স্পেকট্রামকে রাজস্ব নয়, দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি করার আহ্বান
স্পেকট্রামকে শুধু সরকারি রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।
তাদের মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে অধিক স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে নেটওয়ার্কের মান উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি সম্ভব।
আজ শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নবায়ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় দেড় দশক আগে উচ্চমূল্যে এসব ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় নবায়নের সময় মূল্য কমানো না হলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন তারা।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী (অব.) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) প্রেসিডেন্ট ও রবি আজিয়াটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও জিয়াদ সাতারা।
টিআরএনবির সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার, বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ এবং রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলমসহ খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান। এ ছাড়া বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিষয়ক পরামর্শক ড. খালেদ মাহমুদ বক্তব্য দেন।
মূল প্রবন্ধে এমডি মুনির হাসান বলেন, ২০০৮ সালে ১৮ বছরের জন্য স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় স্পেকট্রাম থেকে রাজস্ব আহরণই ছিল অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তবে গত ১৫ থেকে ১৮ বছরে টেলিযোগাযোগ খাত সীমিত স্পেকট্রাম হোল্ডিং, অপর্যাপ্ত ফাইবার অবকাঠামো, টাওয়ার সাইটে সীমিত প্রবেশাধিকার ও উচ্চ স্পেকট্রাম মূল্যের মতো বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।
তার মতে, এসব সীমাবদ্ধতা সেবার মান খারাপ করার পাশাপাশি খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সক্ষমতাও সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯৩তম অবস্থানে ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুনির হাসান বলেন, এখন বাংলাদেশের সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে—আগের পদ্ধতি অব্যাহত রাখা হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন অগ্রযাত্রা শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, স্পেকট্রামের মূল্য কমিয়ে আরও বেশি স্পেকট্রাম দ্রুত ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হলে অপারেটররা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে বেশি বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতে সেবার মান উন্নত হবে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
আলোচনায় জিএসএমএ-এর একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের মোট রাজস্বের প্রায় ১৬ শতাংশ স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় হয়। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এ হার গড়ে ১০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় ৮ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের অপারেটরদের স্পেকট্রাম ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি।
বক্তাদের দাবি, স্পেকট্রামের ইউনিট মূল্য আঞ্চলিক গড়ের কাছাকাছি আনা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ শতাংশ এলাকায় ফাইভজি সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এতে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবৃদ্ধি যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর বৈশ্বিক গড় দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করা হলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
আলোচনায় অপারেটরদের প্রতিনিধিরা বলেন, পাকিস্তান, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ সম্প্রতি ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে স্পেকট্রাম বরাদ্দের ফি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ অতিরিক্ত অর্থ আদায় ছাড়াই স্পেকট্রামের মেয়াদ বাড়িয়েছে। তাই দেড় দশক আগের মূল্যে বর্তমান সময়ে স্পেকট্রাম নবায়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বক্তারা জানান, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। আবার ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা অনেক গ্রাহকের হাতেও স্মার্টফোন নেই। গড়ে একজন গ্রাহক মাসে পাঁচ থেকে ছয় গিগাবাইটের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। এ অবস্থায় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে সাশ্রয়ী ব্যয়ে উন্নত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
তাদের মতে, স্পেকট্রাম মূল্যের পাশাপাশি উচ্চ ভ্যাট ও করও মোবাইল অপারেটরদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্পেকট্রাম বরাদ্দ ফি, বার্ষিক চার্জ এবং এর ওপর ভ্যাটের কারণে অপারেটরদের ব্যয় বেড়ে যায়। অথচ গ্রাহকপ্রতি গড় আয় দেড় মার্কিন ডলারেরও কম।
মুনির হাসানের উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, অতিরিক্ত মূল্যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ করা হলে অপারেটরদের মূলধনের বড় অংশ নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পরিবর্তে স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় হতে পারে। এতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের গতি কমার পাশাপাশি সেবার মানেও প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে স্পেকট্রামের ব্যয় কমানো, পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং দ্রুত ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হলে নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ বাড়বে। এর সুফল টেলিযোগাযোগের বাইরেও ই-কমার্স, ফিনটেক, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল কনটেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইন্টারনেট অব থিংসসহ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বক্তাদের মতে, ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে স্পেকট্রামের মূল্য বর্তমান স্তরের অর্ধেকেরও নিচে নামানোর বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
তাদের অভিমত, স্পেকট্রাম থেকে তাৎক্ষণিক রাজস্ব আহরণের পরিবর্তে সাশ্রয়ী স্পেকট্রাম, উন্নত কানেক্টিভিটি ও অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা গেলে সরকারও ভবিষ্যতে ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন উৎস থেকে আরও বড় রাজস্ব পেতে পারে।
এ কারণে স্পেকট্রামকে শুধু তাৎক্ষণিক সরকারি রাজস্বের উৎস হিসেবে না দেখে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনুঘটক হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানান খাতসংশ্লিষ্টরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক