গাজায় কি সত্যিই ইহুদি বসতি গড়তে পারে ইসরায়েল?
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞের পর এবার গাজা ভূখণ্ডে নতুন করে ইহুদি বসতি স্থাপনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অতি-ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। খবর আল জাজিরার।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচ জানান, তার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে উত্তর গাজায় তিনটি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন শুধু প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সবুজ সংকেতের অপেক্ষা। এর পরদিনই ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু গাজায় বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করতে অস্বীকৃতি জানান। সেখানে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে তাড়িয়ে দেওয়াকে ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বলে উল্লেখ করেন তিনি, যাকে আন্তর্জাতিক আইনবিদরা ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
গাজায় বর্তমান পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতিগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। গাজায় নতুন করে বসতি স্থাপনের পথ সুগম করতে ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সমর্থিত বিশেষজ্ঞরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি এবং শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ এনেছেন। ২০০৫ সালে গাজা থেকে ইসরায়েল তাদের ২১টি অবৈধ বসতি সরিয়ে নিয়েছিল। তবে বর্তমানে উত্তর গাজা সিটি ও এর আশপাশের এলাকাগুলো বোমা মেরে ও বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা নতুন বসতি গড়ার জন্য ফাঁকা জমি হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা চলছে।
রাজনৈতিক সুবিধা ও অভ্যন্তরীণ জনমত
ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু ও স্মোট্রিচের মতো রাজনীতিবিদদের জন্য এই বসতি নীতি প্রচার করা রাজনৈতিকভাবে বেশ সুবিধাজনক। লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির ইসরায়েলি অধ্যাপক নেভে গর্ডন বলেন, ‘৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি জনগণকে প্রতিনিয়ত উগ্র জাতীয়তাবাদের দিকে উসকে দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের একটি বড় অংশ গাজায় নতুন বসতি দেখতে চায় এবং স্মোট্রিচ মূলত তাদের ভোট টানতেই এই বক্তব্য দিচ্ছেন। এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, গাজায় পুনরায় বসতি স্থাপনের জন্য ইসরায়েলি রাজনীতিতে একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক চাপ রয়েছে।’
নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা
অর্থমন্ত্রী স্মোট্রিচের ‘রিলিজিয়াস জিওনিস্ট’ পার্টি বর্তমানে জনমত জরিপগুলোতে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। এমনকি আগামী অক্টোবরের শেষ নাগাদ হতে যাওয়া নির্বাচনে তারা সংসদে প্রবেশের জন্য ন্যূনতম ভোট পাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ফলে ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তিনি গাজায় বসতি স্থাপনের বিষয়টিকে বড় করে দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে, একাধিক দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি হওয়া প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্যও এই যুদ্ধ ও বসতি এজেন্ডা বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে জরুরি, অন্যথায় দোষী সাব্যস্ত হলে তার জেল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন সমর্থন
অভ্যন্তরীণভাবে ইসরায়েলি জনগণের বড় অংশ ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের প্রতি উদাসীন হলেও, আন্তর্জাতিক মহলে এর বড় প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে ইসরায়েল এতদিন আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে তোয়াক্কা না করেই পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ করেছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো হিউ লোভাট বলেন, ‘গাজার ক্ষেত্রে হয়তো মার্কিন মনোযোগ কিছুটা বেশি, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে ইসরায়েল এত বড় পদক্ষেপ নেবে কি না তা দেখার বিষয়। তবে গাজায় বসতি স্থাপন শুরু হলে ইউরোপীয় দেশগুলো হয়তো শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারে।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক