এমপি-ওসির সঙ্গে একমঞ্চে হত্যা মামলার প্রধান আসামি, পুলিশের কাছে তিনি পলাতক
মাদারীপুরে আলোচিত ডিস ব্যবসায়ী আলমগীর হাওলাদার হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও বিএনপি নেতা লাভলু হাওলাদার আদালতে জামিন না থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি সম্প্রতি একটি মাদকবিরোধী সমাবেশে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও থানার ওসির সঙ্গে একই মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে। মামলার বাদী ও নিহতের পরিবারের অভিযোগ, প্রধান আসামি লাভলু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হওয়ায় তাকে খোদ এমপি আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন এবং এই কারণেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা দেখাচ্ছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার আলমগীর হাওলাদারের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে নিহতের স্ত্রী ও মামলার বাদী রেখা বেগম বলেন, আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করতেছে। আমরা ভয়ে এখন এলাকায় থাকতে পারছি না। আমাদের বাড়িঘরেও লুটপাট হয়েছে। এলাকায় গেলে আমার একমাত্র ছেলেকে খুন করে ফেলার হুমকিও দিছে। এই সব ওই লাভলু করতেছে। আগে পলাতক থাকলেও এখন প্রকাশ্যে সব করতেছে। পুলিশও তাকে ভয় পায়, কিছুই বলে না।
নিহতের ছেলে আল-আমিন হাওলাদার সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার বাবার খুনিদের বিচার চাইতে গিয়ে আমরা এখন ঘরবাড়ি ছাড়া। জামিন ছাড়া কীভাবে একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়? হাইকোর্টে তিনি জামিন চাইলেও তাকে জামিন দেওয়া হয়নি। পুলিশকে আমরা আসামি ধরার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলেও তারা কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না। মামলার প্রধান আসামি লাভলু হাওলাদারকে স্বয়ং এমপি প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যার কারণে পুলিশও তাকে গ্রেপ্তার করছে না। আমি শুধু আমার বাবার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
গত ১০ মার্চ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাদারীপুর পৌরসভার নতুন মাদারীপুর এলাকায় ঘরে ঢুকে ডিস ব্যবসায়ী আলমগীর হাওলাদারকে (৫০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র পদপ্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক লাভলু হাওলাদারকে (৫৩) প্রধান আসামি করে মোট ৮৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
গত ১১ মার্চ মামলা দায়েরের পর থেকে লাভলু পলাতক থাকলেও গত দুই মাস ধরে তাকে প্রকাশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৩ জুলাই রাতে মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে আয়োজিত একটি মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাহন্দার আলী মিয়া। সেই মঞ্চেই বিশেষ অতিথি বিএনপির নেতা লাভলু হাওলাদার এবং মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ একসঙ্গে আসন গ্রহণ করেন।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়া মুঠোফোনে সাংবাদিকদের বলেন, আমি জানতাম তিনি (লাভলু হাওলাদার) জামিনে আছেন, কোর্টে হাজিরা দিচ্ছেন। আমি কোনো অন্যায় বা অপরাধীকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিই না। তিনি যে জামিনে নেই, সেটা আমার জানা ছিল না।’ পরবর্তীতে এ বিষয়ে আবার জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কথা না বলে জানান, তিনি সংসদে আছেন এবং পরে কথা বলবেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত আসামি লাভলু হাওলাদারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, আপনি আমাকে চিনেন না? চিনেন তো অবশ্যই। আপনি সামনাসামনি আসেন। আমি অফিসে আছি, আপনি আসেন।
একই মঞ্চে হত্যা মামলার আসামির সঙ্গে মাদকবিরোধী সমাবেশে উপস্থিত থাকার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, আমি কোনো লাভলু-ঠাবলু কাউকে চিনি না। তবে লাভলুর নাম শুনছি। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে আমি তাকে চিনি না। এমপি সাহেবের সঙ্গে মঞ্চে কারা ছিল, তাও মনে নেই। লাভলুকে গ্রেপ্তারের বিষয় তদন্তকারী কর্মকর্তা বলতে পারবে।
এ সম্পর্কে সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মহসীন বলেন, আলমগীর হত্যা মামলার প্রধান আসামি লাভলু হাওলাদার শুনেছি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন। তবে তার কোনো কাগজপত্র আমরা পাইনি। এই মামলায় ৬৮ জন আগাম জামিন নিয়েছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে লাভলু হাওলাদারের নামও নেই।
আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চলমান আছে, তবে এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা যায়নি এবং পুলিশের খাতায় তিনি পলাতক।
এছাড়া বাদী বা তার পরিবারকে কোনো হুমকির বিষয় নিয়ে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি দাবি করে তিনি বলেন, যদি বাদী লিখিত অভিযোগ করেন, তবে তাদের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করা হবে।
উল্লেখ্য, এই হত্যাকাণ্ডের পর নতুন মাদারীপুর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তত ১০ বার উভয় পক্ষের লোকজনের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতায় আগুন দিয়ে এলাকার শতাধিক বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে এলাকাটি দীর্ঘ দিন ধরে রণক্ষেত্রে পরিণত রয়েছে।

এম. আর. মুর্তজা, মাদারীপুর