প্রযোজক নেতাদের কাছে জিম্মি চলচ্চিত্র
ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শক ক্রমেই কমে যাচ্ছে। গরম আর ছারপোকার কামড়ে ছবি শেষ না করেই দর্শক হল থেকে বেরিয়ে যায়। এর মূল কারণ সিনেমা হলের পরিবেশ ভালো নয়। এমনটাই অভিযোগ ঢালিউড ছবির দর্শকদের। বাংলাদেশে যে কয়টি সিনেপ্লেক্স আছে, তারা সবাই ভালো ব্যবসা করছে। এমনকি আগে থেকে টিকিট না কাটলে শোয়ের আগে টিকিট পাওয়া যায় না। প্রযোজকদের অভিযোগ, অনেক বেশি মুনাফা করার পরও ঢাকার অন্যান্য সিনেমা হলের পরিবেশ ঠিক করছেন না হলের মালিকরা। এই বিষয়ে প্রযোজকরা তেমন জোরালোভাবে কিছু বলতে পারছেন না। কারণ প্রযোজক সমিতির নেতাদের প্রায় সবারই একাধিক সিনেমা হল রয়েছে। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ করছেন প্রেক্ষাগৃহের মালিক নন এমন প্রযোজকরা।
অভিযোগকারী প্রযোজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, একটি টিকিটের দাম ৫০ টাকা লেখা থাকলেও নেওয়া হচ্ছে ৫৫ টাকা। পাঁচ টাকা জাজের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন হল ম্যানেজার। ৫০ টাকার মধ্যে প্রবেশমূল্য ২৪ টাকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যয় ১৬ টাকা। যদিও কয়েকটি সিলিং ফ্যান ছাড়া আর কোনো ব্যবস্থা থাকে না হলে। মূল্য সংযোজন কর ৬ টাকা আর পৌর কর চার টাকা টিকিটের গায়ে লেখা থাকলেও সরকার তা বাদ করে দিয়েছে ২০১৩ থেকে। সেখানে কর ধরা হয়েছে ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ৫০ টাকার টিকিটে সাড়ে সাত টাকা। অথচ টিকিটের সঙ্গে এখনো মূল্য সংযোজন কর ও পৌরকর যোগ করে মোট আড়াই টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে দর্শকদের কাছ থেকে।
প্রবেশমূল্য ২৪ টাকার অর্ধেক- ১২ টাকা পান প্রযোজক। বাকি টাকা নিয়ে যান সিনেমা হলের মালিক। প্রযোজকের ১২ টাকার মধ্যে ছবি প্রদর্শনের জন্য প্রতি সপ্তাহে জাজ মালটিমিডিয়াকে দিতে হবে ১২ হাজার টাকা আর এক সপ্তাহের জন্য ওই সিনেমা হলে প্রযোজকদের পক্ষ থেকে একজন লোক নিয়োগ করতে হয় দুই হাজার টাকায়। এ ছাড়া সিনেমা হলে ছবি চালাতে পোস্টার-ব্যানার-ফেস্টুন বাবদ এক সপ্তাহে খরচ করতে হয় মোট ২২ হাজার টাকা।
ছবি প্রদর্শন করে হল মালিকদের কাছ থেকে জাজ মাল্টিমিডিয়া পাচ্ছে প্রতি টিকিটে তিন টাকা। আর প্রযোজকের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে ১২ হাজার টাকা। প্রযোজকদের দাবি শুধু তারাই অন্যদের চেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই বিষয়ে প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিয়া আলাউদ্দি বলেন, ‘এটি নিয়ে আমরা গত দুদিন ধরেই এফডিসিতে প্রযোজক সমিতিতে বসছি। আশা করি আমরা এই বিষয়গুলোর সুরাহা করতে পারব।’
নির্ধারিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যয় ১৬ টাকা নিয়ে মিয়া আলাউদ্দি বলেন, ‘সাধারণ হলের মধ্যে মধুমিতা আর বলাকায় এসি আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো সিনেমা হলে এসি নেই। লোকজন যদি আরামে সিনেমা দেখতে পারে তাহলে হলে দর্শক বেশি হবে।’
মূল্য সংযোজন ও পৌরকরের নামে আড়াই টাকা বেশি আদায় করা প্রসঙ্গে মিয়া আলাউদ্দি বলেন, ‘এমন হতে পারে যে এই টিকিট আগেই ছাপানো ছিল। তবে যদি কেউ এই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেন, আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব।’
এই সংকটটি নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মুনাফা কম হয় বলে নতুন কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে পারছে না। একটি ছবি করেই তারা থেমে যাচ্ছে। যে কারণে নতুন তেমন কেউ আসার সাহস পাচ্ছে না। অন্যদিকে প্রযোজক সমিতির নেতাদের একাধিক সিনেমা হল থাকায় তারাও কোনো শব্দ করছেন না। আর যেহেতু নেতারা কোনো ছবি তৈরি করছেন না, তাই তাদের নজর সিনেমা হলের ব্যবসার দিকেই বেশি।’
প্রযোজক সমিতির নেতাদের মধ্যে মনোয়ার হোসেন ডিপজল, খোরশেদ আলম খসরু, লিটন মোহাম্মদ হোসেন, মিয়া আলাউদ্দিসহ প্রায় সবারই একাধিক সিনেমা হল রয়েছে। আর পরিচালক ও অন্য প্রযোজকদের দাবি এই কারণেই ঢাকার চলচ্চিত্র এখনো পুরোপুরি লাভজনক হয়ে উঠতে পারছে না।

মাজহার বাবু