‘নূর’ এর গানে সুফি প্রশান্তি, আবহসংগীত নিয়ে সমালোচনা—যা বললেন জাহিদ নিরব
আরিফিন শুভর ‘নূর’ সিনেমার দুটি গান ও আবহসংগীতের দায়িত্বে ছিলেন জাহিদ নিরব। মুক্তির পর ‘তুমি আমার নূর’ ও ‘দুলবো লাজুক ফুলে’ গান দুটি দর্শকের আলাদা করে নজর কেড়েছে। প্রথমটি দুঃখের ছায়া ফেলে, একটি নীরব হাহাকার সৃষ্টি করে; দ্বিতীয়টি প্রেমের নরম ভাষা নিয়ে ভেসে ওঠে। একই সঙ্গে সিনেমাটির আবহসংগীত নিয়েও চলছে আলোচনা ও সমালোচনা।
গান তৈরির দর্শন, সুরের আত্মিক উৎস, বৈচিত্র্য সামলানোর অভিজ্ঞতা এবং সমালোচনার ভাষা—সব মিলিয়ে ‘নূর’-এর সংগীতযাত্রা নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন জাহিদ নিরব।
‘তুমি আমার নূর’ গানটি দর্শকের কাছ থেকে অনেক প্রশংসা পাচ্ছে। এই গানের সুর তৈরির সময় আপনার ভেতরের কোন অনুভূতিটি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে?
জাহিদ নিরব: ‘তুমি আমার নূর’ আমার নিজের তৈরি গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কাছের গানগুলোর একটি হয়ে থাকবে। গানটি আমি খুব ধীরে, সময় নিয়ে, অনেক যত্নে বানিয়েছি। পুলক ভাই খুব গভীরতা নিয়ে কথা লিখেছেন। আমার ব্রিফ ছিল—একটা সুফি অনুভূতির গান, যেটা শুনলে ভেতরে এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি আসে। সেই জায়গা থেকেই ভাবনাটা তৈরি। ছোটবেলা থেকে আমরা আজানের যে সুর শুনে বড় হয়েছি, অনেক ক্ষেত্রেই সেটার রাগভিত্তি কিরওয়ানি—এই বিষয়টা আমাকে খুব টেনেছে। সেখান থেকেই মূল সুরের কাঠামো দাঁড়ায়। কোরাস অংশে শ্যামা সংগীতের আবহ ব্যবহার করেছি, যেন একটা আরাধনার অনুভূতি তৈরি হয়। মাখন ভাই যেভাবে গানটি গেয়েছেন, সেটা সত্যিই অনন্য। সব মিলিয়ে এটা শুধু একটি গান নয়, বরং একটি অনুভব।
গানটিকে অনেকে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বিষণ্ন গান হিসেবে দেখছেন। এমন আবেগী গান তৈরির ক্ষেত্রে আপনি আগে কথা ধরেন, নাকি সুর?
জাহিদ নিরব: আমি আগে থেকে ঠিক করে বসে থাকি না যে আগে কথা ধরবো, না সুর। গান বানানো আমার কাছে কোনো হিসাবের বিষয় না। গান শূন্য থেকে আসে, তাই সেটাকে নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা যায় না। যেটা আগে আসে, আমি সেটাকেই ধরার চেষ্টা করি। তবে এই গানের ক্ষেত্রে আগে কথা লেখা হয়েছিল। সেই কথার ভেতরের আবেগ আর অর্থ থেকেই ধীরে ধীরে সুর নিজে নিজেই তৈরি হয়েছে।
‘দুলবো লাজুক ফুলে’ গানটি দর্শক পছন্দ করছেন। একই গল্পচিত্রে দুই ধরনের আবহ—একটি গভীর বিষণ্নতা, আরেকটি নরম আবেগ—এই বৈচিত্র্য সামলানো কতটা কঠিন?
জাহিদ নিরব: সময় নিয়ে কাজ করা গেলে এই বৈচিত্র্য সামলানো কঠিন নয়। ‘দুলবো লাজুক ফুলে’ একেবারে নিরেট প্রেমের গান—নরম, কোমল ও অনুভূতিপূর্ণ। দুই শিল্পীই গানটি খুব ভালোভাবে গেয়েছেন, যা গানের আবেগ আরও বাড়িয়েছে। একই গল্পচিত্রে বিষণ্নতা আর নরম আবেগ—এই দুই রকম আবহ থাকা খুব স্বাভাবিক। এই ধরনের গান আমরা বহু গল্পচিত্রেই দেখি। কেউ কেউ অন্য গানের সঙ্গে মিল খুঁজে সমালোচনা করছেন। আমার কাছে এটা একটি ঘরানা। যেমন ‘ম্যায় আগর কাহু’, ‘দিল তো বাচ্চা হ্যায় জি’, কিংবা আমার করা ‘প্রেমেরই জখম’—সবই একই ঘরানার, কিন্তু প্রতিটি গানের নিজস্ব ভাষা ও আত্মা আছে।
‘নূর’-এর গানগুলোর প্রশংসার পাশাপাশি আবহসংগীত নিয়ে কিছু সমালোচনাও হচ্ছে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
জাহিদ নিরব: আমি মনে করি সমালোচনা খুবই ইতিবাচক বিষয়। এর মানে দর্শক এখন শুধু গান নয়, আবহসংগীত নিয়েও ভাবছে। এতে বোঝা যায় সচেতন শ্রোতা তৈরি হচ্ছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—যেকোনো গল্পচিত্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকে পরিচালকের হাতে। সবার রুচি ও ভাবনা এক রকম হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৃজনশীল সিদ্ধান্ত বদলাতেও পারে। আমি ‘মহানগর’, ‘উৎসব’ ও ‘পরান’-এর আবহসংগীত করেছি, কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটার মিল পাওয়া যাবে না। প্রতিটি কাজ আলাদা চিন্তা থেকে তৈরি।
দর্শকের একাংশ বলছেন, আবহসংগীতে একই ধরনের মিউজিক ব্যবহার করা হয়েছে। এই সমালোচনা কতটা যুক্তিযুক্ত?
জাহিদ নিরব: একই ধরনের মিউজিক ব্যবহারের বিষয়টা আরেকভাবে দেখাও যায়। অনেক সময় গল্পের আবহ মনে গেঁথে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট থিম বা সাউন্ড রিপিট করা হয়। তবে এটাও সত্য, কিছু জায়গায় পোস্ট-প্রোডাকশনের সময় সাউন্ড প্যানেলে মিউজিক পরিবর্তন করা হয়েছে। সেটা হয়তো পরিচালকের সৃজনশীল সিদ্ধান্ত ছিল। সব মিলিয়ে এটা কোনো একক সিদ্ধান্ত নয়, বরং পুরো টিমের সম্মিলিত প্রক্রিয়া।
সামনে কী ধরনের কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে আপনার?
জাহিদ নিরব: এই মুহূর্তে কয়েকটি গল্পচিত্রের কাজ চলছে—‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও ‘রকস্টার’। পাশাপাশি চরকির জন্য একটি ফিল্ম মিউজিকসহ কিছু শর্ট ফিল্মের কাজ করছি। এর বাইরে বিজ্ঞাপন ও থিম সংয়ের কাজ নিয়মিতভাবেই চলছে। কাজের মধ্যেই সময়টা কাটছে।

বিনোদন ডেস্ক