যে ১০ পেশায় আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি
চাকরি করতে ভালোবাসেন, এমন লোক খুঁজে পাওয়া একটু কঠিনই বটে। প্রতিদিন সময়মতো অফিসে যেতে কজনেরই বা ভালো লাগে? তবু কাজ বলে কথা! তাই চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আবার উল্টো ঘটনাও ঘটে। অনেকে নিজের পছন্দের কাজটাকে বেছে নেন বলে অফিস করতে বিরক্তি তো লাগেই না, বরং সময় কীভাবে কেটে যায় কাজের মধ্যে, সে খেয়াল থাকে না বেমালুম!
পেশাগত জীবনে কাজের চাপ থাকবেই। কিন্তু এমন কিছু চাকরি আছে, যেখানে সব সময় নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, আর দশটা চাকরির চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞতাও হয়। ক্লায়েন্টদের প্রত্যাশার বাড়তি চাপ, ছুটিছাটা ছাড়া লম্বা সময় ধরে অফিসে কাজ করা, মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপ, মানসিক চাপ সব মিলিয়ে মানুষের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।
সবার পক্ষে সব মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। এমনকি কাজের চাপ বিপর্যস্ত করে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে। অনেকেই আত্মহত্যার মতো কাজও করে বসেন। শুধু যে কাজের চাপ তা নয়, আছে নানা রকম বাজে অভিজ্ঞতাও, যা ধীরে ধীরে মানুষকে বিষণ্ণ করে তোলে। ক্যারিয়ারবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্যারিয়ার এডিক্ট ডটকম জানিয়েছে এমনই দশ পেশার কথা, যে পেশার মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
১. বিজ্ঞানী
বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে আমাদের চাওয়াটা সব সময়ই বেশি থাকে। কারণ, পৃথিবীর সব আবিষ্কারে তাঁদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। মানুষ একসময় যেটা কল্পনা করত, সেটাকে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আর সে কারণে সব সময়ই নতুন আবিষ্কারের নেশায় মেতে থাকেন তাঁরা। কাজের চাপের পাশাপাশি চলে তুমুল প্রতিযোগিতা। কারণ, একই রকম আইডিয়া নিয়ে অনেকে একই সময়ে কাজ করে থাকেন। আর একটা আবিষ্কার বা গবেষণার পেছনে জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেন তাঁরা। তার পরও যদি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসে, তাহলে হতাশা ঘিরে ধরে সৃষ্টিশীল এসব মানুষকে। এই হতাশা থেকেই অনেক বিজ্ঞানীর আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়।
২. পুলিশ কর্মকর্তা
সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর একে একে ভালো-মন্দ সব ধরনের অভিজ্ঞতাই হয় পুলিশ কর্মকর্তাদের। তবে হিসাব করে দেখলে, খারাপ অভিজ্ঞতার পাল্লাই থাকে ভারী। কারণ, সারাক্ষণ অপরাধ আর অপরাধীদের নিয়ে থাকতে থাকতে একসময় বাকি মানুষের মতো সাধারণ জীবনযাপন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় না। নিজের অজান্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন স্বাভাবিক পৃথিবী থেকে। পাশাপাশি কাজের ঝুঁকি তো রয়েছেই। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ভুল সিদ্ধান্ত নিলে থাকে শাস্তির শঙ্কা। বিশ্রাম মেলে না একদমই, ছুটিছাটাও অন্য পেশার চেয়ে কম। এসব কারণে প্রায়ই দেখা যায়, পুলিশ কর্মকর্তারা হতাশায় ভুগে থাকেন। হতাশার কারণে আত্মহত্যাও করে বসেন কেউ কেউ।
৩. স্টক ব্রোকার
আর্থিক খাতে কাজ করাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে স্টক ব্রোকারদের কাজ যেমন অন্য মানুষের টাকার দেখাশোনা করা। কাজের ক্ষেত্রে সব সময়ই মারাত্মক চাপের মুখে থাকেন তাঁরা। থাকে ক্লায়েন্টদের বাড়তি প্রত্যাশা। আর স্টক মার্কেটের চরিত্রই হচ্ছে অস্থিতিশীল। যেকোনো সময় আকাশচুম্বী মুনাফা হতে পারে, আবার ক্ষতির পরিমাণটাও অনেক সময় আশাতীত। দামের এই ওঠানামার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে স্টক ব্রোকারদের ঝুঁকি। বিনিয়োগকারীদের মুনাফার মুখ না দেখাতে পারলে ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে স্টক ব্রোকারদের। এমন বিচিত্র জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে অনেকেই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।
৪. রিয়েল এস্টেট এজেন্ট
স্টক ব্রোকারদের মতো রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকমের। পারফরম্যান্সের প্রচণ্ড চাপ থাকে তাঁদের ওপর, ঝুঁকিও থাকে প্রচুর। আর প্রতিযোগিতার বাজারে সবকিছু মিলিয়ে অনেকেই চাপ সামলে উঠতে পারেন না।
৫. চিকিৎসক
চিকিৎসকদের কাজের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। প্রতিদিন রোগীদের সেবায় সময় কেটে যায় তাঁদের। আর রোগীদের এই ভোগান্তি বা অসুখ কখনো কখনো তাঁদেরও প্রভাবিত করে। চোখের সামনে মৃত্যু দেখতে হয় তাঁদের প্রতিনিয়ত। হয়তো যে রোগীকে প্রায় সারিয়ে তুলেছিলেন, তার মৃত্যুই ঘটে চোখের সামনে। অনেক সময়েই এসব কারণে মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখতে পারেন না চিকিৎসকরা। ঝোঁকের বশে আত্মহত্যার মতো কাজও করে বসেন অনেকেই।
৬. কৃষক
ভারতীয় কৃষকদের আত্মহত্যার খবর প্রায়ই আসে খবরের শিরোনাম হয়ে। অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বেশির ভাগ কৃষক। প্রতিবছরই কষ্ট করে ফসল ফলান তাঁরা। পাশাপাশি সেই ফসল বাঁচাতে যুদ্ধ করতে হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে। অনেক কৃষকই জীবনযুদ্ধে হার মেনে নেন।
৭. আইনজীবী
বেশির ভাগ আইনজীবীকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। যাঁরা করপোরেট আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের থাকে ভীষণ কাজের চাপ। প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা তৈরি, আইনি ঝামেলা সামাল দিতে গিয়ে টানা কাজ করতে হয় বেশির ভাগ সময়। আর অপরাধবিষয়ক আইনজীবীদের কাজ হচ্ছে যেকোনোভাবে মক্কেলকে আইনের প্যাঁচ থেকে ছুটিয়ে আনা। সে তিনি দোষী হোন বা নির্দোষ, তাতে কিছু যায়-আসে না। কাজের ক্ষেত্রে এত ধরনের জটিলতা সামাল দিতে না পেরে অনেক আইনজীবীই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।
৮. কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার
কনস্ট্রাকশন ম্যানেজাররা নির্মাণাধীন ভবনের কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকেন। স্বল্প বাজেট এবং বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে দ্রুত কাজ শেষ করতে হয় তাঁদের। মানটাও বজায় রাখা চাই এর সঙ্গে। এতসব চাপের কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায় এ পেশার মানুষেরও।
৯. শল্যচিকিৎসক
মেডিকেলবিদ্যায় থাকে একের পর এক পরীক্ষার চাপ। এর পর কর্মজীবনে প্রবেশ, সেখানেও প্রচণ্ড কাজের চাপ। অস্ত্রোপচার করা রোগীর মৃত্যু চাক্ষুষ করা সার্জনদের জীবনে প্রতিদিনের ঘটনা বললেও ভুল হয় না। এসব কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তাঁরা। ফলাফলে, আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি হয়।
১০. চিরোপ্র্যাকটিক
খুবই সংবেদনশীল এই চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করার আগে জীবনবিমা করে নেওয়া হয়। তবে এই চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুও হয়, আর এর ফলেই চিকিৎসকদের ওপর নেমে আসে মামলার খড়গ। তাই এই পেশার মানুষরাও অনেক সময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

ফিচার ডেস্ক