প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লি লকডাউন, আটক শত শত
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া প্রখ্যাত ইউটিউবার এবং বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী ধ্রুব রাঠিকেও গুরুগাঁওয়ে তার বাসভবন থেকে আটক করা হয়।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। শহরের কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া বেশকয়েকটি মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কার্যত দিল্লিতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। খবর রয়টার্সের।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা সংশোধনে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলনকারীরা। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সংশোধনের ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পাচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের পরিকল্পনা ছিল, মধ্য দিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হবেন। তবে কর্মসূচি শুরুর আগেই এলাকাটি ঘিরে ফেলে নিরাপত্তা বাহিনী।
এরপরও শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়। একটি জনপ্রিয় কারুশিল্পের বাজার এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধের কাছেও বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। এ সময় তাদের জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মধ্য দিল্লিতে কয়েকজন তরুণ বিক্ষোভকারীকে ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। পুলিশ তাদের ধাওয়া করে এবং অনেককে টেনেহিঁচড়ে বাসে তোলে। এ সময় আরও বিক্ষোভকারী সেখানে জড়ো হচ্ছিলেন।
বিক্ষোভকারী যোগেন্দ্র সোলাঙ্কি রয়টার্সকে বলেন, এটি মানুষের অধিকার লঙ্ঘন। দেশ আর এটি সহ্য করবে না।
বিমানে দিল্লি পৌঁছেই আটক আন্দোলনের নেতারা
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রান্কাকে মুম্বাই থেকে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই আটক করা হয়েছে বলে সংগঠনটির এক বিবৃতিতে জানানো হয়।
টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, বিমানের ভেতরে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন দীপকে। এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন। আপনাদের ভয় পাই না।’
জবাবে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘না, এটি গ্রেপ্তার নয়। দয়া করে সহযোগিতা করুন।’
আন্দোলনটির পক্ষ থেকে নেতাদের আটকের ঘটনাকে ‘কর্তৃত্ববাদী আটক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করে সংগঠনটি জানিয়েছে, নেতাদের আটক করা হলেও আন্দোলন চলবে।
টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকেও আটক করা হয়েছে।
বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় দুটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের চার সাংবাদিককে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। রয়টার্সের একজন সাংবাদিককেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভরত কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে আদালতের বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জানিয়েছেন। এসব আটকের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দিল্লিজুড়ে অবরোধ ও তল্লাশি
প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর দিল্লির প্রধান সড়ক ও প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। বাসে উঠে বিক্ষোভকারীদের খুঁজতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। বিভিন্ন যানবাহনেও তল্লাশি চালানো হয়।
সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামযুক্ত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানও মোতায়েন করা হয়।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে মোদি সরকারের ওপর চাপ
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিজেপি সুবিধা পেয়েছে।
গত সপ্তাহে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দুই নির্বাচন কমিশনারের মতবিরোধ হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন ওই দুই কমিশনার।
এ বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমার নিজে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিজেপির দাবি, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণেই নির্বাচনে দলটি সাফল্য পাচ্ছে। নির্বাচনে জয়ী হতে ব্যর্থ হয়ে বিরোধীরা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ দলটির।
অন্যদিকে, বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা কে সি ভেনুগোপাল শনিবারের বিধিনিষেধের সমালোচনা করে বলেন, মোদি সরকার কার্যত ‘নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’।
বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র অবশ্য দাবি করেন, জনতার বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে গণতন্ত্রই জয়ী হয়েছে।
এর আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ
বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি এন্ট্রি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ব্যক্তি অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, খসড়া ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় শনাক্ত হওয়া এন্ট্রিগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে। কোনো যোগ্য ভোটারের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তিনি পুনরায় ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারবেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক