ইউরোপের দেশগুলো কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে?
বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। বাণিজ্য যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাত দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের মজুত স্বর্ণ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো। যেকোনো দেশ মজুত স্বর্ণ হাতের নাগালে রাখতে চায়। যাতে বড় সংকটের সময়ে স্বর্ণ দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
আজ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ডি নেদারল্যান্ডসচে ব্যাংক’ (ডিএনবি) উত্তর আমেরিকা থেকে টন টন স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে। ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, এই পদক্ষেপ তাদের কঠিন সংকটের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুত রাখবে। ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ডাচদের মোট ৩১৩ টন স্বর্ণ গচ্ছিত ছিল। সেখান থেকে ৮৬ টন স্বর্ণ লন্ডনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লিজপেন বলেন, আমরা আশা করি এই স্বর্ণ ব্যবহারের প্রয়োজন কখনও হবে না। তবে আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রস্তুতি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
লন্ডন হলো বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র। সংকটের সময়ে সহজে এবং দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচা করার জন্য লন্ডন সেরা জায়গা। এই কারণে ‘ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড’ স্বর্ণ গচ্ছিত রাখার জনপ্রিয় স্থান। সেন্ট্রাল লন্ডনে ৩০০ বছরের পুরোনো এই ব্যাংকের নিচে সুরক্ষিত ভল্ট রয়েছে। সেখানে প্রায় ৪ লাখ সোনার বার রয়েছে। যার বর্তমান মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি।
তবে কেবল নেদারল্যান্ডস একা এমন পদক্ষেপ নেয়নি। চলতি বছরের শুরুর দিকে ফ্রান্সও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের স্বর্ণ সরিয়ে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে জার্মানির বুন্ডেসব্যাংক বিদেশে রাখা ২১৬ টনের বেশি সোনা স্থানান্তর করেছে। এর মধ্যে ১১১ টন নিউইয়র্ক থেকে আনা হয়। আর ১০৫ টন প্যারিস থেকে সরিয়ে আনা হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর ধরে তারা এই প্রক্রিয়া চালায়।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস এবং দান স্ট্রুয়ভেন জানান, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণ নিউইয়র্কে সরিয়েছিল। বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা দেখা দিলে অতীতেও এমন কৌশল নেওয়া হয়েছে। রিজার্ভ ম্যানেজারদের কাছে দেশের স্বর্ণ কোথায় রাখা হবে— তা এখন প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট জোসেফ ক্যাবাটোনি বিবিসিকে জানান, যুদ্ধ এবং বাণিজ্য সংঘাত এই সিদ্ধান্তগুলোতে প্রভাব ফেলছে। তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং সহজে লেনদেনের সুবিধাও এর পেছনে কাজ করছে। ক্যাবাটোনি বলেন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে— বিষয়টি তেমন নয়। মানুষ এখন সংরক্ষিত সম্পদ ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে শিখছে।
আধুনিক যুগে স্বর্ণ স্থানান্তরের নানা উপায় রয়েছে। ডাচরা তাদের ৫৯ টন সোনা নিউইয়র্কে বিক্রি করে দেয়। এরপর তারা সমপরিমাণ স্বর্ণ লন্ডনে কেনে। ফলে ওই পরিমাণ স্বর্ণ সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে হয়নি। ক্যাবাটোনি জানান, একই দিনে ও একই সময়ে এক জায়গায় সোনা বিক্রি করে অন্য জায়গায় কেনার মাধ্যমে খাতাপত্রে স্বর্ণ স্থানান্তর করা যায়।
তবে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ কায়িক বা সরাসরি আমেরিকা ও কানাডা থেকে সরানো হয়েছে। সেগুলো প্রথমে নেদারল্যান্ডসের জেইস্ট শহরে আনা হয়। পরে সেখান থেকে আবার লন্ডনে পাঠানো হয়। এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরিবহণ কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা হয়। গোপনীয়তা এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রেখে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।
সীমান্তজুড়ে স্বর্ণ পরিবহণের কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠান হলো ‘ব্রিন্কস গ্লোবাল সার্ভিসেস’। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সোনা স্থানান্তরের চাহিদা বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
অবশ্য নিজ দেশে স্বর্ণ সংরক্ষণ করার জন্য বড় ধরনের খরচ রয়েছে। লিনা থমাস ও দান স্ট্রুয়ভেন জানান, নিজ দেশে স্বর্ণ রাখতে ভৌত নিরাপত্তা তৈরি করতে হয়। সাথে অডিট অবকাঠামো ও বীমার ব্যবস্থা করতে হয়। ছোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এই খরচ বহন করা কঠিন।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমেই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে। গত চার বছরে তারা গড়ে বছরে এক হাজার টন করে স্বর্ণ কিনেছে। এর আগের এক দশকে তারা বছরে গড়ে ৫০০ টন করে স্বর্ণ কিনত। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে সোনা কেনার এই হার বাড়ছে। আগামী বছরগুলোতে এটি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে স্বর্ণের দাম সব রেকর্ড ভেঙে প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। চার্লস শোয়াব বিনিয়োগ ব্যাংকের মতে, গত আধাশতাব্দীতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি সূচকের (সিপিআই) চেয়ে স্বর্ণ অনেক দ্রুত গতিতে লাভজনক সম্পদ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দাম কিছুটা কমলেও সোনা এখনো উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলারে (৩ হাজার ৬২৪ পাউন্ড) পৌঁছাবে। যা চলতি বছরের আগস্টের দামের চেয়েও ৩০০ ডলার বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার ক্রমবর্ধমান চাহিদাই দাম বাড়ার মূল কারণ।
সূত্র : বিবিসি

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক