় বেশিরভাগ হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে। বর্তমানে আরও হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ হচ্ছে। এতে প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে। এ ছাড়া রয়েছে ট্রেনের টিকিট সংকট, পর্যটকরা টিকেট পায় না। তাদের জন্য ঢাকা-সিলেট পথে একটি নতুন ট্রেন যুক্ত করা হলে পর্যটক আরও বাড়বে।
গ্র্যান্ড সুলতানের জিএম আরমান খান জানান, একদিকে চা-বাগানের অপার সৌন্দর্য, অন্যদিকে প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এই অঞ্চলে ট্যুরিস্টদের আনাগোনা সব সময়ই একটু বেশি থাকে। যদিও এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষা চলছে, তারপরও ভালো বুকিংয়ের আশা করা হচ্ছে। ঈদুল আজহার ছুটিতে ৫০ শতাংশ ডিস্কাউন্ট অফার দেওয়া হয়েছে। গত ঈদুল ফিতরে পর্যটক আশানুরুপ ছিল।
সিনিয়র ট্যুর গাইড সৈয়দ রিফাত জামান বলেন, বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে যারা আসছেন তারা ভিআইপি বা উচ্চ আয়ের ট্যুরিস্ট। তবে স্বল্প আয়ের বিদেশি ট্যুরিস্টের আগমন আগের চেয়ে কমে গেছে। স্বল্প আয়ের বিদেশি ট্যুরিস্টদের আগে রাস্তায় বাইসাইকেল বা হেঁটে ঘুরতে দেখা যেত। থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত ব্যয় অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি হওয়ায় তাদের সংখ্যা কমে গেছে। অনেক দেশি পর্যটক সপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসেন, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান তারা ঘুরেন। খরচ সংকোচন করতে রাত্রি যাপন না করে আবার চলে যান।
ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের সমন্বয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন সে লক্ষ্যে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আসন্ন ঈদে যানজট নিরসনে পর্যটন পুলিশ কাজ করবে।
ঈদ মানে খুশি, আনন্দ আর একটু বিনোদনের আশায় সাধ আর সাধ্যের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে এবারের ঈদের ছুটিতে মৌলভীবাজার জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোতে নানা শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষের সমাগম ঘটবে—এমনটাই প্রত্যাশা পর্যটন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

এস এম উমেদ আলী, মৌলভীবাজার