ক্রীড়াঙ্গনে আধুনিকায়নের কারিগর খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আপসহীন কণ্ঠস্বর, রাজপথের লড়াকু নেত্রী কিংবা আন্দোলনের অকুতোভয় সেনানী—বিশেষণগুলো বেগম খালেদা জিয়ার নামের সমার্থক। তবে রাজনীতির চেনা ময়দানের বাইরেও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে তাঁর ছিল এক নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক। পর্দার আড়ালে থেকে তিনি কেবল পৃষ্ঠপোষকতাই করেননি, বরং বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়া কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আজ তাঁর চিরবিদায়ের ক্ষণে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ক্রীড়াপ্রেমীরা হারাল তাদের এক নিভৃত স্বপ্নদ্রষ্টাকে।
প্রচলিত আছে—একটি সঠিক পরিকল্পনা মানেই অর্ধেক সাফল্য। বাংলাদেশের আজকের ক্রিকেটের যে বিশ্বজয় কিংবা ফুটবলের যে গরিমা, তার আধুনিকায়নের বীজ বপন করা হয়েছিল খালেদা জিয়ার শাসনকালেই। বিশেষ করে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-২০০৬) ক্রীড়াঙ্গনে এক বৈপ্লবিক রূপান্তর শুরু হয়। দূরদর্শী এই নেত্রী নিজের এক ছেলেকে রাজনীতির মাঠে রাখলেও, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়োজিত করেছিলেন ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে।
ডিওএইচ স্পোর্টস ক্লাবের মাধ্যমে আরাফাত রহমান কোকো শুরু করেন দেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রার কাজ। এই ক্লাবের মাধ্যমেই ক্রিকেটের আধুনিকায়ন শুরু করেন তিনি। বোলিং মেশিন আনা থেকে শুরু করে ক্রিকেটারদের কাছে পৌঁছে দেন অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।
পরবর্তীতে আরাফাত রহমান কোকো দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে। সেই দায়িত্ব নিয়েই তিনি দেশের ক্রিকেটে উন্নয়নের বীজ বপন করেন।
তার নেতৃত্বে আধুনিকায়ন শুরু হয় মিরপুর স্টেডিয়ামের। আস্তে আস্তে এটি পরিবর্তন হয় দেশের ক্রিকেটের প্রধান ভেন্যু হিসেবে। মর্যাদা পায় জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের, রূপ নেয় ‘হোম অব ক্রিকেট’ হিসেবে।
ঢাকার বাইরে ক্রিকেটকে নিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন তিনি। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও রাজশাহীতে আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য তৎকালীন খালেদা জিয়ার সরকারের কাছ থেকে বাড়িয়ে নেওয়া হয় সরকারি বরাদ্দ। এই স্টেডিয়ামগুলোতে নতুন যাত্রা শুরু হয় ঘরোয়া ক্রিকেটের। আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ছোঁয়া পান ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা ক্রিকেটাররা।
সেই সময়েই বাংলাদেশে হাই-পারফরম্যান্স ক্রিকেটের পূণর্জন্ম হয়। দেশের ক্রিকেটে বিদেশি কোচ নিয়োগ, তৃণমূল থেকে প্রতিভা অন্বেষণসহ আধুনিক মানের কোচিং পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সেইসব পরিকল্পনার ফসলই তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদরা। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের মাধ্যমে উঠে আসেন তারা।
শুধু ক্রিকেটই নয় খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে উন্নয়নের শিখরে ছিল দেশের ফুটবলও। বাংলাদেশ ফুটবলে একবারই সাফ জয়ের আনন্দ পেয়েছে। সেটি ছিল ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার সময়। সেই জয়ই বাংলাদেশের ফুটবলের ঐতিহাসিক অর্জন হয়ে রয়েছে।
শুধু দেশের মাটিতে ক্রিকেট কিংবা ফুটবলের উন্নয়ন নয়, বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতের পরিচিতি বাড়ানোতেও ছিল যথেষ্ট ভূমিকা। নিজের প্রথম মেয়াদে ১৯৯৩ সালে ঢাকায় আয়োজন করা হয় সাফ গেমস (বর্তমানে সাউথ এশিয়ান গেমস)।
২০০৩ সালে প্রথমবার দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত হয় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। তার আমলেই দেশের মাটিতে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয় বৈশ্বিক কোনো টুর্নামেন্ট। ২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজন করে বাংলাদেশ। এসব আয়োজন বিশ্বে বাংলাদেশের ক্রীড়া সক্ষমতার প্রমাণ রাখে। একই সঙ্গে দেশের মানুষের মাঝে ক্রীড়া নিয়ে নতুন উন্মাদনা তৈরি হয়।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় উন্মাদনা হয় ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে। সেই বিশ্বকাপের পরিকল্পনা এঁটেছিলেন আরাফাত রহমান কোকো। আজকের বিপিএলের ভাবনাও এসেছিল তার মাথা থেকেই।
রাজনৈতিক জীবনের নানা বাস্তবতা আর ব্যস্ততায় খালেদা জিয়া হয়ত সরাসরি মাঠে থাকতে পারেননি। তবে নিজের এক ছেলেকে সেই দায়িত্বে দিয়ে নির্ভার থেকেছেন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে দেখিয়েছেন এগিয়ে যাওয়ার পথ, উন্নতির পথ।
আজ না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন খালেদা জিয়া। সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার প্রয়াণে দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও নেমে এসেছে শোকের ছাঁয়া। তার বিদায়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গন হারালো পর্দার আড়ালের এক স্বপ্নদ্রষ্টাকে।

নাজমুল সাগর