ইমাম রেজার মাজারে সমাহিত আয়াতুল্লাহ খামেনি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনে নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনিকে তার জন্মভূমি মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা (আ.) মাজার শরিফে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দিনগত রাতে লাখ লাখ শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে মাজারের ‘দার আল-জিকর’ কক্ষে তার দাফন সম্পন্ন হয়। খবর প্রেস টিভির।
দাফনের আগে ইমাম রেজা মাজারের ‘পায়াম্বার-ই আজম’ (মহানবী) চত্বরে মরহুম নেতার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন আয়াতুল্লাহ খামেনির জ্যেষ্ঠ পুত্র সৈয়দ মোস্তফা খামেনি। এরপর তার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে একান্ত বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। দাফন শেষে ইরানসহ সারাবিশ্বের মুসলমানরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় ‘লায়লাত আল-দাফন’ (দাফনের রাত) নামাজ আদায় করেন।
মাশহাদের রাজপথে জনসমুদ্র ও প্রতিশোধের স্লোগান
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মাশহাদ শহরটি এক অনাবিল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সর্বোচ্চ নেতার কফিনবাহী গাড়িটি যখন শহরের প্রধান সড়কগুলো দিয়ে যাচ্ছিল, তখন চারদিক থেকে কোটি মানুষের কান্নার রোল ওঠে। কফিন বহনের মূল পথ ছাড়াও নওয়াব সাফাভি, তাবারসি ও শিরাজি সড়কের মাইলের পর মাইলজুড়ে সাধারণ মানুষ জানাজায় শরিক হন।
সমাবেশে অংশ নেওয়া কোটি মানুষের কণ্ঠে এ সময় ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’, ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। শোকের আবহের মাঝেই লাখ লাখ মানুষের হাতে উড়তে দেখা যায় লাল রঙের ‘প্রতিশোধের পতাকা’, যাতে লেখা ছিল— ‘ইয়া লাথারাত আল-হুসাইন’ (হে হুসাইনের রক্তবদল গ্রহণকারীরা)। লাউডস্পিকারে প্রয়াত নেতার পুরোনো ভাষণগুলো প্রচারের সময় উপস্থিত জনতা সমস্বরে ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।
৪৫ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বনেতাদের শেষ শ্রদ্ধা
গত শুক্রবার থেকে খামেনির এই চূড়ান্ত বিদায় রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়, যেখানে বিশ্বের ৪৫টিরও বেশি দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং ৯০টি দেশের শীর্ষস্থানীয় স্কলার ও পণ্ডিতরা অংশ নেন। এর আগে গত সপ্তাহে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা এবং পবিত্র কোমে লাখ লাখ মানুষ তার কফিনে শ্রদ্ধা জানান।
গত বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে প্রায় ১ কোটি ইরাকি নাগরিক ঐতিহাসিক এই শোকযাত্রায় শামিল হন, যা ইরাকের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম সমাবেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক ও নাইজেরিয়া থেকে হাজার হাজার মানুষ ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এই জানাজায় অংশ নেন। নাইজেরিয়ার ইসলামি আন্দোলনের নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকি এবং তুরস্কের প্রতিনিধি দলও মাশহাদের এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তুর্কি শিয়াদের মুখে ‘লাব্বাইক ইয়া সৈয়দ মুজতবা’ স্লোগান শোনা যায়, যা ইরানের বর্তমান নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মুজতবা খামেনির প্রতি বিশ্ব মুসলিমের আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি জোট ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র আগ্রাসন শুরু করে। ওই হামলার প্রথম দিনেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সপরিবারে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
এই নৃশংস হামলায় খামেনির সঙ্গে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছিলেন। যার মধ্যে রয়েছেন ইরানের বর্তমান নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মুজতবা খামেনির স্ত্রী, প্রয়াত নেতার জামাতা, এক কন্যা ও তার মাত্র ১৪ মাস বয়সী এক নাতনি। নিজের জন্মভূমিতে ইমাম রেজার পবিত্র মাজারের কোল ঘেঁষেই খামেনি ও তার শহীদ পরিবারের সদস্যদের চিরদিনের জন্য সমাহিত করা হলো।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক