রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব মেনে ঘরে ফিরছেন মমতা ও শরদ পাওয়ার?
কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গঠিত ভারতের প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলগুলো আবারও মূল দলে ফিরে আসতে পারে বলে দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিক শরদ পাওয়ারের ‘জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি’ (এনসিপি-এসপি) মূল দল জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা ছড়িয়েছে। খবর এনডিটিভির।
অবশ্য কংগ্রেসের সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল তৃণমূলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার এই আলোচনাকে ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে মহারাষ্ট্র প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি নানা পাটোলে এ বিষয়ে উল্টো ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সমমনা দলগুলো কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নানা পাটোলে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, শরদ পাওয়ার ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসে একীভূত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটি কোনো নির্বাচনি জোট নয়, বরং সরাসরি মূল দলে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া। শরদ পাওয়ারের পক্ষ থেকে এনসিপিকে কংগ্রেসে একীভূত করার প্রস্তাব আগেও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা বিলম্বিত হয়। দেশের রাজনীতিতে ভোটের ব্যাপক বিভাজন রোধ করতে ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী আদর্শের সব দলের এখন এক হওয়া উচিত।
কয়েক দিন আগে উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউতও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। তিনি শরদ পাওয়ারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গঠিত ছোট দলগুলোকে আবার মূল দলে ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। সঞ্জয় রাউতের ওই প্রস্তাবকে ‘ভালো প্রস্তাব’ বলে মন্তব্য করেছিলেন শরদ পাওয়ারের মেয়ে তথা লোকসভা সংসদ সদস্য সুপ্রিয়া সুলে। তবে তিনি এই বিষয়ে নিজের দলগত অবস্থান সরাসরি খোলসা করেননি।
এদিকে রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলটও এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গঠিত আঞ্চলিক দলগুলোর আবার ঘরে ফিরে আসার সময় এসেছে। তাদের উচিত আন্তরিকভাবে রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া।
ফিরে আসার এই আলোচনার নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৯৮ সালে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মতবিরোধের জেরে কংগ্রেস ছেড়ে নতুন দল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ গঠন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর পরের বছর, ১৯৯৯ সালে সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি নাগরিকত্বের ইস্যু তুলে শরদ পাওয়ার, পি এ সাংমা ও তারিক আনোয়ার মিলে গঠন করেন ‘জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি’ (এনসিপি)। পরবর্তীতে অবশ্য তারিক আনোয়ার আবারও কংগ্রেসে ফিরে যান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল দুটি বর্তমানে তীব্র অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ২০২৩ সালে শরদ পাওয়ারের ভাতিজা অজিত পাওয়ার দলে বিদ্রোহ করে বিজেপির সাথে হাত মেলান এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এনসিপির নাম ও মূল প্রতীক (ঘড়ি) নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। ফলে শরদ পাওয়ারের অংশটি এখন ‘এনসিপি-শরদচন্দ্র পাওয়ার’ নামে চলছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে জাতীয় স্তরে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসও নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে কংগ্রেস ও তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক বৈঠকের পর এই একীভূত হওয়ার জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। গত মঙ্গলবার তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের সংসদীয় দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সাথে তাঁর ১০ জনপথের বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। এর ঠিক পরদিন, বুধবার তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর সাথে প্রায় দেড় ঘণ্টা দীর্ঘ বৈঠক করেন।
কংগ্রেস সূত্রের দাবি, ওই বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি-বিরোধী জোটকে আরও শক্তিশালী করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং রাহুল গান্ধীর সর্বভারতীয় নেতৃত্ব মেনে নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা দেন। তবে কংগ্রেস হাইকম্যান্ড স্পষ্ট করেছে, একীভূত হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে তা তৃণমূলের পক্ষ থেকেই আসতে হবে। কংগ্রেস নিজে থেকে এই মুহূর্তে এমন কোনো উদ্যোগের জন্য জোর করছে না।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক