‘সিট নাই, আমি এখন কই যামু?’—অসুস্থ শিশুকে নিয়ে বাবার আকুতি
‘এলাকার সদর হাসপাতাল থেকে বলছে এখানে আসতে। এখানে ডাক্তার দেখে বললেন ঢাকা মেডিকেল বা অন্য কোথাও যেতে। কোনো সিট খালি নাই। আমি এখন আমার অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে কই যামু? আমারে একটা ব্যবস্থা করে দেন।’ —রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন ময়মনসিংহ থেকে আসা বাবা আশরাফুল ইসলাম।
তার মতো এমন অনেক বাবা-মাকে সিটের জন্য দেশের অন্যতম শীর্ষ এই শিশু বিশেষায়িত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। দেশজুড়ে শিশুদের মাঝে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলায় দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট। বিশেষায়িত এই হাসপাতালে সংক্রমণ ব্যাধি হামের জন্য আলাদা ইউনিট করা হলেও রোগীর চাপে তা এখন কানায় কানায় পূর্ণ। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসুস্থ শিশুদের ভর্তি করাতে না পেরে অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আজ রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, শয্যার জন্য জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষা করছেন অনেক অভিভাবক। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১৫ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে এখানে এসেছে, আর বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭১ জন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালেই হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৩টি শিশু। এই হাসপাতালে আইসিইউ থেকে সাধারণ শয্যা—কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহির্বিভাগে সেবা দিলেও ভর্তির প্রয়োজনে রোগীদের বাধ্য হয়েই অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. সাইফুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, হাম যেহেতু সংক্রমণ ব্যাধি তাই শুরু থেকেই তাদের জন্য আলাদা একটি ইউনিট করেছি। আমাদের এখানে সিট রয়েছে ৫৪টি। আইসিইউতে সিট রয়েছে ১৪টি। পুরো সিটগুলোই ফিলাপ রয়েছে। আজ কয়েকজন রোগীকে রিলিজ দেওয়া হবে। সেগুলো আবার নতুন রোগী ভর্তি করা হবে।
এ সময় ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের পুরো হাসপাতালের সিট রয়েছে ৭০৩টি। সেগুলোতেও রোগী রয়েছে, হামের রোগীদের সবার সঙ্গে রাখা যায় না, আবার সিট ছাড়াও ভর্তি করানো যায় না। যেহেতু এটি ঠান্ডাজনিত রোগ। কাউকে আর ফ্লোরে রাখাও যাবে না।
হাসপাতালটিতে হাম ও নিউমোনিয়া সংক্রান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, আমরা কোনো রোগীকেই ফিরত দেই না। সবাইকে ভর্তি নেওয়া হয়।
তবে সরেজমিনে দেখা যায় ইমার্জেন্সির সামনে অনেকেই অপেক্ষা করে আছেন একটি সিটের জন্য।
ময়মনসিংহ থেকে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে আসা আশরাফুল ইসলাম বলেন, এলাকার সদর হাসপাতাল থেকে বলছে এখানে আসতে। এখানে ডাক্তার দেখে বললো ঢাকা মেডিকেল, সোহরাওয়ার্দী বা অন্য কোনো জায়গায় যেতে। এখানে কোনো সিট খালি নাই। আমি কই যামু। আমারে একটা ব্যবস্থা করে দেন।
ইমার্জিনন্সির সামনে একইভাবে বসে কাঁদছেন আছমা খাতুন। তিনি বলেন, এখানে কোনো সিট নাই, তাই মনির বাপ পাশে কোন হাসপাতালে গেছে সিটের জন্য।
শিশুদের জন্য বিশেষায়িত ঢাকার শিশু হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত তিনজন মারা গেছেন।
হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুর রামগতি থেকে গৃহিণী পিংকি বেগম তার ছেলে মোহাম্মদকে নিয়ে এসেছেন। তিনি নোয়াখালী সরকারি হাসপাতালসহ একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি, ছেলেটা ভালো হচ্ছে না। সেখান থেকে এ হাসপাতালে আসছি।
ছেলের সমস্যার কথা জানতে চাইলে পিংকি আক্তার বলেন, আমার ছেলের বয়স নয় মাস। আমি তার সবগুলো টিকাই দিয়েছি, শুধু হামের টিকা নাই বলে দিতে পারিনি। এটা আমর প্রথম সন্তান, আমার সন্তানের জন্য দোয়া করিয়েন বলতেই চোখের জলে ছেলেকে চুমু দেন।
গাজীপুর থেকে সন্তান আয়মান সাদিককে নিয়ে পাশে বেডে রয়েছেন তার মা । তিনি বলেন, আমার ছেলের শুধু জ্বর আর জ্বর, কোনো ভাবেই কমছে না। এলাকায় ডাক্তার দেখালেও কোনো পরিবর্তন হয়নি, তাই এখানে আসছি। আজ ১৪ দিনের মতো। এখন অনেকটাই সুস্থ। স্যারেরা খুব আন্তরিক। কাল হয়ত ছুটি দেবে।
রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকলেও এখানে ভর্তি নিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আউটডোর সেবা দিলেও ভর্তির জন্য পরামর্শ দিচ্ছে ঢাকার অন্য হাসপাতালে যাওয়ার।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ জন, আর বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭১ জন। এ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে হামজনিত চিকিৎসা নিয়েছেন ১৮৭ জন।

ফখরুল ইসলাম (শাহীন)