স্টারমারের পদত্যাগের গুঞ্জন, নেতৃত্বে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন কারা?
মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যের বিদ্রোহ ও দলের অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়ে বেশ অস্থির সময় পার করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার। এরইমধ্যে তার পদত্যাগের গুঞ্জন বেশ ভালোই ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এর রেশ ধরেই ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইল নতুন করে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। আর তাতে বলা হয়েছে নিয়ম মেনেই তিনি চলে যেতে চাইছেন।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চান এবং তিনি তার চলে যাওয়ার জন্য একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সময়সূচি নির্ধারণ করতে যাচ্ছেন।
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গতকাল শনিবার ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন সদস্য জানিয়েছেন, স্যার কিয়ার স্টারমার রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে পারছেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থা কোনোভাবেই টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তিনি কেবল এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে এবং নিজের পছন্দের পদ্ধতি অনুযায়ী সরে দাঁড়াতে চান। এজন্য তিনি একটি সময়সূচি নির্ধারণ করবেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মন্ত্রিসভার অন্য একটি সূত্রের মতে, ঠিক কবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্টারমারের কিছু সিনিয়র সহযোগী মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের প্রথম দফার জনমত জরিপ এবং প্রচারণার তথ্য আসার আগে কোনো ধরনের বিবৃতি না দেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করেছেন।
মন্ত্রিসভার ওই সদস্য দাবি করেছেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সাবেক চিফ অব স্টাফ মর্গান ম্যাকসুইনি স্যার কিয়ার স্টারমোরকে তার পদটি ধরে রাখার জন্য অনুরোধ করছেন। ম্যাকসুইনি যুক্তি দিচ্ছেন যে, যদি উপনির্বাচনের ফলাফলে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায় তবে একটি সুযোগ থেকে যাবে।
স্যার কিয়ার স্টারমারের জন্য এটি একটি নাটকীয় পরিবর্তন কেননা তিনি দুই বছর আগে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তারপর থেকে বেশ কয়েকটি অজনপ্রিয় নীতিতে একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন এবং ধারাবাহিক কিছু কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছেন।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় দেড় হাজার কাউন্সিলর পদ হারানোর পর, ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ইঙ্গিত হিসেবে সরকারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পদত্যাগ করেছেন। পাশাপাশি স্টারমার দলের ভেতর থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো
বর্তমান নেতৃত্বের সংকটটি গত সপ্তাহের স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হলেও, স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ বেশ কিছু সময় ধরেই বাড়ছিল।
গত বছর, নিজের দলের ভেতর থেকেই আসা চাপের মুখে স্যার কিয়ারের সরকার এক মাসের মধ্যে তিনটি প্রধান নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করেছিল।
এই বছরের শুরুর দিকে জানা যায় যে, লর্ড ম্যান্ডেলসনকে প্রয়োজনীয় ভেটিং বা যাচাইকরণে উত্তীর্ণ না হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে লর্ড ম্যান্ডেলসনের সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে স্যার কিয়ার স্টারমারের বিচারবুদ্ধি নিয়ে এক্ষেত্রে আগেই প্রশ্ন উঠেছিল।
এই ঘটনাগুলোই গত সপ্তাহে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয়ের পটভূমি তৈরি করেছিল।
ঐতিহ্যবাহী বিরোধী দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি নাইজেল ফারাজের দল 'রিফর্ম ইউকে' এবং বামপন্থী 'গ্রিন পার্টি'-র প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধির কারণে লেবার পার্টির এই পরাজয় আরও ত্বরান্বিত হয়।
পরাজয়ের তালিকা দীর্ঘ হওয়ার সাথে সাথে লেবার পার্টির একজন এমপি—ক্যাথরিন ওয়েস্ট—ঘোষণা করেন, আগামী সোমবারের মধ্যে অন্য কোনো প্রার্থী এগিয়ে না এলে তিনি স্যার কিয়ারের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাবেন।
পরবর্তী সময়ে ক্যাথরিন ওয়েস্ট তাঁর প্রার্থীতার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসলেও, প্রায় ৯০ জন এমপি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ অথবা তাঁর পদত্যাগের একটি সময়সূচি নির্ধারণের দাবি জানায়।
নেতৃত্বের জন্য কারা প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন?
সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় দেখা হচ্ছে।
অ্যাঞ্জেলা রেইনার
ম্যানচেস্টারের অন্যতম দরিদ্র একটি এলাকায় বেড়ে ওঠা অ্যাঞ্জেলা রেইনার লেবার পার্টির বামপন্থিদের অনেকের কাছেই বেশ পছন্দের প্রার্থী। নিজেকে খাঁটি কর্মজীবী শ্রেণির নারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া রেইনার গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্যার কিয়ারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। একটি অ্যাপার্টমেন্টের জন্য কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় এর জের ধরে ব্রিটিশ কর কর্তৃপক্ষের তদন্তের মুখে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার তিনি এই বিষয়টির নিষ্পত্তি করেছেন। রেইনার জানিয়েছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ থেকে তাঁকে ‘নির্দোষ’ ঘোষণা করা হয়েছে। এই তদন্তটিকে তাঁর নেতৃত্বের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছিল, তাই এখন প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে নামার জন্য তাঁর পথ পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রতিকূলতা জয় করার মতো ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষমতার কারণে লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য তিনি একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে পারেন।
অ্যান্ডি বার্নহাম
নিজের জনপ্রিয়তার কারণে 'কিং অব দ্য নর্থ' বা উত্তরের রাজা ডাকনাম পাওয়া গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম এর আগে দুবার লেবার পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে নেমে পরাজিত হয়েছেন। তবে মেয়র হিসেবে তার রেকর্ড বেশ ভালো; তিনি তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন এবং করোনা অতিমারীর সময়ে উত্তর ইংল্যান্ডের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং ওই অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করার জন্য তিনি বেশ প্রশংসিত। প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে অংশ নিতে হলে তাঁকে একজন এমপি (সংসদ সদস্য) হতে হবে এবং এই বছরের শুরুর দিকে লেবার পার্টির নীতি-নির্ধারণী সংস্থা তাঁকে নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দিয়েছিল। তবে এখন একজন এমপি জানিয়েছেন, তিনি বার্নহামের জন্য পথ ছেড়ে দিতে পদত্যাগ করবেন। এর ফলে পার্লামেন্টের ওই আসনের জন্য একটি উপ-নির্বাচন বা প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। ডাউনিং স্ট্রিট ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা বার্নহামকে লেবার প্রার্থী হওয়া থেকে আটকানোর চেষ্টা করবে না, যদিও রিফর্ম ইউকে এবং গ্রিন পার্টির উত্থান তাঁর এই আসনটি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বার্নহাম বলেছেন যে তিনি পুরো যুক্তরাজ্যের মানুষের জন্য রাজনীতিকে সঠিকভাবে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই আসনে লড়াই করবেন।
ওয়েস স্ট্রিটিং
১৯৮৩ সালে পূর্ব লন্ডনে কিশোর পিতা-মাতার ঘরে জন্ম নেওয়া স্ট্রিটিং দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন। তিনি বেশ কিছু সময় ধরে নীরবে নেতৃত্বের লড়াইয়ের জন্য নিজের পথ গোছাচ্ছেন—এমনকি লর্ড ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে তাঁর আদান-প্রদান করা ব্যক্তিগত বার্তাগুলো প্রকাশ করার মতো অস্বাভাবিক পদক্ষেপও নিয়েছেন, যেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে তাঁরা কখনোই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন এবং রোগীদের আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ সবার প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে ডাক্তারদের বেতন নিয়ে চলমান কর্মবিরতি বা ধর্মঘটের কারণে তাঁকে সমালোচনার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। বৃহস্পতিবার তিনি এই পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং জানান যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর থেকে তিনি আস্থা হারিয়েছেন। তাঁর পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, লেবার পার্টির একটি সুনির্দিষ্ট রূপকল্পের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তার বদলে আমরা এখন একটি ‘শূন্যতা’ দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি স্যার কিয়ার স্টারমারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা না দিলেও তার সহযোগীরা জানিয়েছেন যে, তিনি শিগগিরই তা করতে পারেন। তার সমর্থকদের বিশ্বাস, লেবার পার্টির বার্তা স্যার কিয়ার স্টারমারের চেয়ে আরও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো রাজনৈতিক দক্ষতা এবং সাবলীলতা ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের রয়েছে। তবে দলের ডানপন্থি ধারার নেতা হওয়ায় বামপন্থি সহকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া তার জন্য কিছুটা কঠিন হতে পারে।
স্টারমার কি সত্যিই পদত্যাগ করবেন?
স্যার কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে সুর যত জোরালো হোক না কেন, তিনি যে পদত্যাগ করবেনই—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃতপক্ষে, তিনি তাঁর মন্ত্রিসভাকে বলেছেন যে তিনি শাসনভার চালিয়ে যাবেন এবং সতর্ক করেছেন যে নেতৃত্বের লড়াইয়ের ফলে এক ধরনের ‘বিশৃঙ্খলা’ তৈরি হতে পারে। স্যার কিয়ার আরও জোর দিয়ে বলেছেন যে, লেবার পার্টির নেতাকে চ্যালেঞ্জ করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেটি এখনো শুরু করা হয়নি।
এই ধরনের কোনো প্রতিযোগিতা শুরু করতে আগ্রহী প্রার্থীকে অবশ্যই ৮১ জন এমপির সমর্থন পেতে হবে। ডাউনিং স্ট্রিট জানিয়েছে, স্যার কিয়ার স্টারমার তার বিরুদ্ধে আসা যেকোনো নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। এছাড়া ১৫০ জনেরও বেশি এমপি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন অথবা বলেছেন যে, তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য এটি সঠিক সময় নয়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক