ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪, আহত সহস্রাধিক
ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ভয়াবহ ও শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা একলাফে বেড়ে অন্তত ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত আহত হয়েছেন আরও ৯৭১ জন। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন (অ্যাক্টিং) প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ হতাহতের এই নতুন তালিকা নিশ্চিত করেছেন। খবর এএফপির।
প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ জানান, বুধবার (২৪ জুন) আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী মূল দুটি ভূকম্পনের পর ওই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টিরও বেশি আফটারশক (অনুকম্পন) রেকর্ড করা হয়েছে। দফায় দফায় এই আফটারশকের কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ধসে পড়া স্থাপনার বিশালতার কারণে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’।
প্রাথমিক রিপোর্টের চেয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
এর আগে ভূমিকম্প আঘাত হানার পরপরই প্রাথমিকভাবে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ৩২ জনের মৃত্যু এবং ৭০০ জনের বেশি মানুষ আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছিল। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধসে পড়া বহুতল ভবনগুলোর নিচে তল্লাশি চালিয়ে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করায় মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। রাজধানী কারাকাস ও তার উত্তর-কেন্দ্রীয় রাজ্যগুলোতে বহু ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে এবং অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার।
১৯০০ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় দেশের পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথম প্রাক-ঝাঁকুনির রেশ কাটতে না কাটতেই ৭.৫ মাত্রার মূল ভূকম্পনটি আঘাত হানে, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ থেকে ২২ কিলোমিটার গভীরে। ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এটি ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবরের (৭.৭ মাত্রা) পর সবচেয়ে শক্তিশালী ও মারাত্মক ভূমিকম্প। এই দুর্যোগে কারাকাসের উত্তরের লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপকূলীয় শহর কাটিয়া লা মার বর্তমানে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং আতঙ্কে হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন।
২২ তলা ভবন ধস ও নিখোঁজ শত শত
ভূমিকম্পের তীব্রতায় রাজধানী কারাকাসের অভিজাত আলতামিরা এলাকায় একটি ২২ তলা আবাসিক ভবন তাসের ঘরের মতো সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ধংসস্তূপের চারপাশজুড়ে এখন শুধু স্বজনহারা মানুষের কান্নার আওয়াজ। নিখোঁজদের উদ্ধারে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা টর্চের আলো নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। লা গুয়াইরা শহরের বাসিন্দা ল্যারি রোহাস (৪৯) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ঢোকার মতো শক্তি বা সাহসটুকুও আমাদের নেই, শুধু ভাবুন আমাদের অবস্থা।" তাঁর পুরো পরিবার একটি ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে রয়েছে। অন্যদিকে, একটি ধসে পড়া ১২ তলা ভবনের সামনে অপেক্ষারত এক মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ভেতরে এখনও মানুষ বেঁচে আছে, কিন্তু তাদের বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসছে না।
অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো জানিয়েছেন, ট্রুজিলো, কারাবোবো, মিরান্ডা এবং লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় ধরনের গ্যাস দুর্ঘটনা এড়াতে বহু এলাকার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এছাড়া, গুরুতর অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কারাকাসের প্রধান ‘মাইকেতিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহায়তার ঢল ও কলম্বিয়ায় আতঙ্ক
ভেনেজুয়েলার এই জাতীয় সংকটে জরুরি উদ্ধারকারী দল ও মানবিক সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, চীন, ভারত ও ব্রাজিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আজ বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মানবিক সহায়তা মোতায়েন করছে। এছাড়া ফ্রান্স ৮৫ জন এবং স্পেন ৫৪ জন সেনাসদস্যের বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে।
এই ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতা পর্যন্ত অনুভূত হয়েছে। সেখানে আতঙ্কে শত শত বহুতল ভবন খালি করে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। কলম্বিয়ার ন্যাশনাল সিসমোলজিক্যাল নেটওয়ার্কের সমন্বয়কারী ফ্রেডি তোভার জানান, দেশজুড়ে তারা ২০০টিরও বেশি কম্পনের রিপোর্ট পেয়েছেন এবং মূল ভূমিকম্পের পর আরও বড় ধরনের আফটারশকের আশঙ্কা রয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক