সেনাঘাঁটিতে হামলায় পাক-ভারত যুদ্ধের আবহ
জম্মু-কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে জঙ্গি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ফের উত্তেজনার পারদ চড়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে একের পর এক জঙ্গি হামলায় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে ভারতীয় সেনাদের।
গতকাল রোববার ভোরে জম্মু-কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উরি এলাকার একটি সেনা ব্রিগেডের সদর দপ্তরে হামলা হয়। এতে ১৭ সেনা ও চার হামলাকারী নিহত হন। এ ছাড়া এ ঘটনায় আহত ৩৫ সেনাকে সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।
উরি হামলার পর পরই এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত। আর সেনাবাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, এই ন্যক্কারজনক হামলার কড়া জবাব দিতে চায় ভারতীয় সেনারা।
আর এমন ঘটনা যাতে না ঘটে এজন্য ভারত-পাক সীমান্তের ৭৭৮ কিলোমিটার নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সেনা কার্যকলাপ বাড়াচ্ছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর বড় অংশের দাবি, পাক-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে এবার পাকিস্তান ভূখণ্ডে সীমিত সময়ের জন্য হামলা চালানো হোক, যাতে পাকিস্তান উচিত শিক্ষা পায়। সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশের কথাটি উঠে এসেছে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান শঙ্কর রায়চৌধুরীর কথায়। গতকাল ভারতীয় সেনাদের ওপর হামলার পর এনডিটিভির কাছে এক সাক্ষাৎকারে ভারতের মাটিতে একের পর এক চোরাগুপ্তা হামলার জন্য পাকিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন তিনি।
শঙ্কর রায় চৌধুরী বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচিত ‘আত্মঘাতী বাহিনী’ তৈরি করা। পাকিস্তানের মতো একইভাবে ওদের মাটিতে ভারতেরও হামলা চালানো উচিত।
তবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আগ্রাসী চিন্তাভাবনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। কেন্দ্রের আশঙ্কা এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের মধ্যে পুরোদস্তুর যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। তবে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং সীমান্তের পশ্চিমের ঘাঁটিতে বিমানবাহিনীকে পুরোপুরি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এই মুহূর্তে পাকিস্তানের ভুখণ্ডে ঢুকে হামলার চিন্তা মাথায় না রাখলেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তানকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার চিন্তা করছে বলে জানা গেছে।
এর আগে নিয়ন্ত্রণরেখা ধরে পাক সেনাঘাঁটি আর বাংকার লক্ষ্য করে যেভাবে মাঝেমধ্যে ভারী গোলাগুলি চালানো হয়েছে এবারও একইভাবে পাকিস্তানকে জবাব দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার।
উরিতে জঙ্গি হামলার পর ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকেও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, ভারত যেভাবে চুপচাপ সব সহ্য করে যাচ্ছে তাতে পাকিস্তানের মাটিতে থাকা জঙ্গি ও জঙ্গি কার্যকলাপে মদদদাতাদের সাহস আরো বেড়ে যাবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পদাতিক বা বিশেষ বাহিনী দিয়ে সীমান্ত টপকে পাক সেনা ছত্রভঙ্গ কিংবা জঙ্গি ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবিও তুলেছে বিভিন্ন মহল। এই মহল থেকে ভারতীয় মিরাজ ২০০০, জাগুয়ার কিংবা সুখোই যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে বোমাবর্ষণ অথবা ৯০ থেকে ২৯০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োগ করে পাকিস্তানে হামলার কথা বলা হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের আকাশসীমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে ভারতকে, যে কারণে বড় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও থাকছে।
উরি হামলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক ডেকেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। আর আজ সোমবার বিকেলে উরির পুরো ঘটনার নিরাপত্তা প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেওয়ার কথা রয়েছে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকারের।
উরিতে ভারতীয় সেনাছাউনিতে জঙ্গি হামলার ঘটনার নিন্দা করে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এসব হামলা করে ভারতকে ভয় দেখানো যাবে না। আমরা জঙ্গি ও তাদের মদদদাতাদের সব দুরভিসন্ধি নষ্ট করেই ছাড়ব।’
উরির সেনাছাউনিতে জঙ্গি হামলার ঘটনার ধরন দেখে এই হামলার পেছনে জইশ-ই-মহম্মদ নামক জঙ্গি সংগঠনের হাত রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশন্স লেফটেন্যান্ট জেনারেল রণবীর সিং।

কলকাতা সংবাদদাতা