প্রতিবেশী দেশের স্বার্থে স্বাস্থ্য খাত অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে একটি মহল : ড্যাব
প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ রক্ষায় পরিকল্পিতভাবে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চলছে, যাতে রোগীরা বিদেশমুখী হতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করেছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। একই সঙ্গে কার্যকর চিকিৎসক সুরক্ষা আইন না থাকায় চিকিৎসকরা কর্মক্ষেত্রে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত যুগোপযোগী চিকিৎসক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি বলে জানান সংগঠনটির নেতারা।
আজ সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর প্রেসক্লাবের সামনে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের ডা. নাসির উদ্দিনের ওপর হামলার প্রতিবাদে এক মানববন্ধনে এসব কথা বলেন ড্যাবের নেতারা।
মানববন্ধনে চিকিৎসক নেতারা বলেন, দেশে চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থা দুটোই অবহেলিত। শুধু চিকিৎসকরাই নন, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত নার্স, টেকনোলজিস্ট, কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এটি স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় ধরনের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে।
চিকিৎসক নেতাদের অভিযোগ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর হামলা ও ভিকটিমাইজেশনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। তারা দাবি করেন, মাঝখানে প্রতিবেশী দেশে চিকিৎসার জন্য ভিসা বন্ধ থাকায় এসব ঘটনার মাত্রা কিছুটা কমে এসেছিল। তবে গত কয়েক মাস ধরে আবারও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা শুরু হয়েছে, যাতে রোগীরা বিদেশমুখী হতে বাধ্য হন। এর পেছনে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা বলেন, চিকিৎসকদের আজ হাসপাতালে রোগীদের পাশে থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তাদের রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করতে হচ্ছে। সামান্য কোনো ঘটনার জন্য চিকিৎসকদের ভিকটিমাইজ করার প্রবণতা উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তারা।
ড্যাবের নেতারা বলেন, দেশে এখনও কার্যকর চিকিৎসক সুরক্ষা আইন না থাকায় চিকিৎসকরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত যুগোপযোগী চিকিৎসক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি।
এ সময় সাধারণ মানুষের প্রতি চিকিৎসকদের সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, অপ্রতুল জনবল ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই চিকিৎসকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ১০০, ২০০ বা ৪০০ শয্যার হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও চিকিৎসক সহকারীর সংকট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি নিয়েও কাজ করতে হচ্ছে।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে ড্যাবের নেতারা বলেন, চিকিৎসকরা জনগণের শত্রু নন, বরং জনগণের সেবক। তাই স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব চিত্র ও চিকিৎসকদের সীমাবদ্ধতাগুলো সঠিকভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন তারা।
মানববন্ধনে অধ্যাপক ডা. আকরাম হোসেন বলেন, আজ আমরা হামের যে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখছি, এর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দায়ী। একইভাবে চিকিৎসকদের মৃত্যুর ঘটনাগুলোর দায়ও তাদের নিতে হবে। কারণ ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংশ্লিষ্টরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চিকিৎসক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তা কার্যকর করেনি, যদিও তারা চাইলে এটি করতে পারত।
ডা. আকরাম হোসেন আরও বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরোপুরি অকার্যকর ছিল। এমনকি সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনও তারা গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করেনি।
অধ্যাপক আকরাম হোসেন বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি একটি অনুরোধ জানাতে চাই। আপনি যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস সিস্টেম নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে বলা হয়েছে—কোনো হাসপাতালে রোগীর স্বজন বা কেউ সহিংসতা করলে তাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে না। আমরা চাই, বাংলাদেশেও সেই নীতিমালা অনুসরণ করা হোক।
ডা. আকরাম হোসেন আরও প্রস্তাব করেন, শিল্প পুলিশের মতো হাসপাতাল বা মেডিকেল পুলিশ নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন, যাতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
মানববন্ধনে ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, আজ শুধু আমাদের এখানে নয়, সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একই দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হচ্ছে—ডা. নাসির উদ্দিনসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে এবং চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মস্থলের দাবিতে।

নিজস্ব প্রতিবেদক