রোনালদো কী এ যুগের ‘গ্রেগর সামসা’?
‘একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রেগর সামসা দেখলেন, তিনি বিশাল এক পোকায় রূপান্তরিত হয়েছেন।’ ফ্রাঞ্জ কাফকার কালজয়ী উপন্যাস ‘মেটামোরফসিস’-এর শুরুটা এমন এক লাইন দিয়েই। যারা বিশ্ব সাহিত্যের খোঁজ রাখেন, পরের গল্পটা তাদের জানা। পরিবারের প্রধান থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে ব্রাত্য হয়েছেন সামসা, মেটামোরফসিস সেই গল্প বলেছে পুরোটা সময়।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে কোথাও মিল পাচ্ছেন? নিয়মিত ফুটবলের খবর রাখলে, বিশ্বকাপে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচ দেখলে আপনি মিল ধরে ফেলার কথা। রোনালদোকে পর্তুগাল দলে একপ্রকার ব্রাত্যই বলা চলে। যার কাঁধে ভর দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে পর্তুগালের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, তা যতই ইউসেবিও-লুই ফিগোরা থাকেন, দেশটিকে ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ার মূল কারিগর তো রোনালদোই। সেই তিনি এখন বোঝা। দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে কঙ্গোর মুখোমুখি হওয়া পর্তুগাল ম্যাচে রোনালদো এমন কিছু দেখেছেন, যা দেখে তার সঙ্গে অবাক হয়েছে গোটা দুনিয়া। ডি-বক্সের ভেতর ঘুরঘুর করছেন তিনি, নিঃসঙ্গে শেরপার মতো। কোথাও কেউ নেই। গোটা ম্যাচে বলে ২৫ বার স্পর্শ করেছেন সিআরসেভেন। প্রথমার্ধে ১৬টি। দ্বিতীয়ার্ধে অবস্থা আরও ভয়াবহ। মোটে ৯ বার বলে স্পর্শ করেন তিনি। গোটা দুয়েক চেষ্টা করেছিলেন গোলমুখে। সেসব শট আলোর মুখ দেখেনি।
না দেখা দোষের কিছু নয়। কিন্তু, পদ্ধতিটা দোষের। রোনালদোকে তার সতীর্থরা চান না। অন্তত প্রথম ম্যাচ দেখে কেউ দ্বিমত করবে না। দ্বিমত করার সামান্যতম সুযোগও নেই। তার সতীর্থরাই একে সত্যি বানিয়েছেন। কেউ বলেছে, সে আমাদের মতোই সাধারণ। কারও মতে, রোনালদোকে পাস দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
রোনালদো কিংবা পর্তুগাল কোচ এসব অস্বীকার করেছেন। রবার্তো মার্টিনেজ বলছেন, রোনালদো দলের রোল মডেল। সিআরসেভেন নিজে বলছেন, যা রটেছে, এমন কিছু হয়নি। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, তার কথা কেউ মানছে না। যা রটে, তা কিছু তো বটে!
এসবের সঙ্গে যোগ করুন, লিওনেল মেসির ফর্ম। বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে পাঁচ গোল। তাতেও মানা যেত। সেদিনের কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ডরা দুই ম্যাচে চারটে করে গোল দিয়েছেন। চাপ বাড়ছে রোনালদোর। এমবাপ্পে-হালান্ডরা সমস্যা না করলেও মেসি করছেন। মেসির সতীর্থরা করছেন।
কী করছেন তারা? গোটা আর্জেন্টিনা দলের মূলমন্ত্র একটাই। যে যেখানে থাকুক, গন্তব্য মেসির পা। নিজে সুযোগ পেলেও আগে দেখতে হবে, মেসি কোথায়। মেসিকে বল দাও, বাকি কাজ সে করে নেবে। আলবিসেলেস্তেরা যতটা নিজেদের জন্য খেলছে, তারচেয়ে ঢের বেশি খেলছে মেসির জন্য।
আর রোনালদো! গোল তো দূরে কথা, বলই পাওয়া হয় না। একটা বলের জন্য হাপিত্যেশ। হার না মানা রোনালদো যেন হেরে গেলেন নিজের পরিবারের কাছে। এখানে জিতলেন মেসি, দারুণভাবে। পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এটিই। যে কারণে এবারের বিশ্বকাপে তর্কাতীতভাবে সেরা মিডফিল্ড নিয়েও প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ পর্তুগালের ‘সোনালি প্রজন্ম।’ অন্যদিকে, ‘গেগেনপ্রেসিং’ নিয়ে আলোচনার জন্ম দেওয়া অস্ট্রিয়া দাঁড়াতেই পারল না মেসির আর্জেন্টিনার সামনে।
রোনালদোকে গ্রেগর সামসার সঙ্গে কেন তুলনা দেওয়া? সামসার বাবা ছিলেন। তিনি একসময় কাজ করতেন। বয়স হয়েছে, অবসরে গেছেন। দায়িত্ব নিয়েছেন সামসা। পর্তুগালেও তেমন ইউসেবিও ছিলেন, লুইস ফিগো ছিলেন। তারা একসময় থেমেছেন। তারা পর্তুগালকে সার্বজনীন করতে পারেননি। রোনালদো পেরেছেন। তার জন্যই লোকে ইউরোপিয়ান দলটির হয়ে গলা ফাটায়। একক কৃতিত্ব। অথচ তার যত কীর্তি, সব নিমিষে ভুলে গেছে সতীর্থরা।
গোটা দুনিয়া জানে, রোনালদো অবসরে যাওয়ার পর ফের কমবে পর্তুগালের ভক্তসংখ্যা। শেয়ারবাজারে যেমন হু হু করে দরপতন ঘটে, এই মানুষটার বিদায়ে অবস্থা এমনই হবে। তাতে, সিআরসেভেনের গ্রেটনেস কমবে না। কমবে, পর্তুগিজ ফুটবলারদের বাজারদর।
সেসবে তাদের আপাতত ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ ওই একটা লোকই–সিআরসেভেন। তিনি আছেন বলেই, তাকে ব্রাত্য করার বিলাসিতা দেখিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে দলটি। যা বুঝে উঠতে পারছে না তারা। কে জানে, বিশ্বকাপে আরও একবার ভরাডুবির পর হুঁশ ফিরবে হয়তো!
কথায় আছে, ‘অতীত হয়ে যাওয়া বসন্ত আর ফিরে পাওয়া যায় না।’ রোনালদো বসন্ত শেষ অনেক আগে। এখন তার রেশ যতটা টেনে নেওয়া যায়। তা যদি সতীর্থরা সুযোগ দেয় আরকি।

জহিরুল কাইউম ফিরোজ