ধ্রুপদী সঙ্গীতের উৎসব
সুরসুধায় কেটে গেল পাঁচটি রজনী
‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’, এমন প্রবাদ হরদমই শোনা যায়। রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে সঙ্গীত উৎসবের শেষদিন যখন পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া সুরের ফাঁস দিয়ে টেনে নামালেন ভোরকে, ভোঁ ভোঁ মাথায় তখন কেবলই একটা বাক্যই ঘুরপাক খাচ্ছিল- ‘পণ্ডিতের দাপট বুঝি শেষরাতেই হয়!’ উৎসবের পর্দা নামার মুহূর্তই তো নয় কেবল, পাঁচদিন ধরেই কিংবদন্তি সব শিল্পী যে সুরের খেলা দেখালেন যন্ত্রে-তন্ত্রে-ভঙ্গিতে-সঙ্গীতে, তার রেশ কাটবার উপায় নেই সহসা! যে মানুষটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অ-আও বোঝেন না, এই পাঁচদিনের পর কিছুটা হলেও তিনি নির্ঘাত ধ্রুপদী সঙ্গীত শুনতে চাইবেন-এ এমনই জাদু।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসব এ বছর কিছু দিক দিয়ে ব্যতিক্রম ছিল আগের বারের চেয়ে। নিরাপত্তায় এবং দর্শক-সংখ্যায়। পুরো আয়োজনটাকে নেহাত ‘প্রোগ্রাম’ থেকে উৎসবে পরিণত করার কৃতিত্ব অবশ্যই দর্শকদের। হাজার পঞ্চাশেক দর্শক শীত আর রাতের ঝক্কিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরো আয়োজন উপভোগ করেছেন। কেবল গান শোনাই তো নয়, এত দারুণ আয়োজনে নাইট আউটের সুযোগ কটাই বা মেলে! বিশাল ময়দানের প্যান্ডেল তো বটেই, আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারি পর্যন্ত দর্শকে টইটুম্বুর। চার নম্বর দিনে ওস্তাদ জাকির হুসেন তবলার ঠাটে টানা ভেলকি দেখিয়ে-শুনিয়ে শেষে নিজেই অবাক হলেন। এত মানুষ! ৪০-৫০ হাজার মানুষ এত ঝক্কি আর কষ্টকে থোড়াই কেয়ার করে মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, কারণ ওস্তাদ শুরুতেই বলেছেন ‘মনোযোগ’ দিতে। তবলার আওয়াজে যদি বৃষ্টির ঝিরঝির, বন্ধুর আলাপ আর বিচিত্র সব আওয়াজ বেজে ওঠে; মনোযোগ না দিয়ে উপায় কী! জাকির হুসেনের পারফরম্যান্স ছিল ‘ভিনি-ভিডি-ভিসি’ বলার মতোই। আর্মি স্টেডিয়ামের বাইরে তৈরি হওয়া বিশাল জ্যাম আর দীর্ঘ লাইন যে এমনি এমনি হয়নি, তার প্রমাণ দিতে এতটুকু কার্পণ্য করেননি এই কিংবদন্তি শিল্পী।
উৎসবের কয়টা পারফরম্যান্স নিয়েই বা বলা যায় বলুন! একেকজনই যা করলেন, তার অল্প গল্প বলতে গেলেও পাতার পর পাতা ফুরিয়ে যাবে। যেমন ধরুন মৃদঙ্গমে গুরু কারাইকুড়ি মনির ম্যাজিক্যাল পারফরম্যান্স। গুরু তো গুরুর মতোই থাকবেন, একেকজনের দিকে গুরুসুলভ ভঙ্গিতে নজর দিচ্ছেন- দিয়ে দিচ্ছেন মিউজিক টাস্ক। ওদিকে ঘতমে বৈদ্যনাথন সুরেশ আর খঞ্জিরায় এন অমৃত লেগেছিলেন যেন দ্বন্দ্বযুদ্ধে! কিসের মিউজিক, মনে হচ্ছিল যেন প্রাচীন কলোসিয়ামে দুই শক্তিধর গ্ল্যাডিয়েটর লেগেছেন প্রাণপণ লড়াইয়ে- কেউ কাউকে ছাড়ার জো নেই। উৎসবের সবচেয়ে স্পন্ট্যানিয়াস পারফরম্যান্স এটিকে বললে ভুল হয় না। ঢোল-তবলায় তাদের ভয়াল ঠাট দেখে এক রসিক দর্শকের মন্তব্য, ‘আমি নিশ্চিত উনাদের ছেলেমেয়েরা ভয়ের চোটেই জীবনেও কোনো পরীক্ষায় ফেল করেনি!’
শেষদিন মানুষজন বুঝেই এসেছিলেন, আজ ভিড় অনেক বেশি হবে। সাথে শেষের একটা আমেজও এসে পড়েছিল। শেষ হয়েও যেন শেষ হচ্ছে না, এমনই হাল করে ছাড়লেন কিংবদন্তি শিল্পী ওস্তাদ বেলায়েত খাঁর পুত্র সুজাত খাঁ। সেতারের তারের ঝংকারেই কেবল নয়, সবশেষে কণ্ঠ দিয়েও মন মাতালেন, দর্শক-শ্রোতাদের জানালেন, ‘তুমহারে শ্যহর কা মৌসুম ব্যড়া সুহানা লাগে!’ তারপর তো ওস্তাদ রশীদ খানের কণ্ঠ; মুগ্ধতা যেন ফুরোতেই চায় না। চর্চিত গলা, সুরেলা সুরে সবাই মাত- ‘বালি উমরিয়া, সুন রে স্যজনিয়া, ইয়াদ পিয়া কি আয়ে।’ কতজন যে শীতের রাতে প্রিয় মানুষটির কথা মনে পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, সে তো আর বলা যাবে না।
পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া নিঃসন্দেহে উৎসবের সর্বশেষ বড় আকর্ষণ। স্বতঃস্ফূর্ত বাংলায় তিনি প্রশংসা করলেন এই বিশাল সমাবেশের। বললেন, যাঁরা বোঝেন তাঁরাও আসবেন, যাঁরা বোঝেন না-তাঁদেরও নিয়ে আসবেন। দাওয়াত দিয়ে রাখলেন আগামীবারের জন্যও। দাওয়াত নয়, সবার প্রত্যাশা রইল, তিনি যেন আবারও আসেন। তার সুরকে জাদুকরি, মায়াবি, মনোমুগ্ধকর- কোনো বিশেষণেই যেন বাঁধা যায় না। অধম এই শ্রোতার মনে বিশেষণের জন্য কোত্থেকে যেন একটা কথা এসেই ঘুরপাক খাচ্ছিল,‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ’ ছবির শেষে মার্লোন ব্র্যান্ডোর খসখসে গলার সেই ডায়লগ, ‘দ্য হরর! দ্য হরর’! মুগ্ধতা তখন এতটাই, স্টেডিয়ামভর্তি মানুষের কিচ্ছুটি করার উপায় নেই!
সবশেষে সব শেষ, তাও মাথার মধ্যে পাঁচদিনের জানা-অজানা বহু টিউন; পণ্ডিতজী উৎসব শেষের বোনাস দিয়েছেন ভাটিয়ালি সুরের ছোঁয়ায়। নিতান্ত কাঠখোট্টা মানুষটির শরীরেও তখন টানা শিহরণ, গুজবাম্পস, গুজবাম্পস! এসব জানা-অজানা মুগ্ধতা ছড়িয়েই সব যখন শেষ, তখন অবোধ মনে একটা কথাই ঘুরপাক খায়- সুর বোধহয় এভাবেই সুধা হয়ে কর্ণে প্রবেশ করে।

সামি আল মেহেদী