জয়ললিতা : রুপালি জগৎ থেকে বাস্তবে
ভারতীয় রাজনীতিতে বর্ণিল এক চরিত্রের অবসান ঘটল। চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম জয়ললিতা। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ গোটা তামিলনাড়ু।
চেন্নাইয়ের রাজাজি হলে জয়ললিতার দেহ রাখা রয়েছে। শেষ দর্শনের জন্য আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে সেখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। জয়ললিতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে। জয়ললিতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানতে সেখানে যাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধীসহ অনেকে।
১৯৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি জন্ম জয়ললিতার। মাত্র দুই বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে নানা প্রতিকূলতায় জড়িয়ে পড়েছিল তাঁর ছেলেবেলা। মা তামিল সিনেমায় অভিনয় করতেন। শুটিংয়ের জন্য তাঁকে চেন্নাইয়ে থাকতে হতো। সেই কারণেই মহীসূর থেকে ছোটবেলায় জয়ললিতাকে চলে আসতে হয়েছিল চেন্নাইয়ে। ছাত্রী হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন জয়ললিতা। তবু মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে স্কুলজীবনেই তাঁকে নেমে পড়তে হয়েছিল রুপালি পর্দায়। অভিনয়জগতে নেমে ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত হিন্দি, ইংরেজি, তামিল, তেলেগু ও কন্নড় ভাষায় ১৩০টিরও বেশি ছবিতে অভিনেত্রী হিসেবে সাফল্য পান।
অভিনয়ের পাশাপাশি ভারতের দক্ষিণের রাজনীতির ময়দানেও জয়ললিতা হয়ে উঠেছিলেন মহানায়িকা। সফল অভিনেত্রী থেকে তুখোড় রাজনীতিবিদ। বিভিন্ন সময়ে নানা বিতর্ককে পেছনে ফেলে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে একসময় তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন তিনি। ভারতের দক্ষিণী রাজনীতিতে তিনি বরাবর নির্ণায়কের ভূমিকা নিয়েই রাজনীতি করে গেছেন।
ভারতের কর্নাটকের মহীসূর রাজ্যের মান্ডিয়া জেলার পাণ্ডবপুরা তালুকের মেলুকোটে জন্মগ্রহণ করেন জয়রাম জয়ললিতা। দাদা ছিলেন তৎকালীন মহীসূরের মহারাজা জয়চামারাজেন্দ্র উডিয়ারের শল্যচিকিৎসক। এই রাজপরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিচিতি হিসেবে তাঁদের পরিবারের বহু সদস্যের নামের প্রথমে ‘জয়’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়। জয়ললিতার মা অবশ্য জয়ললিতাকে ছোটবেলা ডাকতেন ‘কমলাভাল্লি’ বলে।
অভিনয়জগতে নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন জয়ললিতা। ৬০ ও ৭০ দশকে তিনি এম জি রামচন্দ্রনের বিপরীতে একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। তাঁদের জুটির একাধিক ছবি সেই সময় বক্স অফিসে সুপারহিট হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি একাধিক ছবিতেও গান গেয়েছেন জয়ললিতা।
১৯৮২ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রনের উৎসাহে জয়ললিতা যোগ দেন এআইএডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেথী কাঝাগাম) দলে। যোগ দিয়েই সেই বছর দলীয় সম্মেলনে নারী অধিকারের ওপর ভাষণ দিয়ে সবাইকে চমকে দেন। ১৯৮৩ সালে জয়ললিতাকে দলের প্রচার সচিব নিযুক্ত করা হয়। ১৯৮৪ সালে রাজ্যসভার সদস্য নিযুক্ত হন তিনি। তবে পার্টির প্রচার সচিব হিসেবে তাঁর দক্ষতা ও সাফল্য অনেকের চক্ষুশূলও হয়ে পড়েন জয়ললিতা। ১৯৮৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন এম জি রামচন্দ্রন। শুরু হয় জয়ললিতার রাজনীতিতে নতুন পথচলা।
১৯৮৭ সালে এম জি রামচন্দ্রনের মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখলের জন্য এআইএডিএমকে দলে অসন্তোষ দানা বাঁধে। দুই ভাগ হয়ে যায় এআইএডিএমকে। একদিকে মৃত এম জি রামচন্দ্রনের স্ত্রী জানকি রামচন্দ্রন অন্যদিকে জয়ললিতা। এমজি রামচন্দ্রনের মৃত্যুর পর ৯৬ জন সদস্যের সমর্থন নিয়ে আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে তামিলনাড়ুর প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জানকি রামচন্দ্রন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হস্তক্ষেপে তামিলনাড়ুতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। ১৯৮৯ সালে তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে জয়ললিতার নেতৃত্বে এআইএডিএমকে ২৭টি আসনে জয়ী হয়। তামিলনাড়ু বিধানসভায় প্রথম মহিলা বিরোধী নেত্রী নির্বাচিত হন জয়ললিতা। ওই বছরই এআইএডিএমকে দলে বিরোধীগোষ্ঠীরা এক ছাতার নিচে আসে। ১৯৮৯ সালের ২৫ মার্চ তামিলনাড়ু বিধানসভায় বিরোধী নেত্রী জয়ললিতা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী করুণানিধির একটি বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে উত্তাল হয়ে ওঠে সভা। তুমুল হৈ-হট্টগোলের মধ্যে জয়ললিতার শাড়ি ধরে টানাটানি করেন ডিএমকের মন্ত্রী ডি মুরুগান। এরপর তামিলনাড়ুর বিধানসভা নারীদের জন্য নিরাপদ নয় বলে অভিযোগ তুলে বিধানসভায় না আসার সিদ্ধান্ত নেন জয়ললিতা।
১৯৯১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পর কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে তামিলনাড়ুর ৪০টি লোকসভা আসন দখলে নেয় জয়ললিতার দল এআইএডিএমকে। ২৩৪টি বিধানসভার মধ্যে ২২৫ টিতে জয়ী হয় কংগ্রেস-এআইএডিএমকে জোট। তামিলনাড়ুর প্রথম নির্বাচিত মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জয়ললিতা। ক্ষমতায় এসেই তিনি মহিলা থানাসহ মহিলাদের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংরক্ষণ চালু করেন। তামিলনাড়ুর মানুষের কাছে ভালোবাসা পেয়ে তিনি ‘আম্মা’ নামেই পরিচিত হন।
১৯৯৬ সালে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের অভিযোগে নির্বাচনে জয়ললিতা ও তাঁর দল এআইএডিএমকে পরাজিত হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪০টি দুর্নীতি মামলায় জড়িয়ে পড়েন জয়ললিতা। দুর্নীতি মামলায় আদালতের নির্দেশে ২০০১ সালে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেননি জয়ললিতা। তবে বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল এআইএডিএমকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও দ্বিতীয়বার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন জয়ললিতা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত জয়ললিতাকে ওই পদে থাকা সম্ভব নয় বলে রায় দেন। তবে মাদ্রাজ হাইকোর্ট তাঁকে কয়েকটি অভিযোগ থেকে ছাড় দেওয়ায় ২০০২ সালের মার্চ মাসে ফের তামিলনাড়ু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। অন্দিপাত্তি বিধানসভা থেকে উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতেও আসেন তিনি। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ১৩ পার্টির জোটের সঙ্গী হিসেবে তামিলনাড়ুতে ফের ক্ষমতায় আসে এআইএডিএমকে। তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন জয়ললিতা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই ফের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর হিসাববহির্ভূত সম্পত্তি মামলায় জয়ললিতাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেন বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালত। জেলে যেতে হয় আম্মাকে। তবে জেলে যাওয়ার আগে জয়ললিতা তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী পেনিরসেলভামকে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসিয়ে যান। কিন্তু মাত্র ২২ দিনের মাথায় জেলমুক্ত হন জয়ললিতা। ২০১৫ সালের ১১ মে কর্নাটক হাইকোর্ট জয়ললিতাকে বেকসুর খালাস দেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে এই বর্ণময় চরিত্রের অবসানে আজ শোকস্তব্ধ সারা দেশ। ভারতের রাষ্ট্রপতি জয়ললিতার মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় বলেন, জয়ললিতার মৃত্যু হৃদয়বিদারক। ভারত আজ এমন একজন আইকনকে হারাল, যাঁকে কয়েক লাখ মানুষ ভালোবাসত ও শ্রদ্ধা করত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর শোকবার্তায় বলেন, ‘আমি শোকাহত। জয়ললিতার মৃত্যুতে ভারতের রাজনীতিতে বড় শূন্যস্থান তৈরি হলো। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’
ভারতের উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারী তাঁর শোকবার্তায় বলেন, ‘জয়ললিতার মৃত্যু ভারতবাসীর জন্য বড় ক্ষতি।’

কলকাতা সংবাদদাতা