সবকিছু ভেঙে পড়ছে কেন?
২৮ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার। এনটিভি অনলাইনে উঁকি দিয়েই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কয়েকটি সংবাদ দেখে মনে হলো আমাদের সবকিছু ভেঙে পড়ছে। নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সম্পর্ক, প্রেম, স্নেহ—সবকিছুই যেন ভেঙে পড়ছে। ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরের নিদর্শনগুলো। দিন যতই যাচ্ছে আমরা যেন ততই নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। পত্রিকার খবর পড়লে প্রতিদিনই সবকিছু ভেঙে পড়ার দৃশ্যগুলো আমরা দেখতে পাই। কী না হচ্ছে এখন? কতটা নিচেই না নামছি আমরা। ২৮ ডিসেম্বরের এনটিভির খবরের কথা বলছিলাম। কয়েকটি খবরে চোখ রাখা যাক।
ক. গত মঙ্গলবার মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার হাফিজুর রহমান তার ছোট ভাইয়ের অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসক দেখানোর কথা বলে একটি অপরিচিত খালি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। এ সময় ওই নারীর চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এলে হাফিজুর পালিয়ে যায়। এ বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
খ. সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে জহুরা বেওয়াকে (৫৫) খুন করেছে তার ছেলে টুটুল। পুলিশ জানায়, মায়ের সাথে ঝগড়ার একপর্যায়ে রান্নাঘরে থাকা বঁটি দিয়ে মায়ের গলা কাটে টুটুল। পরে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পালিয়ে যেতে দেখলে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।
গ. মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি চৌধুরী মঈনুদ্দীন লন্ডনে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। অথচ তাঁর নামে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য সান জানিয়েছে, এই যুদ্ধাপরাধী এখন লন্ডনের প্রাসাদোপম বাড়িতে থাকছেন। দ্য সান চৌধুরী মঈনুদ্দীনের একাধিক ছবিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোনো শপিংমল থেকে কেনাকাটা শেষে দামি গাড়িতে চড়ে যাচ্ছেন তিনি।
ঘ. গত ১৮ ডিসেম্বর মাদারীপুর পৌরসভার এক কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে যৌন ব্যবসা করানোর জন্য বিক্রি করে দেয় ওই এলাকার হাসান শরীফ। গত শুক্রবার মাদারীপুর সদর উপজেলার একটি এলাকা থেকে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে তার পরিবার। পরে কিশোরীর পরিবার সালিশ-মীমাংসায় বসলে সালিশদার আইয়ুব খান, মুজাম খান, সামসুল হক খান ওই কিশোরীকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বার জুতা দিয়ে পেটানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে হাসান শরীফকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১০ বার জুতাপেটা করার নির্দেশ দেন।
ঙ. জাতীয় ক্রিকেট লীগের শেষ রাউন্ডের ম্যাচে ঢাকা মেট্রোর বিপক্ষে খেলছিল সাব্বির রহমানের রাজশাহী বিভাগ। এই ম্যাচে ব্যাট হাতে কোনো রানই করতে পারায় দর্শকদের কটূক্তির শিকার হন তিনি। কিন্তু দর্শকদের টিপ্পনী হজম করতে পারেননি সাব্বির। অভিযোগ উঠেছে, ইনিংস শেষে বাজে মন্তব্য করা এক দর্শককে মাঠের বাইরে ডেকে এনে বেশ কয়েকটি থাপ্পড় মারেন সাব্বির।
চ. ব্র্যাক ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা নাইমুল ইসলাম নিখোঁজ হয়েছেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন নাইমুলের স্ত্রী তামান্না খান মৌ।
সবগুলো খবরই কি অবাক হওয়ার মতো না? একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন! অন্যদিকে ভাশুরের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ছোট ভাইয়ের অসুস্থ স্ত্রী! ভাবা যায় কতটা অমানুষ হয়ে গেছি আমরা? এক দর্শককে থাপ্পড় মারার অভিযোগ ক্রিকেটার সাব্বিরের বিরুদ্ধে। তাহলে বাদ থাকল কে? সবাই অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছি? এতটাই অসহিষ্ণু যে, কথাকাটির জের ধরে ছেলে মাকে খুন করে ফেলেছে ছেলে ! নিখোঁজ হওয়ার মিছিলও থেমে নেই। আজ অমুক নিখোঁজ হচ্ছেন তো কাল তমুক নিখোঁজ হচ্ছেন।
এভাবে কত দিন চলবে? সরকারের করণীয় কী? মানুষেরই বা করণীয় কী? আপাতদৃষ্টিতে এসব ঘটনাকে অনেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলতে চাইবেন। কিন্তু এসব মোটেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিদিনই পত্রিকা খুললে এমন অনেক ঘটনার মুখোমুখি আমাদের হতে হয়। বড়জোর আমরা ঘৃণা প্রকাশ করি, চায়ের দোকানে আলোচনা করি। প্রতিদিন যে ঘটনা ঘটে তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং সত্যটা স্বীকার করে নিয়ে সমাধানের পথ বের করাই উত্তম।
এটা সত্যি যে, আমাদের সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে। মানুষ অসহিষ্ণু ও অমানবিক হয়ে যাচ্ছে। মানসিক বিকৃতিও হচ্ছে অনেকের। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের কথা না-ই বললাম। চারদিকের ঘটনাবলি দেখে প্রতিদিনই মনে হয়, সবকিছু যেন ভেঙে পড়ছে। পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ। সমাজপতিরাও ভুল আচরণ করছেন। নতুবা, যে মেয়েটিকে যৌন ব্যবসার জন্য বিক্রি করে দেওয়া হলো, যে কিশোরী ভিকটিম—তাকে কেন জুতো মারার আদেশ হবে? সে কেন অপরাধীর সাথে সাথে শাস্তি পাবে? সমাজের সবস্তরে ঘুণে ধরেছে। ঘুণে ধরেছে আমাদের মনে-মননে। নতুবা সবকিছুতে এত অধঃপতন কেন হবে?
আমরা বাঙালি। আমরা আশাবাদী মানুষ। আমরা প্রতিবাদ করতে জানি, রুখে দাঁড়াতে জানি। আমরা নতুন করে গড়তে জানি। সামাজিক অবক্ষয় রোধের জন্য সচেতন সবাইকেই বিশেষভাবে কাজ করতে হবে। নতুবা মানবিকতা ও শুভবোধের যে ভাঙন, অবক্ষয় ও অনৈতিকার যে উল্লাস—তা বন্ধ করা যাবে না। সরকারকে এ ক্ষেত্রে জোরালো অবস্থান নিতে হবে। অন্যায়ের জন্যে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি দিলেই কেবল হবে না, সাথে সাথে সামাজিক সচেতনতাও সৃষ্টি করতে হবে। আমরা সবাই উজ্জ্বল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। আমরা জানি, আমাদের সবার চেষ্টাতেই বাংলাদেশ ‘সোনার বাংলা’য় পরিণত হবে।
লেখক : গল্পকার ও সম্পাদক, বাঁক।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান