রামপাল প্রকল্প
ধ্বংসকে ধ্বংস দিয়ে ঠেকাতে হয় না!
রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে চলমান আলোচনা এখন কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে এখন সেটা বিশ্ব-টেবিল পর্যন্ত পৌঁছেছে। ইউনেস্কো এ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়বে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, তারা তাদের আপত্তি জানিয়েছে। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশের বাঙালিরা সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্পের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদ্য-সমাপ্ত সুইজারল্যান্ড সফরেও এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। আর এদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের চলমান আন্দোলনের এ পর্যায়ে আন্দোলনরত মানুষদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠনের পক্ষে ঢাকায় অর্ধদিবস হরতালেরও ডাক এসেছে।
২৬ জানুয়ারি ঢাকায় আহূত হরতালকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করতে পারছি না, তবে সুন্দরবন রক্ষার দাবি ও এ সম্পর্কে চলমান আন্দোলনকে সমর্থন করি। মানুষের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে যদি সুন্দরবন বিনাশী এ প্রকল্প বাতিল ও স্থান পরিবর্তন হয় তবে সেটা হবে জনতার বিশাল বিজয়। হরতালের মাধ্যমে রাষ্ট্রের যে বিপুল ক্ষতি হবে তার খেসারত দেবে দেশ। আন্দোলনরত সংগঠনগুলো এ ধরনের কর্মসূচি না দিয়ে তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারত এবং দীর্ঘদিন থেকে সেটাই করে আসছিল।
কিন্তু হঠাৎ করে হরতালের মতো জনসম্পৃক্ততাহীন কর্মসূচি কেন দিল তা বোধগম্য নয়। এর ফলে রামপাল-প্রকল্পের বিরুদ্ধে গড়া ওঠা জনমতকে বেশ বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছেন আন্দোলনকারী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলো।
রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যে অভিযোগ সেটা হলো এর মাধ্যমে সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিনষ্ট হবে। এটা একদিনে হবে তা না, আস্তে আস্তে হবে। এ প্রকল্পের জ্বালানি জোগাতে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদ দিয়ে বড় বড় জাহাজ চলাচল ও দুর্ঘটনার কারণে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে বলে আশঙ্কা। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বন্দোবস্তের আশার বাণী শোনানো হয়েছে; কিন্তু এগুলো যে স্রেফ কাগুজে কথা তার প্রমাণ জানুয়ারিতেই ঘটে যাওয়া এক জাহাজ ডুবি যেখানে হাজার টন কয়লা নিয়ে বড় জাহাজ ডুবেছিল সুন্দরবনের কাছেই। এর আগে তেলবাহী লরি ডুবেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুন্দরবন। এখন পর্যন্ত রামপাল প্রকল্পের কাজ জোরলয়ে শুরু না হওয়ায় ওই রুট দিয়ে পণ্যবাহী বিশেষত কয়লাবাহী যান টানা চলাচল না করলেও মাঝে মাঝে চলাচল করছে, এবং দুর্ঘটনাও ঘটছে। রামপাল প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে শুরু হয়ে গেলে ওই রুট দিয়ে পণ্যবাহী যান চলাচল সংখ্যাও বেড়ে যাবে, দুর্ঘটনাও বাড়বে; যার খেসারত দেবে সুন্দরবনই।
এদিকে, দেশে-বিদেশের পরিবেশবাদীদের আপত্তির মুখে পড়েছে রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি। আপত্তিকারীদের দাবি এর মাধ্যমে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউনেস্কো এ আপত্তিকে যৌক্তিক ভেবে তাদের অভিমত জানিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইউনেস্কোর চিঠির জবাব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে, তবে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এটা বুঝা যায় আপত্তি যাই হোক না কেন তারা রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নে মরিয়া। উপরন্তু রামপাল-প্রকল্পের বিরোধিতাকারীরা টাকা খেয়েছে এমন এক অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে রামপালের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে টাকা খাওয়ার অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, দেশের বাইরের বিভিন্ন পরিবেশবাদী যারা রামপালের বিরোধিতা করছে তারাও টাকা খেয়েছে এমন অভিযোগ তাঁর। এর সর্বশেষ প্রমাণ সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউএফ) সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর বক্তব্য।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলন শেষে গত শনিবার (২১ জানুয়ারি) গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তৃতায় শেখ হাসিনা রামপাল ইস্যু নিয়ে পরিবেশবাদীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার পেছনে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের হাত দেখছেন। ইউনূস ও তাঁর মতাদর্শের লোকজন টাকা দিয়ে পরিবেশবাদীদের দ্বারা এই প্রশ্ন উত্থাপন করিয়েছেন বলে ধারণা তাঁর। গত ১৫ জানুয়ারি ডব্লিউএফ সম্মেলনে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে যান প্রধানমন্ত্রী। ১৭ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ডাভোসে ডব্লিউইএফের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরিবেশবাদী আল গোর রামপাল প্রসঙ্গ তুলে আনেন। আল গোর বলেন, গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত সৌরশক্তির প্যানেল স্থাপনকারী দেশ ছিল। কিন্তু এখন সেই গতি ধীর হয়ে গেছে। এখন সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনে পরিবেশ দূষণকারী একটি নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। হাজার হাজার মানুষ এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আল গোরকে রামপাল ঘুরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের পরিবেশ-প্রকৃতিসহ যেকোনো ইস্যুতে তার চেয়ে বেশি আর কেউ চিন্তিত থাকেন বলে তিনি মনে করেন না। শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘আমার সরকার দেশের ক্ষতি হবে এমন কোনো পদক্ষেপ কখনোই নিতে পারে না। আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশের প্রতি আমার মায়া এবং দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশের সামান্যতম ক্ষতি হবে এমন কোনো কাজ আমি হতে দেব না।’
প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে আবেগকে উসকে দেওয়ার নামান্তর। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ইউনূসকে আওয়ামী লীগের লোকজন শত্রু মনে করে, একইভাবে ইউনূসও আওয়ামী লীগকে নিজের শত্রু মনে করেন। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য কতটা বাস্তবসম্মত আর কতটা ঢালাও দোষারোপ ও পূর্ব শত্রুতা থেকে উদ্ভূত, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তা ছাড়া রামপাল প্রকল্পের বিরোধী যেকোনো কিছুতে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর পরিষদ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা টাকার গন্ধ খুঁজলেও অদ্যবধি কে, কোথায়, কত টাকা দিয়েছে আর খেয়েছে সে প্রমাণ কোনো সময়ই হাজির করতে পারেনি। ফলে এটা ধারণা করা যায় যে, রামপাল প্রকল্পের বিরোধী যেকোনো কণ্ঠকেই প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিষদ টাকা-খাওয়া কণ্ঠ মনে করেন; সেটা প্রান্তিক কৃষক রহিমুদ্দিন হোক আর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর যে-ই হোক না কেন! এটা সাধারণীকরণ এবং একই সঙ্গে অযৌক্তিক।
এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, দিন দিন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, দরকার বাড়তি উৎপাদন। বিদ্যুৎপ্রাপ্তির মতো নাগরিক সব চাহিদা পূরণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও তারা দায়বদ্ধ। এ অঙ্গীকারপূরণ ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি মাথায় রেখেই উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা উচিত। বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার মতো আর কোনো জায়গা নেই- এমনতো না! তাহলে সুন্দরবন ঘেঁষে রামপাল কেন? রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটা আন্দোলনকারী ও সরকারবিরোধীদের বক্তব্যই কেবল নয়, এটা স্বীকার করেছেন স্বয়ং সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও। তাহলে পরিবেশবিনাশী এমন সিদ্ধান্ত কেন? আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হয়নি, এ কারণে সরকারের জনসমর্থনে ব্যাপক ধস নেমেছে- এমন তো না, বরং সরকারের সে সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হয়েছে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন থেকে সরকার সরে আসলে সরকারের পরাজয় কিংবা পতন হয়ে যাবে এমন না। বরং প্রশংসিত হবে। আর জেদের কারণে জোর করে সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র করে নিলে উলটো সমালোচিত হবে এবং জনসমর্থন কমবে।
রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র না করে অন্য কোথাও সে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার সুযোগ আছে, কিন্তু অপ্রকাশ্য প্রভাবের কারণে হলেও সুন্দরবন ধ্বংস হলে সে সুন্দরবন আর পাওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ধ্বংস হয়তো একদিনে কিংবা মাত্র পাঁচ বছরে হবে না; আস্তে আস্তে হবে। সরকারের সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন ও মেয়াদকে পাঁচ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না ভেবে সারা জীবনের জন্য ভেবে দেখার অনুরোধ করি। স্বাভাবিকভাবেই একটা সরকার সারাজীবন থাকে না, আপনারাও থাকবেন না; কিন্তু সরকারি এ সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগের রেশ থেকে যাবে আজীবনের জন্য। সুন্দরবনকে পাঁচ কিংবা দশ বছর মেয়াদি কোনো বিষয় না ভেবে এটাকে আজীবনের এক বিষয় ভেবে সুন্দরবনবিনাশী যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকুন; এটা অনুরোধ ও দাবি।
একই সঙ্গে আন্দোলনরত ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর প্রতি অনুরোধ হরতাল-ধর্মঘট হলো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া, সুন্দরের পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে ধ্বংসে আশ্রয় নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। রামপাল প্রকল্পের মধ্য দিয়ে সরকার সুন্দরবন ধ্বংস করছে- এমন অভিযোগের বিপরীতে সৃষ্টিকে চলমান রাখার যে আন্দোলনে নেমেছেন সে সৃষ্টির অব্যাহত রাখতে গিয়ে ধ্বংসকে আলিঙ্গন করবেন না। ধ্বংস দিয়ে ধ্বংস ঠেকানোর সিদ্ধান্ত সুখকর হয় না, এটা অপরিণামদর্শী!
লেখক : কবি ও সংবাদকর্মী

কবির য়াহমদ