গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির কড়া নিন্দা ইউরোপীয় নেতাদের
গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রচেষ্টায় বাধা দিলে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় নেতারা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই পদক্ষেপ ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ককে একটি ‘বিপজ্জনক নিম্নমুখী’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।
স্থানীয় সময় রোববার (১৮ জানুয়ারি) এক যৌথ বিবৃতিতে ট্রাম্পের শুল্কের হুমকির লক্ষ্য হওয়া আটটি দেশ (ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য) বলেছে, তারা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের পাশে ‘পূর্ণ সংহতি’ প্রকাশ করছে। খবর আল জাজিরার।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত সপ্তাহে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে আমরা সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংলাপে বসতে প্রস্তুত।
তারা আরও বলেন, শুল্কের হুমকি ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং একটি বিপজ্জনক নিম্নমুখী ধারার ঝুঁকি তৈরি করবে। আমরা আমাদের প্রতিক্রিয়ায় ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত থাকব। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ।
এই কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে এমন সময়, যখন ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের মোকাবিলায় সমন্বিত কৌশল ঠিক করতে জরুরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ এবং ‘যেকোনো ধরনের জবরদস্তির বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করবে’।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ট্রাম্পের অর্থনৈতিক হুমকির জবাবে প্রতিশোধমূলক শুল্ক ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর বাজার-নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করতে পারেন বলে জানা গেছে।
ট্রাম্প শনিবার ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আট দেশের ওপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ এবং ১ জুন থেকে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (১০৮ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং ২০২৩ সালে গৃহীত ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’ (যাকে অনেকে ‘ট্রেড বাজুকা’ বলেন) সক্রিয় করার কথাও বিবেচনা করছে।
এই ব্যবস্থাটি আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এটি কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদেশি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির সুরক্ষা প্রত্যাহার করা যেতে পারে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য কমিটির চেয়ারম্যান জার্মান এমইপি বের্ন্ড লাঙ্গে বলেন, এই ধরনের পরিস্থিতির জন্যই অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট তৈরি করা হয়েছিল। এখনই এটি ব্যবহার করা উচিত।
ন্যাটো নিয়েও উদ্বেগ
গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় নিয়ে গেছে, যা ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি এবং ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোটে ফাটল ধরার আশঙ্কা তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন। অথচ ন্যাটোর মূল নীতি হলো—এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা।
সোমবার ট্রাম্প আবারও সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ডেনমার্ক নাকি রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ‘কিছুই করতে পারেনি’, তাই এখন ‘সময় এসেছে’ গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার।
ডেনমার্ক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা গ্রিনল্যান্ড বিক্রি করবে না। জরিপে দেখা গেছে, দ্বীপটির প্রায় ৫৭ হাজার বাসিন্দার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চান না।
শনিবার ডেনমার্কের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে ট্রাম্পের হুমকির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। তাদের স্লোগান ছিল—‘গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়’, ‘গ্রিনল্যান্ড থেকে হাত সরাও’।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ইউরোপীয় দেশগুলোর ‘জোরালো সমর্থনের’ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, আমরা সহযোগিতা চাই, সংঘাত নয়। ইউরোপ স্পষ্ট করে জানিয়েছে—তাদের ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, কোনো ধরনের হুমকি বা ভয় দেখানো আমাদের অবস্থান বদলাতে পারবে না। শুল্কের হুমকি অগ্রহণযোগ্য।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের পরিকল্পিত শুল্ককে ‘সম্পূর্ণ ভুল’ বলে আখ্যা দেন এবং বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক