কেন দাম আগের অবস্থায় ফেরে না, কী করলে সত্যিই স্বস্তি মিলতে পারে
যখন বলা হয় মুদ্রাস্ফীতি কমছে, তখন সংবাদগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক শোনায়। মনে হয় যেন বাজারদরও কমতে শুরু করেছে। কিন্তু আপনি বাজারে যান, কিংবা বিদ্যুতের বিল হাতে নেন—দেখেন কিছুই সস্তা হয়নি। আপনার এই অনুভূতি একেবারেই ভুল নয়। কারণ সংবাদে প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে যায়।
‘মুদ্রাস্ফীতি’ বলতে বোঝায় দাম বাড়ার গতি। এটি পণ্যের দাম নয়। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতি কমে গেলেও পণ্যের দাম কমে যায় না; বরং আগের তুলনায় একটু ধীর গতিতে বাড়তে থাকে।
ধরুন, এ বছর মে মাসে কোনো পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। যদি আগামী বছর সেই বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ হয়, তাহলে ১০০ টাকার একটি পণ্যের দাম প্রথমে হবে ১০৯ টাকা, এরপর হবে প্রায় ১১৮ টাকা। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতির হার কমেছে, কিন্তু আপনার খরচ কমেনি—বরং আরও বেড়েছে।
বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। একটি বাস পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠছে। বাসের গতি কমিয়ে দিলে কি সেটি আবার পাহাড়ের নিচে নেমে আসে? না। শুধু ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে। মুদ্রাস্ফীতি কমার অর্থও ঠিক এটাই—দাম বাড়তে থাকে, তবে আগের চেয়ে কিছুটা ধীরে।
আসলে পণ্যের দাম সত্যিকার অর্থে কমতে হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে হয়—কারখানা বন্ধ হয়, কর্মসংস্থান কমে যায়, ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতি কেউই চায় না।
এ বছরের বাজেটেও সরকার ৭ থেকে ৮ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ সরকারের সর্বোত্তম প্রত্যাশাও হলো—আপনার জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে, তবে আগের তুলনায় কিছুটা কম গতিতে।
এ কারণেই অনেক সময় বেতন বাড়লেও মানুষের মনে হয় আয় কমে গেছে। গত মাসে যদি পণ্যের দাম ৯ শতাংশ বাড়ে, কিন্তু বেতন বাড়ে মাত্র ৮ শতাংশ, তাহলে বাস্তবে সেই ব্যক্তি আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারবেন। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস। অর্থাৎ আয় বাড়লেও যদি দাম আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে আপনার টাকার প্রকৃত মূল্য প্রতি মাসেই কমতে থাকে।
এই মূল্যবৃদ্ধির সব কারণ দেশের ভেতরের নয়। বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ শুরু হলে, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। তার প্রভাব এসে পড়ে আমাদের বিদ্যুৎ বিল, বাসভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
তাহলে সমাধান কী? এ ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একসময় তুরস্কে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল। কয়েক বছরের মধ্যে তা এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। কীভাবে? তারা বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখে, নিজেদের মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখে যাতে আমদানি আরও ব্যয়বহুল না হয়ে ওঠে এবং সরকারের ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণে আনে—অর্থাৎ সামর্থ্যের বাইরে খরচ করা থেকে বিরত থাকে।
এই নীতিগুলো কার্যকর হয়েছিল। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—মুদ্রাস্ফীতি কমলেও পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি দামই পরিশোধ করেছে। আর যখন সেই আর্থিক শৃঙ্খলা শিথিল হয়েছে, তখন মুদ্রাস্ফীতি আবার দ্রুত বেড়ে গেছে।
এটাই বাস্তবতা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ নয়। এটি দীর্ঘ সময়ের, কঠিন এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল। এর কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। একটি স্থিতিশীল মুদ্রা, নিয়ন্ত্রিত সরকারি ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য—এই তিনটিই সফলতার মূল চাবিকাঠি। শুনতে যতই সাধারণ লাগুক, কার্যকর পথ এটিই।
যেসব দেশ এই নীতিতে অটল থাকে, তারা শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়। আর যারা মাঝপথে নীতি থেকে সরে যায়, তাদের শেষ পর্যন্ত আরও বড় মূল্য দিতে হয়। তাই পরেরবার যখন শুনবেন ‘মুদ্রাস্ফীতি কমছে’, তখন অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার আগে দুটি সহজ প্রশ্ন করুন— প্রথমত, পণ্যের দাম কি এখনও বাড়ছে? দ্বিতীয়ত, আমার আয় কি সেই দামের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে?
যদি দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে টেলিভিশনের সুসংবাদ এখনও আপনার জন্য সত্যিকারের সুসংবাদ নয়।
লেখক: ফাহিম চৌধুরী একজন বিনিয়োগ ব্যাংকার। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক রিটেলবুকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এর আগে তিনি সিটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ৩০টিরও বেশি দেশে ৫০০টির বেশি পুঁজিবাজারভিত্তিক লেনদেনে পরামর্শ দিয়েছেন, যার মাধ্যমে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূদলধন সংগ্রহ করা হয়েছে।

ফাহিম চৌধুরী