ইরান যুদ্ধ : গোপনে আরেক মুসলিম দেশে সেনা ও অস্ত্র পাঠায় ইসরায়েল
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান সহজ করার লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গোপন ঘাঁটিগুলোর নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ইসরায়েল গোপনে আজারবাইজানে তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা ইউনিট মোতায়েন করেছিল। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে আজ শুক্রবার (৫ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে।
দুটি সূত্র জানায়, আজারবাইজানের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থান থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ইউনিটগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করত। এসব স্থান ছিল ইরানের উত্তর সীমান্ত এলাকা সংলগ্ন এবং সবচেয়ে কাছের পয়েন্টটি ছিল ইরানের তাবরিজ শহর থেকে মাত্র ৬০ মাইল দূরে। এ শহরে যুদ্ধের সময় হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল।
অন্য দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় আজারবাইজানের অভ্যন্তরে ওই পয়েন্টগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর বিশেষ কমান্ডো ইউনিটগুলোকে মোতায়েন করা হয়েছিল। এসব স্থান থেকে কমান্ডোরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের অভিযান ও ড্রোন হামলা পরিচালনা করেছিল। এতে যুদ্ধের সময় ইরানের উত্তরাঞ্চলে নজর রাখার ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে বেশ সুবিধা করে দিয়েছিল।
আজারবাইজানে ইসরায়েলের এই গোপন সেনা মোতায়েনের খবরটি সিএনএন প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে। আজারবাইজানের এসব স্থাপনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের রক্ষণাবেক্ষণ করা বেশ কয়েকটি সামরিক অবস্থানের মধ্যে অন্যতম, যা তাদের সেনাবাহিনীকে অভূতপূর্ব সহায়তা করেছিল। এর মাধ্যমে তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযান সহজতর করতে এবং এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকা ফুটে উঠে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে কখনো অনুমতি নিয়ে, আবার কখনো সম্ভবত অনুমতি ছাড়াই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এসব স্থাপনা গড়ে তুলেছে।
সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন আরও জানায়, আজারবাইজানের এসব স্থাপনা ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সোমালিল্যান্ডসহ একাধিক দেশে থাকা অসংখ্য গোপন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনার মধ্যে অন্যতম। এসব ঘাঁটি ও স্থাপনায় মোতায়েন করা ইসরায়েলি সেনা ইউনিটগুলোকে প্রাথমিকভাবে জরুরি অবস্থার জন্য সম্ভাব্য উদ্ধারকারী দল হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে এর পরিধি প্রসারিত করা হয় সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের অভিযান পরিচালনার জন্য।
সিএনএনের সূত্রগুলো জানায়, যুদ্ধের সময় ইরানের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর সীমান্ত বরাবর গোপন সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলি বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। এতে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর আক্রমণের পরিধি শত শত মাইল প্রসারিত হয়ে ইরানের ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে চলে যায়। এই সামরিক অবস্থানগুলো ইসরায়েলকে ইরানজুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে বারবার হামলা চালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
সূত্রগুলোর মধ্যে একজন বলেছেন, আজারবাইজানের স্থাপনাগুলোতে কয়েক ডজন সেনা ছিল। এর মধ্যে ইসরায়েলের বিশেষ বাহিনী, যুদ্ধের অভিজাত হেলিকপ্টার, উদ্ধারকারী দল ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্যরা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত আজারবাইজানি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে বলেন, ‘তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য আজারবাইজানের ভূখণ্ড ব্যবহারের কথিত ভিত্তিহীন দাবি আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।’
সিএনএন এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
এদিকে সূত্রগুলোর মধ্যে একজন বলেছেন, আফ্রিকার দেশ সোমালিল্যান্ড ইসরায়েলকে অতিরিক্ত একটি সামরিক অবস্থান তৈরিতে সহায়তা প্রদান করেছে। এতে ইরানগামী দূরপাল্লার ফ্লাইটের ইসরায়েলি বিমানগুলো সম্ভাব্য বিরতির জন্য একটি স্থান পেয়ে যায়। ডিসেম্বরে ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের বন্দর নগরী বারবেরাতে ব্যাপক বাণিজ্যিক ও সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলি গোপন সামরিক ঘাঁটির বিষয়ে সর্বপ্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরাকে দুটি গোপন স্থাপনাও ব্যবহার করেছিল। এসব স্থাপনা থেকে ইসরায়েলের বাহিনীকে রসদ সরবরাহ এবং প্রয়োজনে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করা হতো। ইরাকের এই দুটি স্থাপনার খবর প্রথম প্রকাশ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও নিউইয়র্ক টাইমস। এক বিবৃতিতে ইরাকের সামরিক বাহিনী জানায়, মার্চের শুরু পর্যন্ত দেশটিতে কোনো ‘অননুমোদিত ঘাঁটি বা বাহিনী’ ছিল না।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইসরায়েল গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম এবং তা পরিচালনার জন্য সেনা মোতায়েন করেছে। এ খবর প্রথম প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। এ ছাড়া দেশটিতে অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পাঠানো হয়েছে। সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদের প্রধান ও সামরিক বাহিনীর প্রধান সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। তবে এই তথ্য প্রকাশের পর সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সফরের বিষয়টি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে।
আজারবাইজান কৌশলগত অংশীদার
আজারবাইজানের এই সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলকে ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের পাইলটদের উদ্ধারে অভিযান চালাতে এবং ইরানের অভ্যন্তরে গুপ্তচরবৃত্তি করতে অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আজারবাইজানকে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে আসছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই এ ধরেনের প্রস্তুতি নিয়েছে ইসরায়েল।
জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইরান যখন বিক্ষোভকারীদের দমনে ব্যস্ত ছিল, তখন ইসরায়েল আজারবাইজান ও ইরান সীমান্তে গোপন অভিযানের প্রস্তুতি নেয়। পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র সিএনএনকে এ কথা জানিয়েছে। সূত্রগুলো এটিকে প্রাথমিক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। সে সময় তারা ওই এলাকায় আড়িপাতার যন্ত্র ও গোয়েন্দা সরঞ্জাম স্থাপন করে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেয়।
ইসরায়েল জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়েই যুদ্ধ শুরু করতে চেয়েছিল, কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই সময় হামলার পরিকল্পনা বাতিল করে দেন এবং বলেন, ইরান বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে।
ইসরায়েল নিজস্ব উদ্যোগে অগ্রসর হয়
ইরানের সীমান্ত সংলগ্ন আজারবাইজানের অভ্যন্তরে গোয়েন্দা সরঞ্জাম স্থাপনের অভিযানে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বিশেষ ইউনিট ও স্টিলথ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছিল। কারণ ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অবশ্যই ব্যর্থ হবে।
আজারবাইজানের এই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্র থেকে ইসরায়েল ইরানের সামরিক গতিবিধি ও স্থাপনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করত এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সতর্কতাও পেত।
এ ছাড়া ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার আজারবাইজানের রাজধানী বাকু সফর করেন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে আজারবাইজান গোপনে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে সরাসরি আলোচনার বিরল আয়োজন করতে পেরেছিল।
একটি সূত্র জানায়, আজারবাইজান থেকে পরিচালিত অন্যতম একটি অভিযানে ৪ মার্চ রহমান মোগাদ্দামকে হত্যা করা হয়। তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনার জন্য তিনি দায়ী ছিলেন। এর একদিন পরই আজারবাইজানের নাখচিভানের বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে একটি টার্মিনাল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এ ঘটনার জন্য ইরানকে দায়ী করে এটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এটি ‘কুৎসিত, কাপুরুষোচিত ও নির্লজ্জ’ ঘটনা। ইরান অবশ্য ড্রোন হামলার কথা অস্বীকার করেছে।
৬ মার্চ আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা জানায়, তারা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সেই সঙ্গে ইসরায়েলি ও ইহুদি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য আইআরজিসির একটি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পরে ইসরায়েল প্রকাশ্যে স্বীকার করে, এটি যৌথ অভিযান ছিল, যেখানে মোসাদ, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত সম্পৃক্ত ছিল।
বাণিজ্যিক ও সামরিক স্বার্থে ইসরায়েল ও আজারবাইজানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাকু তার তেলের একটি বড় অংশ ইসরায়েলকে সরবরাহ করে। বিনিময়ে ইসরায়েল আজারবাইজানের কাছে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র বিক্রি করে, যার কয়েকটি ২০১৬ ও ২০২০ সালে নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাতে আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম ক্রয় করে আজারবাইজান।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বেগিন-সাদাত সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ গারশন কোগান লেখেন, আজারবাইজানে ইসরায়েলি কৌশল ইচ্ছাকৃতভাবে স্বল্প পরিসরে প্রচার করা হয়েছে। উভয় দেশের মধ্যে অস্ত্র হস্তান্তর, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও নিরাপত্তা খাতে দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক জোশুয়া কুসেরার মতে, এই সম্পর্ক আজারবাইজানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ দিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটন ডিসিতে ইসরায়েলের লবি ব্যবহার করে।
কুসেরা বলেন, আজারবাইজান নিজেদের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন সময়ে তারা ইসরায়েল ও আরব এবং অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করার চেষ্টাও করেছে। আইআরজিসির অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা মোকাবিলায় আজারবাইজানকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে ইসরায়েল যদি সাহায্য করে থাকে, তা অত্যন্ত গোপনে করেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক