বিশ্বকাপ ট্রফির খুঁটিনাটি– জন্ম, ডিজাইন, ওজন, মূল্য ও অন্যান্য
ফুটবল পাগল বাঙালিদের উন্মাদনার পালে হাওয়া দিতে বাংলাদেশে এসেছে ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি। যে আরাধ্য সাধনের লড়াইয়ে অবলীলায় একটা ফুটবলীয় জীবন কাটিয়ে দেন ফুটবলাররা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের স্বপ্ন আর আবেগের কেন্দ্রবিন্দু এই ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের ট্রফি নিয়ে লেখা যায় মহাকাব্য। প্রচলিত আছে অনেক মিথ আর প্রশ্ন। ট্রফিটি ঘিরে থাকা সব কৌতূহলী প্রশ্নের জবাব খোঁজা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
বিশ্বকাপর প্রথম ট্রফি ‘ভিক্টোরি’
১৯৩০ সালে প্রথমবার অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রথম আসরে শিরোপা উৎসব করে উরুগুয়ে। সেই ট্রফির নাম ছিল ‘ভিক্টোরি’। পরবর্তী তিন আসরেও দেওয়া হয় এই ট্রফি।
জুলে রিমে ট্রফি
১৯৪৬ সালে এসে বদলে যায় ট্রফির নাম। ফিফার তৎকালীন সভাপতি, যিনি বিশ্বকাপ শুরু করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন সেই জুলে রিমের নামে নামকরণ করা হয় ট্রফির। নতুন নাম দেওয়া হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’। এই ট্রফিটির নকশা করেন ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লেয়ার। জুলে রিমে ছিল গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’র একটি স্বর্ণমূর্তি। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেওয়া হয় এই ট্রফি।
ট্রফি চুরি ও উদ্ধার
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগে প্রদর্শনী থেকে চুরি হয়ে যায় জুলে রিমে ট্রফি। বিশ্বের অভিজ্ঞ গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা প্রশাসন ব্যর্থ হন চুরি হওয়া ট্রফি খুঁজে পেতে। তখন পোষা কুকুর ‘পিকলস’ সেই ট্রফি খুঁজে বের করেন।
ব্রাজিলের ইতিহাস
সেসময় ফিফার নিয়ম ছিল, যে দল তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তাদের একেবারে দিয়ে দেওয়া হবে ট্রফি। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ তিনবার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে শিরোপা নিয়ে নেয় ব্রাজিল।
১৯৮৩ সালের ট্র্যাজেডি
এই বছর ঘটে ফুটবল বিশ্বের বড় এক ট্র্যাজেডি। বিশেষ করে ব্রাজিলের জন্য। তিনবার বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের করে নেওয়া জুলে রিমে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায় রিও ডি জেনিরো থেকে। এরপর আর সেটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা এটি গলিয়ে ফেলেছে।
বর্তমান ট্রফির উৎপত্তি
বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তিনবার বিশ্বকাপ জিতে ট্রফি নিজেদের করে নিলে নতুন ট্রফির প্রয়োজন পড়ে। তখন ৫৩টি দেশের নকশা থেকে ইতালিয়ান শিল্পী সিলভিও গাজানিগার করা নকশাটি চূড়ান্ত করে ফিফা। ইতালির মিলান শহরের 'জিডিই বার্তোনি' নামক কারখানায় এটি তৈরি করা হয়।
সোনা ও নির্মাণ শৈলী
ট্রফিটি ১৮ ক্যারেট (৭৫%) নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি। এর উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার (১৪.৫ ইঞ্চি) এবং ওজন ৬.১৭৫ কেজি। তবে একটি মজার তথ্য হলো, ট্রফিটি ভেতর থেকে ফাঁপা। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি যদি পুরোপুরি নিরেট সোনা হতো, তবে এর ওজন দাঁড়াত প্রায় ৭০-৮০ কেজি, যা কোনো ফুটবলারের পক্ষে উঁচিয়ে ধরা সম্ভব হতো না।
বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা
বর্তমান ট্রফিটির নকশার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুইজন খেলোয়াড় দুই হাত বাড়িয়ে পুরো পৃথিবীকে আগলে রেখেছেন। ব্যাখ্যা করা হয়, এটি বিশ্বজয়ের আনন্দ ও বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক। ট্রফিকে পূর্ণতা দিয়েছে নিচের অংশে (বেদি) ব্যবহার করা মূল্যবান সবুজ রঙের ‘ম্যালাকাইট’ পাথর। দুটি স্তরে থাকা এই পাথর ট্রফিটিকে দিয়েছে রাজকীয় এক রূপ।
বিশ্বকাপ ট্রফির দাম
১৮ ক্যারেটের ৬.১৭৫ কেজির ট্রফিটি আর্থিক মূল্য বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্পোর্টস ট্রফি। বর্তমান বাজার দর এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই সোনালী ট্রফির মূল্য প্রায় ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি।
বিশ্বকাপ জিতলে কি আসল ট্রফি দেওয়া হয়
বিশ্বের অনেক ফুটবল প্রেমীরাই মনে করেন, বিশ্বকাপ জিতে দেশগুলো হয়ত আসল ট্রফিটি নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। কিন্তু আসল ঘটনা ভিন্ন। বিশ্বকাপ জেতার পর শুধুমাত্র ফাইনালের দিন উদযাপনের জন্য আসল ট্রফিটি দেওয়া হয়। এরপর ব্রোঞ্জের ওপর স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া ‘রেপ্লিকা’ বা অবিকল নকল ট্রফি দেওয়া হয়। আর আসল ট্রফিটি রাখা হয় সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ‘ফিফা ফুটবল মিউজিয়ামে’।
নতুন রেওয়াজ
১৯৭৪ সালে নতুন ট্রফি তৈরির পর নতুন একটি রেওয়াজ চালু করে ফিফা। এরপর থেকে ট্রফিটির একদম নিচে একটি গোল চাকতিতে বিজয়ীদের নাম ও সাল খোদাই করা থাকে। যেমন- ১৯৭৪ জার্মানি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৮ সাল পর্যন্ত জয়ী দেশগুলোর নাম লেখার মতো জায়গা এই ট্রফিতে অবশিষ্ট আছে।
সাধনার বস্তুতে পরিণত
বিশ্বকাপের বর্তমান ট্রফিটি চাইলেই ছুঁয়ে দেখা যায় না। ফিফার কঠোর প্রটোকল অনুযায়ী, শুধুমাত্র বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড়, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এটি সরাসরি হাত দিয়ে ধরার অনুমতি আছে। সাধারণ দর্শকদের জন্য এটি সবসময় কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশের মাটিতে ফিফা ট্রফির এই সংক্ষিপ্ত সফর ফুটবল ভক্তদের মনে যে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে, তা এই ট্রফির দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাসেরই বহিঃপ্রকাশ।

নাজমুল সাগর