গাজার প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দিল হামাস
ফিলিস্তিনি ইসলামপন্থি সংগঠন হামাস গাজা উপত্যকা শাসনকারী তাদের প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটি আজ সোমবার (৬ জুলাই) এক বার্তায় এ তথ্য জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে একটি টেকনোক্র্যাট কমিটির পক্ষে গাজা উপত্যকার বেসামরিক শাসনভার গ্রহণের পথ সুগম হলো। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
এই পদক্ষেপটিকে হামাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০০৬ সালের আইনসভা নির্বাচনে জয়ের পর, ২০০৭ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ফাতাহর কাছ থেকে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে হামাস গাজা শাসন করে আসছিল।
গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে সংগঠনটি বারবার দৈনন্দিন শাসনভার থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি প্রকাশ করেছে। তবে তাদের নিরস্ত্রীকরণের মতো জটিল বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
হামাসের সরকারি মিডিয়া অফিসের প্রধান ইসমাইল আল-থাওয়াবতা এএফপি-কে জানান, সরকারের জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা আনুষ্ঠানিকভাবে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
ইসমাইল আল-থাওয়াবতা বলেন, ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে প্রশাসনিক ও সরকারি ক্ষমতা হস্তান্তর সহজ করার জন্য মোহাম্মদ আল-ফাররা কমিটি বিলুপ্ত করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করার সময় যে 'বোর্ড অব পিস' গঠন করেছিলেন, তারই অধীনে এই এনসিএজি তৈরি করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম এএফপি-কে বলেন, ‘আগ্রাসন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দখলদারদের (ইসরায়েল) সব ধরনের অজুহাত কেড়ে নিতে হামাস এই নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে তারা আর গাজা উপত্যকার দায়িত্বে থাকবে না।’
হাজেম কাসেম আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটি (এনসিএজি) দ্রুত এখানে প্রবেশ করবে। এই কমিটির সাফল্য নিশ্চিত করতে হামাস তাদের কাছে সরকারি দায়িত্ব হস্তান্তর করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’
হামাসের একজন কর্মকর্তা এর আগে এএফপি-কে জানিয়েছিলেন যে, কায়রোতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠকে সংগঠনটি ইতিমধ্যেই অন্যান্য ফিলিস্তিনি উপদলগুলোকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, উপদলগুলো হামাসের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং এটিকে জাতীয় কমিটির শাসনভার গ্রহণের পথ সুগম করার ক্ষেত্রে একটি আন্তরিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হামাসের এই কমিটি বিলুপ্তির ফলে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট আলী শাথ-এর নেতৃত্বাধীন এনসিএজি-এর জন্য এই অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার পথ সুগম হলো।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে এনসিএজি-এর প্রবেশে ইসরায়েলের আপত্তির কারণে কমিটিটি গত কয়েক মাস ধরে গাজার বাইরে অবস্থান করছিল বলে জানা গেছে।
মতপার্থক্যগুলো কমিয়ে আনতে, বিশেষ করে গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে আলোচনার জন্য হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি উপদলগুলো কায়রোতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করেছে।
প্রথম পর্যায়ের চুক্তির মধ্যে ছিল ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের বিনিময়ে হামাসের কাছে থাকা শেষ ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া।
দ্বিতীয় পর্যায়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি গত কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে আছে। এর মধ্যে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইসরায়েলি বাহিনী আসলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতি আরও বাড়িয়েছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।
এদিকে, হামাস তাদের অস্ত্রাগারের কোনো অংশ হস্তান্তরের কথা বিবেচনা করার আগে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছে।
যুদ্ধোত্তর গাজার শাসনভার কার হাতে থাকবে, তা এখনো দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের আলোচনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান জটিলতা হিসেবে রয়ে গেছে।
ইসরায়েল ক্ষমতার কেন্দ্রে হামাসের যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তন প্রত্যাখ্যান করছে, পাশাপাশি এই মুহূর্তে রামাল্লা-ভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণকেও তারা প্রত্যাখ্যান করছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক