দৃষ্টিভঙ্গি
পুরুষের চোখে নারী

নারী, যাকে কখনো মা-রূপে, কখনো বধূ-রূপে, কখনো আবার কন্যা-রূপে দেখা যায়। আজ পৃথিবীর এসব নারীর জন্য বিশেষ একটি দিন। আজ ৮ মার্চ, বিশ্ব নারী দিবস। এদিন নারীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হয়, কোথাও বা নারীদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। কিন্তু আজকের এই দিনে জানব, নারীকে কীভাবে দেখেন পুরুষরা, বিশেষ করে যাঁরা নিজস্ব ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
ড. আনিসুজ্জামান
ইমেরিটাস অধ্যাপক
আমার চোখে নারী মাতৃমূর্তি, প্রেমিকামূর্তি, কন্যামূর্তি। এর বাইরেও নারীর অনেক রূপ আছে। নারীর জীবনের নানা অবস্থায় রূপভেদ হয়, পরিবর্তন হয়। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো যৌতুকের নামে অত্যাচার হয়, প্রেমের নামে অত্যাচার হয়, যা নারীর স্বাধীনতা ও মুক্তির অন্তরায়। নারীকে সামনের দিকে এগোতে হলে এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের প্রাপ্তি একটাই, নারীদের সামাজিক অগ্রগতি।
অসীম সাহা
কবি
নারী মানে মাতৃজাতি। আমার কাছে নারী হচ্ছে মা, প্রেমিকা, বধূ, কন্যা, ঈশ্বরী। আমি যে কথা বলছি, বেঁচে আছি এটা কখনোই সম্ভব হতো না যদি নারী না থাকত। যদি মাতৃগর্ভে জন্ম না নিতাম, তাহলে এই কথাগুলো বলতেও পারতাম না। নারীর মর্যাদা আমার কাছে অনেক উঁচু পর্যায়ে। তবে আমি মনে করি না, নারীরা অনেক দূর এগিয়েছে। পুরুষরা নারীর অগ্রগতির পথে অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ জন্য নারীরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে নারীদের উন্নতি সম্ভব নয়। নারীরা যতই উচ্চপর্যায়ে যাক না কেন, বাস্তবে আমরা প্রতিমুহূর্তে তাঁদের হেয় করছি। নারীর অপমান মানে মানবজাতির অপমান। আর কোনো পুরুষের মানবজাতিকে অপমান করার কোনো অধিকার নেই।
শুভাগত চৌধুরী
চিকিৎসক
নারীর তো বহুরূপ। বহু গুণে গুণান্বিত নারী। বর্তমান সময় নারী অনেক মুক্ত, স্বাধীন। অনেক পুরুষই এখন নারীর মুক্তি চায়। তবে অনেক নারীই নারীদের মুক্তি চায় না। একান্নবর্তী পরিবার না থাকার কারণে শেয়ারিং-কেয়ারিং অনেকটা কমে গেছে। আগে ভালোলাগা, দুঃখ, বেদনা সবকিছু ভাগাভাগি করে নেওয়া হতো। এখন আর সেই উপায় নেই। এখন নারীরা অবশ্য ঘরের মধ্যে বন্দি নেই। অনেক মুক্ত, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল তারা। বলতে গেলে, এখন বহিরাঙ্গ ও অন্তরাঙ্গ অনেকটাই বিস্তৃত। তবে সবকিছু ভাগাভাগির অভ্যাসটা এখন আর নেই। এখনো বিভিন্ন পরিবারে দেখে যায়, এক নারী অন্য নারীর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এখনো অনেক মা ছেলেকে বেশি দেয় আর মেয়েকে কম। মা নিজেই এ বৈষম্য তৈরি করছে। এই ধারণা পুরোপুরি না বদলাতে পারলে নারীদের মুক্তি নেই। আমি মনে করি, নারী-পুরুষ সমান সমান না। বর্তমানে নারীরা একটু এগিয়েই রয়েছে। তবে বেশি নারীবাদী হওয়াও ঠিক না। অনেক নারী মনে করেন, পুরুষ ছাড়াই সমাজ চলে। এই ধারণা ঠিক নয়। নারী ছাড়া যেমন সমাজ চলে না, তেমনি পুরুষ ছাড়াও সমাজ চলতে পারে না।
আবদুন নূর তুষার
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
আমার চোখে নারী একজন মানুষ। যার আমার মতই হাত-পা আছে, চোখ আছে, কথা বলতে পারে। আমি আলাদা করে কিছু দেখি না। তবে নারী গর্ভধারণ করতে পারে। তাঁর আমার চেয়ে শক্তি বেশি। পুরুষদের থেকে নারীরা বাঁচেও বেশি। তবে আমরা পুরুষরা উইন্ডোজের (কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম) আগের ভার্সন আর নারীরা হলো উইন্ডোজের পরের ভার্সন। আমি মনে করি, নারী-পুরুষ দুজনই সমান শক্তিশালী। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, প্রজাতির দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা এখনো একধাপ পিছিয়ে রয়েছে। আর সমাজ ও গণমাধ্যম নারীকে যে দৃষ্টিতে দেখে, তাতে আমার আপত্তি রয়েছে। কারণ, তাঁরা নারীকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করছে। এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো খুবই প্রয়োজন।
মিনহাজুল আবেদীন নান্নু
সাবেক ক্রিকেটার
নারীকে আমি যথেষ্ট সম্মানের চোখে দেখি। সেটা সব ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই। আমি মনে করি, দারুণ ক্ষমতা রয়েছে নারীর মধ্যে। তাই প্রতিটি বিষয়ে নারীদের সমঅধিকার জরুরি। বর্তমানে নারীদের অনেক বিষয়েই পরিবর্তন এসেছে। তবে আমি মনে করি, সব ক্ষেত্রে নারীদের কোটা সিস্টেম উঠিয়ে দেওয়া উচিত। এতে নারীরা নিজেদের দক্ষতায় আরো বেশি উন্নতি করতে পারবে। নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সফল হচ্ছে। তাই তাঁদের কোটার মধ্যে বন্দি রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।
ফেরদৌস আহমেদ
চিত্রনায়ক
নারীকে আমি মানুষ হিসেবেই দেখি। নারী-পুরুষ আলাদা করে দেখার কিছু নেই। পুরুষদের যে অধিকার আছে, নারীদেরও সেই অধিকার আছে। আমাদের সমাজের হীনমন্যতার কারণে নারীরা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। আমি মনে করি, প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অনেক বেশি। আর প্রত্যেক নারীর মধ্যেই মাতৃত্ব রয়েছে। তাই যদি নিজের মাকে সম্মান করা যায়, তাহলে সব নারীকেই সম্মান করা সম্ভব। মা হওয়ার কষ্টের অনুভূতি একজন পুরুষ কখনোই অনুভব করতে পারবে না। যখন থেকে এই বিষয় অনুভব করতে পারবে, তখন নারীর প্রতি অন্যায়-অত্যাচার অনেকটা কমে যাবে। আগেকার দিনে পুরুষরা নারীকে বিয়ে করে আনত শুধু ঘরের কাজ করার জন্য, সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য। এখন এই ধারণা অনেকটা বদলে গেছে। যোগ্যতার দিক থেকে প্রত্যেকেই সমান। তাহলে কেন একজন ঘরে বসে থাকবে আর অন্যজন বাইরে কাজ করবে? দুজন সমানভাবে কাজ করলে অর্থনৈতিকভাবে পরিবার সচ্ছল হয়, সমাজ সচ্ছল হয়, রাষ্ট্র সচ্ছল হয়। তবে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য একটু সহনশীল হওয়া জরুরি। তাঁদের মমতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত। নারীরা অনেক কঠিন কাজ করছে। তাই তাঁদের অগ্রগতির জন্য আমাদের অনেক সহজ হতে হবে।

জান্নাতুল এ্যানি