পবিত্র হজের খুতবা আজ, ‘লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত আরাফাত ময়দান
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দ ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়ালমুল্ক, লা শারিকা লাকা’ ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে পবিত্র আরাফাতের পাহাড়ঘেরা ময়দান ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস এখন মুখর ও প্রকম্পিত। সুউচ্চকণ্ঠ নিনাদের তালবিয়ায় মহান আল্লাহ তাআলার একত্ব ও মহত্ত্বের কথা ঘোষিত হচ্ছে প্রতিক্ষণ। বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতায় আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) আরাফার আদিগন্ত মরুপ্রান্তর এক পুণ্যময় শুভ্রতায় ভরে উঠেছে। পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় ইসলামের অন্যতম প্রধান এই স্তম্ভ পালন করছেন সারা বিশ্ব থেকে আগত ১৬ লাখের বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান, যার মধ্যে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়া ৭৯ হাজার ১৬৪ জন হজযাত্রীও রয়েছেন।
আজ ফজরের পর থেকেই ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন হজযাত্রীরা। ৪ বর্গমাইল আয়তনের এই বিশাল সমতল মাঠের দক্ষিণ দিকে মক্কা-হাদা-তায়েফ রিং রোড এবং উত্তরে সাদ পাহাড় অবস্থিত। সেখান থেকে আরাফাত সীমান্ত পশ্চিমে আরও প্রায় পৌনে এক মাইল বিস্তৃত। পবিত্র এই ভূমিতে যার যার মতো সুবিধাজনক জায়গা বেছে নিয়ে হাজিরা ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকেন। এবার আরাফার ময়দানের মসজিদে নামিরায় জোহরের নামাজের আগে পবিত্র হজের খুতবা প্রদান করেন মদিনা মুনাওয়ারার ইমাম ও খতিব শায়খ ড. শেখ আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফী। খাদেমুল হারামাইন শরিফাইন বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজের তত্ত্বাবধানে এবার হজের খুতবা বাংলা ও উর্দুসহ বিশ্বের রেকর্ডসংখ্যক ৫০টি ভাষায় অনুবাদ করে প্রচারের ব্যবস্থা করেছে সৌদি আরবের মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর জেনারেল প্রেসিডেন্সি বিভাগ।
হজযাত্রীরা সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করে আল্লাহ তাআলার জিকির-আসকার ও ইবাদত শেষে মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন। মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামাজ এশার ওয়াক্তে একত্রে আদায় করে তারা সারা রাত সেখানে অবস্থান করবেন এবং মিনায় জামরাতে নিক্ষেপ করার জন্য ৭০টি কংকর (পাথর) সংগ্রহ করবেন। পরদিন মুজদালিফায় ফজরের নামাজ পড়ে পুনরায় মিনার উদ্দেশে রওনা হবেন হাজিরা। ১০ জিলহজ মিনায় পৌঁছার পর হজযাত্রীদের পর্যায়ক্রমে চারটি কাজ সম্পন্ন করতে হয়। প্রথমে মিনাকে ডান দিকে রেখে দাঁড়িয়ে বড় শয়তানকে (জামারা) পাথর নিক্ষেপ করা, দ্বিতীয়ত আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা (অনেকে মিনায় না পেরে মক্কায় ফিরে গিয়ে কোরবানি দেন), তৃতীয় পর্বে মাথা ন্যাড়া করা এবং চতুর্থ কাজ হিসেবে তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করা। এরপর জিলহজের ১১ ও ১২ তারিখ মিনায় রাতযাপন করে দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্তের মধ্যে হজযাত্রীরা বড়, মধ্যম ও ছোট শয়তানের ওপর সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করবেন।
এর আগে গতকাল সোমবার সারাদিন এবং গতকাল রাতে হজযাত্রীরা মিনায় অবস্থান করেন, যেখান থেকে মূলত হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল। পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার অদূরের মিনা মূলত লাখ লাখ তাঁবুর শহর। প্রতি বছর হজের সময় মুসলিমদের অস্থায়ী আবাস হিসেবে এখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন তাঁবু বসানো হয়, যেখানে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ফোম, বালিশ ও কম্বল বরাদ্দ থাকে। মিনায় অবস্থান করা হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় হজযাত্রীরা নিজ নিজ তাঁবুতে নামাজ আদায়সহ অন্য ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল ছিলেন।
এদিকে চলতি বছর সৌদি আরবে তীব্র গরমের মধ্যে হজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল সেখানে গড় তাপমাত্রা ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএ। তীব্র গরমে ভোগান্তিতে পড়া হজযাত্রীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশেষ করে তাপজনিত অসুস্থতা ও হিট স্ট্রোক মোকাবিলায় চারটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রস্তুত রেখেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে হজযাত্রীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পবিত্র হজ উপলক্ষে মক্কা, মদিনা, মিনা, আরাফাতের ময়দান, মুজদালিফা ও এর আশপাশের এলাকায় লাখো নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনসহ নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সৌদি সরকার।

কামাল পারভেজ অভি, মক্কা