ট্রাম্প কি ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন?
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পদার্পণ করেছে। এমন এক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার (২৯ মার্চ) বলেছেন, তিনি ইরানের তেল নিয়ে যেতে চান। আজ সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দিলে তিনি ইরানের তেল কূপসহ দেশটির জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবেন।
হরমুজ প্রণালি কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত অচল করে রেখেছে ইরান। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
ইরানের তেল নিয়ে ট্রাম্প কী বলেছেন?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই তার এখন অগ্রাধিকার। মার্কিন বাহিনী খারগ দ্বীপে অবস্থিত ইরানের জ্বালানি তেল রপ্তানি কেন্দ্রটি দখল করতে পারে।
খারগ দ্বীপ ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত। এটি ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রবাল দ্বীপ। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কঠোরভাবে এই দ্বীপের সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে। শুধু সরকারি নিরাপত্তা ছাড়পত্রধারীরা এই দ্বীপে প্রবেশ করতে পারেন। এ দ্বীপে ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবস্থাপনা করা হয়।
গত ১৪ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেন, মার্কিন বিমান বাহিনী দ্বীপটিতে অবস্থিত ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছে।
সমালোচকরা বলেন, গেল জানুয়ারিতে কারাকাস থেকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার দুঃসাহসিক সামরিক অভিযানের সাফল্য ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও সাহসী করে তুলেছে। ওয়াশিংটন বলছে, ভেনিজুয়েলার তেল রপ্তানি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনিজুয়েলার ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনের পরিশোধনাগারগুলোতে আনা হয়েছে। ভেনিজুয়েলা থেকে আরও ১০ কোটি ব্যারেল তেল আনা হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের মজুত ভেনিজুয়েলায়। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের আমলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতি ঘটে। শ্যাভেজ তেল খাতকে জাতীয়করণ করেছিলেন। ২০১৩ সালে শ্যাভেজের উত্তরসূরি মাদুরোর শাসনামলে এ সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। তবে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নেওয়ার পর ভেনিজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশটির তেল খাতটিকে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
ইরানের কাছে কী পরিমাণ তেল আছে?
ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুসারে, দেশটিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত এবং তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ২৪ শতাংশ এবং বিশ্বের ১২ শতাংশ জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে ইরানে। দেশটিতে প্রায় ১৫৭ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। ইরান বিশ্বের নবম বৃহত্তম এবং পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ, যা প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করত। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর দেশটির তেল রপ্তানি নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
২০১৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন সাক্ষর করে। এর মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবে ওয়াশিংটনপন্থি শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর পতন হয়। ওই সময় মার্কিন নাগরিকদের নিয়ে সৃষ্ট জিম্মি সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের তেল জব্দ করতে পারবে?
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, পেন্টাগন ইরানে সীমিত পরিসরে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে খারগ দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির নিকটবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অভিযান চালানো হতে পারে।
গত শনিবার সংবাদমাধ্যমটি জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী এই অভিযান পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর্যায়ে না গেলেও এটি বিশেষ অভিযান।
তবে যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপ আক্রমণ বা দখল করলেও তারা ইরানের তেল পাবে না। ইরানের তেল পেতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে দেশটির তেল উৎপাদন কেন্দ্র ও পরিশোধনাগারগুলো দখল করতে হবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের মূল ভূখণ্ড দখল করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে কী হবে?
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ইরানের মোট জিডিপি ছিল প্রায় ৪৫৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ওই বছর ইরানের তেল রপ্তানি থেকে মোট আয় ছিল আনুমানিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। এটি ইরানের জিডিপির প্রায় ১২ শতাংশ। তবে রপ্তানি আয় ও জিডিপি সরাসরি তুলনীয় নয়।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের তেল জব্দ করার পর দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে আরও বেশি ইরানি তেল প্রবেশ করতে পারে। এতে তেলের দাম কমে যাবে।
ইরান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার শিকার হওয়া দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ইরানি ছাত্ররা হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জিম্মি করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর প্রথমবারের মতো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এক বছরেরও বেশি সময় পর ওই মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি দেওয়া হলে জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। আজ সোমবার (৩০ মার্চ) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র কি এর আগে ইরানের তেলে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে?
হ্যাঁ, এই প্রথমবার নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের প্রতি এর আগেও আগ্রহ দেখিয়েছে।
১৯৫৩ সালে ইরানের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের সরকারকে সিআইএর পরিকল্পিত এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কারণ তিনি ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানিকে (এআইওসি) জাতীয়করণ করেন।
ওয়াশিংটন ‘অপারেশন এজাক্স’ নামের ওই অভিযানকে ইরান ও তাদের জ্বালানির মজুতকে তৎকালীন সোভিয়েতের (রাশিয়া) হাত থেকে দূরে রাখার জন্য স্নায়ু যুদ্ধের একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তখনকার ওই অভ্যুত্থানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ও সুদৃঢ় করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালানোর দুই দশকেরও বেশি সময় পরেও মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির তেল রাজস্ব এখনও কার্যত মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইরাকের তেল থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বাগদাদে আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক