অভিমত
বছর শেষে ফেসবুক ভাবনা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে বিশ্বজুড়ে ফেসবুক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এ মাধ্যমটি যোগাযোগকে যেমন সরল করেছে, তেমনি তথ্যের প্রবাহকে করেছে গতিময়। সে-কারণে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, সমস্যা, সম্ভাবনা, নাগরিক ভাবনাসহ নানা বিষয় ফেসবুকের কল্যাণে আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি ফেসবুকে দেশের কোন স্থানে কী হচ্ছে, দেশের আলোচিত বিষয় কী ইত্যাদি সম্পর্কেও আমরা জানতে পারি। মানুষের আগ্রহ ফেসবুকে বেশি বলে এ মাধ্যমটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল মার্কেটপ্লেস। বিজ্ঞাপন, বিপণন, সংবাদ পরিবেশন, জনমত গঠন, জরিপসহ হরেক রকম কাজই এখন ফেসবুকে পরিচালিত হচ্ছে। এমন অসংখ্য ইতিবাচক দিক ফেসবুকের রয়েছে আবার একইসাথে নেতিবাচক দিকেরও কমতি নেই।
ফেসবুক আমাদের জন্যে কল্যাণকর নাকি অকল্যাণকর সেটির দায় ফেসবুকের নয়, সেটি নির্ধারিত হয় আমাদের ব্যবহারের ওপর। ফেসবুকের যে নেতিবাচক ব্যবহার--তার দায়ও আমাদের এবং এর থেকে উদ্ভুত সমস্যার ভোক্তভোগীও আমরা।
তথ্য প্রবাহের কথা শুরুতেই বলেছিলাম। ফেসবুক ব্যবহারকারী সহজেই তার ভালো লাগা, সমস্যা, কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে তার অভিমত পোস্ট করতে পারেন। তার বলা কথাগুলো বা ছবি সম্পর্কে বন্ধু তালিকায় থাকা মানুষজনও পড়তে ও দেখতে পারেন এবং সে বিষয়ে তাদের মন্তব্যও ব্যক্ত করতে পারেন। এই যে অভিমত ব্যক্ত করা, প্রতিবাদ জানানোর সহজ পক্রিয়া, এটির মধ্যে দিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের অবস্থান ও চিন্তা তুলে ধরতে পারছি। ফেসবুক না থাকলে হয়তো অনেক বড় বড় ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যেত। কিশোর রাজন হত্যার কথা কে না জানেন। রাজনকে নির্যাতনের কথা প্রথমে ভাইরাল হয় ফেসবুকে। রাজনকে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে যায় সবখানে। রাজন হত্যার বিচারের জোর দাবি তোলে আপামর মানুষ। অনলাইনে, এই তথ্য প্রবাহের যুগে ‘রাজন হত্যা’র প্রতিবাদকে জোরালো করতে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অর্থবহ ভূমিকা নিঃসন্দেহে ছিলো। গণজাগরণ মঞ্চ, তনু হত্যা, রানা প্লাজা ধসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ফেসবুকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আরো অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। ফেসবুকে কেউ কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করেছেন, সমস্যা তুলে ধরেছেন-পরবর্তীতে সেই প্রতিবাদ গণশক্তিতে রূপ লাভ করেছে। পাশাপাশি মিলেছে সমাধানও।
এবার ফেসবুকের নেতিবাচক রাজ্যে উঁকি দেয়া যাক। নেতিবাচক ঘটনা কম ঘটলেও এটিকে হেলাফেলা করে দেখার কারণ নেই। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত ফেসবুকের অপব্যবহার বিষয়ের একটি পরিসংখ্যানে দৃষ্টি দেখা যাক :
২০১৪ ও ২০১৫ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সাইবার সেলে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত ১৭ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছিলো। এ অভিযোগকারীদের মধ্যে ৭০ ভাগ নারী। তাদের অধিকাংশের অভিযোগ ছিলো তারা ফেসবুকের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে যে কেউই সহজে ফেসবুকের অপব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করতে পারবেন।
ফেসবুক উন্মুক্ত মাধ্যম। ফেসবুকে অনেকে নাগরিক সাংবাদিকতা করেন। সাংবাদিক ও নাগরিক সাংবাদিকের মধ্যে মূল পার্থক্য পেশাগত ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। সাংবাদিকরা পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করেন, কোনো সংবাদ পরিবেশনের আগে সেটা যাচাই করেন এবং সংবাদটি কতটা প্রকাশযোগ্য সেটি পত্রিকা বা চ্যানেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করেন। সাংবাদিক ইচ্ছে করলেই কোনো সংবাদ প্রচার করতে পারেন না। অন্যদিকে ফেসবুক ব্যবহারকারীর কোনো পেশাদারিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নেই। তিনি ইচ্ছে করলেই কোনো ছবি বা তথ্য প্রচার করতে পারেন। ফলে এ মাধ্যমে ভুল বা অসত্য বা অপূর্ণাঙ্গ তথ্য পরিবেশন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি রয়েছে। আবার অনেকে অসচেতনভাবে ফেসবুকে ভুল তথ্য, ছবি প্রচার করে থাকেন। এসব প্রচার নিঃসন্দেহে আমাদের জন্যে নেতিবাচক ফল ও বিভ্রান্তি বয়ে আনে। এ নেতিবাচকতা যে কতটা কদর্যে গিয়ে পৌঁছতে পারে তার উদাহরণ আমরা একটু আগেই দিয়েছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে : এ সমস্যা থেকে উত্তরণে করণীয় কী? প্রথম করণীয় হচ্ছে আমাদের সচেতনতা। ফেসবুক উন্মুক্ত মাধ্যম হলেও আমরা যখন কোনো কিছু পোস্ট করবো, বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবো, অথবা কোনো পোস্টে কমেন্ট করবো তার আগে ঐ বিষয় সম্পর্কে আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। কোনো কিছু পোস্ট করতে গিয়ে সেখানে কোনো ভুল তথ্য আছে কিনা, যেসব তথ্য উপস্থাপন করেছি সেগুলো সত্য কিনা তা যাচাই করে নিতে হবে। একজন ভুল তথ্য পোস্ট করলে অনেকে সে ভুল তথ্যটি পাবে এ বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে। বন্ধু নির্বাচনেও আমাদের সচেতন হতে হবে। অন্যদিকে আমরা যারা কমেন্ট বা শেয়ার করি, লাইক দিই, অভিমত জানাইÑতখন আমাদের বিবেচনা করা উচিত এখানে দেয়া তথ্যগুলো কতটা সঠিক ও যুক্তিযুক্ত? এসব তথ্যের উৎস্য কতটা নির্ভরযোগ্য? এসব বিষয় মাথায় রেখেই তবে কোনো পোস্টে কমেন্ট করা উচিত। ফেসবুকের কোনো পোস্ট বা প্রতিক্রিয়া কেবল একজনের একক প্রতিক্রিয়া নয়, এই প্রতিক্রিয়ায় অনেকে প্রভাবিত হতে পারে।
ফেসবুকে প্রায় সময়ই গুজব দেখি-- সাকিব আল হাসান মারা গেছেন, অমুক নায়ক আর নেই, অমুক নায়িকা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ইত্যাদি ইত্যাদি পোস্ট। যারা এসব পোস্ট দেয় তাদেরকে বন্ধু তালিকায় না রাখাই উত্তম। এসব পোস্ট দেখার পর কোনো নির্ভরযোগ্য পত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে খবর দেখা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খবরসমূহ নিঃসন্দেহে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া প্রচার করবে। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত হয়েই ফেসবুকে আপনার পোস্ট ও মন্তব্য করা উচিত। যদি গুজবে আমরা কান দিই, তবে তার ব্যর্থতা ও দায় আমাদের উপরই বর্তাবে এবং ব্যক্তির সম্মানকে ক্ষু্ন্ন করবে।
ফেসবুকের তথ্যগুলো আমাদের দেয়াই তথ্য। এ তথ্যের প্রবাহকে কাজে লাগিয়েই আমরা নিজের ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারি। ফেসবুকে কোনো বিষয়ে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য অভিমত জানাতে পারি, জানাতে পারি আমাদের সমস্যা, সম্ভাবনার কথা। কদিন আগে আমরা দেখেছি, বন্যার্তদের সহযোগিতা করার জন্যে ফেসবুকে প্রচুর মানুষ সাহায্য চেয়ে পোস্ট করেছেন। সে সাহায্য বন্যার্তদের মাঝে পৌঁছে দেয়ার ছবিও আমরা ফেসবুকে দেখেছি। এমন অনেক ভালো কাজ ফেসবুকের কল্যাণে হচ্ছে। নতুন বছর হাতছানি দিচ্ছে। ফেসবুক নিয়ে নতুন করে ভাবতে পারি আমরা। আগামীতে ফেসবুকের তথ্য প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন করে কোনো প্রাণহানি, অঘটন ঘটবে না--এমন প্রত্যাশা করছি। আর এ প্রত্যাশা বাস্তবায়নে আমার, আপনার সহযোগিতা এবং সচেতনতা অনেক বেশি জরুরী।
লেখক : গল্পকার ও সম্পাদক, বাঁক।

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান