‘রাইজিং স্টার অব দ্য ইয়ার’ জিতলেন বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদ মেহেদী হাসান
স্পেনের বার্সেলোনায় বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রযুক্তিবিদ মো. মেহেদী হাসান ইউরোপিয়ান ফিনটেক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ ‘রাইজিং স্টার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতেছেন। একই বছর তিনি ‘ডিরেক্টর অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতেও ফাইনালিস্ট ছিলেন। ইউরোপের অন্যতম স্বনামধন্য ফিনটেক পুরস্কার অনুষ্ঠানে একই বছর দুটি ক্যাটাগরিতে ফাইনালিস্ট হওয়া এবং একটিতে বিজয়ী হওয়া একটি বিরল সম্মান এবং ইউরোপীয় প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
মেহেদী হাসানের পরিচয়
মেহেদী হাসানের গ্রামের বাড়ি নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানার কাশিয়াডাঙ্গা গ্রামে। তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকার দক্ষিণখানে। তাঁর বাবা খলিলুর রহমান ২০২১ সালে কোভিডের সময় মৃত্যুবরণ করেন। মা নিলুফার বেগম একজন গৃহিণী। তাঁর ছোট দুই বোনের নাম হাসি ও খুশি।
মেহেদী হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্কলারশিপসহ অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পিএইচডির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রতি আগ্রহে তিনি আইটি খাতে ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরে বিজনেস দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে স্পেনের আইইএসই (IESE) বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন এবং সেখানে ‘মোস্ট ট্রান্সফর্মড স্টুডেন্ট ২০২০’ পুরস্কার অর্জন করেন। ছয় মহাদেশের ৬০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বে একটি স্বাভাবিক বৈশ্বিক মাত্রা যোগ করেছে।
ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে মেহেদী হাসান ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও গ্রামীণফোনের (টেলিনর গ্রুপ) মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি গ্রামীণফোনের কনিষ্ঠ ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারদের একজন হন। ২০১৮ সালে স্পেনের হাইলি স্কিলড প্রফেশনাল ভিসায় ইউরোপে পাড়ি জমান এবং তিন বছরেরও কম সময়ে ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠানে সিটিও পদে উন্নীত হন। ২০২২ সালে কুব্বো স্মার্ট লজিস্টিকসে সিটিও থাকাকালীন তিনি ফোর্বস (Forbes) টেকনোলজি কাউন্সিলে আমন্ত্রিত হন।
২০২৪ সালের শেষ দিকে মেহেদী সিটিও হিসেবে যোগদান করেন হ্যাস্টি (Hastee) লিমিটেডে। তখন কোম্পানির অবস্থা ছিল নাজুক। একটি বড় ক্লায়েন্ট হারিয়ে রেভিনিউ এক তৃতীয়াংশ কমে গিয়েছিল, টিমের মনোবল ছিল তলানিতে। মেহেদীর উপস্থিতিতে কোম্পানির পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে থাকে।
বিশ্বজুড়ে যেখানে ৬৮% প্রতিষ্ঠান ফিনটেক ট্যালেন্ট ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে (সেন্ট্রাল ব্যাংকিং ফিনটেক বেঞ্চমার্কস ২০২৪ উপাত্ত অনুযায়ী), সেখানে মেহেদীর নেতৃত্বে ২০২৫ সালে হ্যাস্টিতে স্টাফ রিটেনশন দাঁড়ায় ৯৩%। তিনি ‘উইকলি সাপোর্ট চ্যাম্পিয়ন’ ধারণা চালু করেন। এর মাধ্যমে প্রতিটি ইঞ্জিনিয়ার এক সপ্তাহের জন্য ক্লায়েন্ট সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধানের দায়িত্ব নেন। ফলে সাপোর্ট টিকেট সমাধানের সময় কমে আসে ৯০%।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাজ্যভিত্তিক জেলিস (Zellis) গ্রুপ হ্যাস্টি অধিগ্রহণ করে। মেহেদীর একক নেতৃত্বে কয়েক সপ্তাহব্যাপী কঠোর পরিশ্রমে টেকনিক্যাল ডিউ ডিলিজেন্স সফলভাবে সম্পন্ন হয় এবং হ্যাস্টি হয়ে যায় জেলিস গ্রুপের একটি বিজনেস ইউনিট।
এরপর মেহেদীর নেতৃত্বে হ্যাস্টির টেক ডিপার্টমেন্টে শুরু হয় এআই ট্রান্সফর্মেশন। হ্যাস্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট ‘ওয়েব অ্যাপ’ মেহেদীর নেতৃত্বে এআই দিয়ে তৈরি শুরু করা হয়। প্রজেক্টের ৬০% এরও বেশি কোড এআই দ্বারা তৈরি হয়, যা ডেভেলপমেন্ট সময় অর্ধেকে নামিয়ে আনে।
এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মেহেদী ইউরোপিয়ান ফিনটেক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ দুটি ক্যাটাগরিতে ফাইনালিস্ট হন এবং ‘রাইজিং স্টার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতে নেন।
পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থা- ইউরোপ ফিনটেক অ্যাওয়ার্ডস
ইউরোপ ফিনটেক অ্যাওয়ার্ডস মহাদেশজুড়ে শত শত আবেদন থেকে ২৩টি বিশেষায়িত ক্যাটাগরিতে মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে ফাইনালিস্ট হিসেবে নির্বাচন করে, যার মধ্যে চারটি ব্যক্তিগত ক্যাটাগরি। ফাইনালিস্ট পৌঁছানোই একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। বিশ্বব্যাপী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ফিনটেক ইন্টেল এই পুরস্কার পরিচালনা করে।
বিচারক প্যানেলে রয়েছেন সুইস, সুইডিশ, চেক ও হাঙ্গেরিয়ান ফিনটেক অ্যাসোসিয়েশনসহ ১০টিরও বেশি দেশের শীর্ষ জাতীয় সংস্থার নেতৃবৃন্দ। স্পনসর প্রভাবমুক্ত এই মূল্যায়ন সম্পূর্ণ যোগ্যতাভিত্তিক। যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে একই মানের সিস্টার অ্যাওয়ার্ডস পরিচালনাকারী এই গ্লোবাল পোর্টফোলিওর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় প্ল্যাটফর্মে ফাইনালিস্ট নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিকভাবে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত।
মূল্যায়ন ও বিজয়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া
ফাইনালিস্টদের নির্বাচন করা হয় একটি স্বাধীন বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। প্রতিটি আবেদন সংশ্লিষ্ট ক্যাটাগরির প্রকাশিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
‘ডিরেক্টর অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে বিচারকরা মূল্যায়ন করেন ফিনটেক খাতে নেতৃত্বের মান, প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধিতে অবদান, কর্মীদের উন্নয়ন এবং বৃহত্তর শিল্পে সামগ্রিক প্রভাব। ‘রাইজিং স্টার’ ক্যাটাগরিতে বিচারকরা বিবেচনা করেন পণ্য ও সেবার উন্নয়নে অবদান, ফিনটেক খাতে ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ক্যারিয়ারের গতিপথ।
২৫ জুন লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ওয়ান মুরগেট প্লেসে আয়োজিত ব্ল্যাক-টাই অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এই মনোনয়ন শুধু একজন ব্যক্তির নয়, এটি প্রতিটি বাংলাদেশি প্রযুক্তি পেশাজীবীর সম্ভাবনার স্বীকৃতি।

নিজস্ব প্রতিবেদক