একটি শোকার্ত শপথ, রাজনীতিতে খালেদা জিয়া
রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার আবির্ভাব এক বিস্ময়। অনেকটা আকস্মিকভাবেই রাজনীতিতে এলেন খালেদা জিয়া। রাজনীতিতে আসার তার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। জিয়াউর রহমানের সংসারে ‘গৃহবধূ’ হিসেবেই তিনি নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। কিন্তু নিয়তি যেন তাকে টেনে এনেছিল রাজনীতিতে।
জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় রাজধানী ঢাকায়। আশির দশকের প্রথমার্ধে। দেশ ও জাতির এক সংকটময় মুহূর্তে তিনি রাজনীতি শুরু করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম মৃত্যুর পর দেশে নেমে আসে এই সংকট। একদিকে শুরু হয় দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ধ্বংসের ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। এরই নীল নকশা হিসেবে বিএনপিতে সৃষ্টি হয় ভাঙন। শুরু হয় নানামুখী ষড়যন্ত্র। একদল চাইল বিএনপিকে জিয়ার আদর্শ থেকে সরিয়ে নিতে। অন্য দল এর প্রতিবাদ করল। তাদের কথা জিয়ার আদর্শ থেকে দলকে একচুলও বিচ্যুত করা যাবে না ।
আরও পড়ুন : কেউ বলল রাজকন্যা, কেউ লাল টুকটুকে মেয়ে!
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নানা মতের লোকদের নিয়ে এই দলটি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে দলে কোনো ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে দলে নেমে আসে এই সংকট। এতে তাঁর আদর্শে যারা পুরোপুরি বিশ্বাসী ছিলেন তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন তরুণ নেতৃত্ব। তাদের ভাবনায় ছিল, কী করে দলকে টিকিয়ে রাখা যায়, কী করে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে জিয়ার আদর্শকে ধরে রাখা যায়?
অবশেষে জিয়া ভক্তরা ভাবলেন, দলকে এই বিপর্যয় থেকে একজনই রক্ষা করতে পারেন এবং তিনিই হতে পারেন জিয়ার উত্তরসূরি। তিনি হলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু তিনি কি রাজি হবেন? দলের দায়িত্ব কি তিনি নেবেন? অবশেষে শত দ্বিধার মুখেও তারা সিদ্ধান্ত নিলেন খালেদা জিয়ার কাছে তারা যাবেন। অনুরোধ করবেন তাঁকে রাজনীতিতে আসার। এদিকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে ষড়যন্ত্র এবং বিএনপির এই বিপর্যয়ের খবরে খালেদা জিয়াও বিচলিত। মনে তখন নানা শঙ্কা। তার স্বামীর হাতে গড়া দল বিএনপি ধ্বংস হয়ে যাবে? দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে? তার কি কিছুই করার নেই? তিনিও ভাবতে শুরু করলেন।
এ অবস্থায় বিএনপির ওই নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে দলকে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার অনুরোধ করলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আ স ম মোস্তাফিজুর রহমান, ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, জুলমত আলী, রফিকুল ইসলাম মিয়া, সিদ্দিকুর রহমান, হারুনুর রশীদ, লোকমান হোসেন ফকির, তরিকুল ইসলাম, জাহানারা বেগম, শাহারা মজিদ প্রমুখ। খালেদা জিয়া তাদের কথা শোনেন এবং তার সিদ্ধান্ত পরে জানাবেন বলে জানান। কথাগুলো লিখেছেন সাংবাদিক আবদাল আহমদ খালেদা জিয়ার আত্মজীবনীমূলক ‘নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া’ নামে গ্রন্থে।
আবদাল আহমদের বইয়ের বরাতে জানা যায়, খালদা জিয়া কি এ অবস্থায় রাজনীতিতে অংশ নেবেন? মতামত চাইলেন আত্মীয়-স্বজনের কাছে। সবার কাছ থেকেই মোটামুটি আশাব্যঞ্জক সাড়া পেলেন। তবে বাবা ইস্কান্দর মজুমদার প্রথমে রাজি হলেন না। কিন্তু পরে তিনি এ সিদ্ধান্তটি খালেদা জিয়াকেই ভেবেচিন্তে নেওয়ার পরামর্শ দেন। বাবা তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, জীবনে চলতে গিয়ে সবার কথা শুনতে হবে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে চলা ভালো। বেগম জিয়া তা-ই করলেন। আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে আলাপ করে ভালো-মন্দ সম্পর্কে অবহিত হলেন।
আরও পড়ুন : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ
খালেদা জিয়া তাঁর স্বামী জিয়াকে ২১ বছর ধরে কাছ থেকে দেখেছেন। একজন সৈনিক জিয়া, একজন মুক্তিযোদ্ধা জিয়া, একজন রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়াকে তিনি দেখেছেন। তিনি দেখেছেন তার কাজ। একজন মানুষ একটি দলকে গড়ে তোলার জন্য দিন-রাত কী পরিশ্রমই না করেছেন, বেগম জিয়া নিজেই তার সাক্ষী। দলের উন্নতির জন্য নেতাদের নিয়ে জিয়া অফিস ছাড়াও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসায় বৈঠক করেছেন। এর জন্য তাঁকেও সারারাত জেগে থাকতে হয়েছে। জিয়ার সেই দল ধ্বংস হয়ে যাবে? সেই মানুষটির আদর্শ মুছে যাবে? ভাবছিলেন তিনি। জিয়া দেশকে নিয়ে ভাবতেন। দেশ নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। এটি একটি সুখী দেশ হবে, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, মানুষের জীবনে সুখ আসবে, শান্তি আসবে। জিয়ার সেই স্বপ্ন মুছে যাবে? এই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
অবশেষে খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি রাজনীতি করবেন। রাজনীতি করবেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। তিনি রাজনীতি করবেন জিয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য। তা ছাড়া তাকেও তো বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকার জন্য তো একটা অবলম্বন দরকার। তাই সবদিক ভেবে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন স্বামীর প্রতিষ্ঠিত প্রাণপ্রিয় দল বিএনপিতে যোগ দেবেন।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি। খালেদা জিয়ার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এই শুভদিনেই তিনি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। এদিনই তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নেন। তার এই সিদ্ধান্তে বিএনপিতে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যারা জিয়াকে ভালোবাসতেন, তাদের মধ্যে। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তে নাখোশ হলো কিছু কুচক্রী বিএনপিনেতা, যাদের সঙ্গে তখন থেকেই গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন জেনারেল এরশাদ। তারা দেখলেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া নেতৃত্বে এলে তাদের জন্য সুবিধা হবে না। ফলে বেগম জিয়া যেন নেতৃত্বে না আসতে পারেন, সেজন্য শুরু হলো গোপনে ষড়যন্ত্র।
১৯৮২ সালের ২১ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়। কে হবেন দলের চেয়ারম্যান? বিএনপির তরুণ নেতৃত্ব খালেদা জিয়াকে অনুরোধ করলেন দলের চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াতে। অপরদিকে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব বিএনপির চেয়ারম্যান পদে দেখতে চায়।
আরও পড়ুন : আপসহীন নক্ষত্রের বিদায়
তরুণ নেতাদের বক্তব্য ছিল, জিয়ার আদর্শবিরোধীরা বিচারপতি সাত্তারকে ঘিরে রেখেছে। বিচারপতি সাত্তার বিএনপির চেয়ারম্যান হলে জিয়ার আদর্শের বিচ্যুতি ঘটবে। এ অবস্থায় তরুণ নেতৃত্বের দাবির মুখে তিনি নির্বাচন কমিশনে চেয়ারম্যান পদের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। ৮২ সালের ৫ জানুয়ারি রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাব করেন বিএনপির মঠবাড়িয়া (বরিশাল) থানা শাখার সভাপতি প্রবীণ নেতা শামসুল হক আর সমর্থন করেন নগরকান্দা (ফরিদপুর) থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান মোল্লা।
এদিকে বিচারপতি সাত্তারও চেয়ারম্যান পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ সময় বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম জিয়ার বাসায় যান এবং দলের বিষয় নিয়ে আলাপ করেন। বেগম জিয়া তাকে দলের তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবের কথা জানান। বিচারপতি সাত্তার এ সময় বেগম জিয়াকে দলের সহ-সভাপতি এবং দেশের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন। এতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিচারপতি সাত্তার দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
খালেদা জিয়া তাঁকে সমর্থনকারী বিএনপিনেতাদের জানান, দলের বৃহত্তর স্বার্থে এবং বিচারপতি সাত্তারের প্রতিশ্রুতিতে আশ্বস্ত হয়ে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। বিচারপতি সাত্তার তাঁকে কথা দিয়েছেন, দলকে তিনি ঐক্যবদ্ধ রাখবেন। তিনি আরও বলেন, দল বা কোনো পদের প্রতি তার কোনো লোভ নেই। তিনি চান বিএনপি যেন বিভক্ত না হয়। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত তখনই প্রশংসিত হয়েছিল।
১৯৮২ সালের ৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়া সংবাদপত্রে এক দীর্ঘ বিবৃতির মাধ্যমে রাজনীতিতে পদার্পণের সিদ্ধান্তের কথা দেশবাসীকে জানান। বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল দেশ গঠনের উদ্দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেছিলেন। এই দলকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার জন্য তিনি কয়েক বছর ধরে কী অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন তা আপনারা জানেন। বিগত ৩০ মে ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে শাহাদাতবরণের পূর্ব মুহূর্তেও তাঁর এই প্রাণপ্রিয় দলের সাংগঠনিক কাজে তিনি নিয়োজিত ছিলেন।
বিগত কিছুকাল যাবৎ আমি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কার্যকলাপ গভীরভাবে অবলোকন করে আসছি। আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, দলের ভেতর বিভিন্ন বিষয়ে একটা ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, যা দলীয় ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন করতে পারে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং দলীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার্থে আমাকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন মহল রাজনীতিতে অংশ নিয়ে বিএনপির দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
এমতাবস্থায় সব দিক বিবেচনা করে দলের বৃহত্তর স্বার্থে আমি বিএনপিতে যোগ দিয়েছি এবং দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হয়েছি। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শহীদ জিয়ার গড়া এই দলের ঐক্য এবং সংহতি বজায় রাখা। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া। এরই মধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সাত্তারের সঙ্গে আমার দেশ ও দলীয় ব্যাপারে কিছু আলোচনা হয়েছে। তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া প্রণীত ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন এবং বিএনপির ঐক্য সংহতি বজায় রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। তার অনুরোধে এবং এই আশ্বাসে আমি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আমার আবেদন, তারা যেন নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে নিঃস্বার্থভাবে শহীদ জিয়ার অনুসৃত কর্মধারা ও আদর্শের ভিত্তিতে শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। আমি তাদের সঙ্গে সবসময় থাকব।’
সৈয়দ আবদাল আহমদ বইতে উল্লেখ করেন, ওই সময় দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি সাত্তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। খালেদা জিয়া নানা বিষয়ে পরোক্ষভাবে তাঁকে সহযোগিতা করছেন। এ অবস্থায় সেনা ছাউনিতে ঘাপটি মেরে থাকা সেনাপ্রধান এরশাদ দেখলেন, বেশি দিন এভাবে চলতে দিলে তার অভিলাষ চরিতার্থ করা যাবে না। এত দিন সূক্ষ্মভাবে দাবার গুটির চাল দিয়ে একটির পর একটি ঘটনা যে তিনি ঘটিয়েছেন তার মুখোশ উম্মোচিত হয়ে যাবে। তাই আর বিলম্ব নয়। ক্ষমতায় সেনাবাহিনীর অংশীদারত্ব চেয়ে প্রথমে তিনি একটি বিবৃতি দিলেন। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন বিতর্ক হলো। এরই মধ্যে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলাজনিত কিছু ঘটনা ঘটানো হলো । এরপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এলো সেই কলংকিত দিন। জেনারেল এরশাদ রাতের অন্ধকারে বঙ্গভবনে ঢুকে বন্দুকের নলের মুখে বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিলেন। বন্দুকের নলের মুখে তাঁকে জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ও রেডিওতে বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হলো। বলানো হলো দুর্নীতি এতই ব্যাপক হয়েছে যে, তার (সাত্তার) পক্ষে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃহত্তর স্বার্থেই সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনা ছিল নিতান্তই এরশাদের ভাওতাবাজি। কিন্তু বিচারপতি সাত্তারের পক্ষে আর কিছুই করার ছিল না।
পরে বিচারপতি সাত্তার এক বিবৃতির মাধ্যমে এরশাদ কীভাবে তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন তা জাতির সামনে তুলে ধরেন। বিবৃতিতে বিচারপতি সাত্তার বলেন, ‘দেশের জনসাধারণের ভোটে আমি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমি দায়িত্ব পেয়েছিলাম। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রগতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামোতে এবং সুস্থ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যখন সরকারি দায়িত্বে ব্যস্ত ছিলাম, সেই মুহূর্তে রাতের অন্ধকারে আচমকা অস্ত্রের মুখে আমার কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় এরশাদ। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনায় আমার সরকারের মাত্র চার মাস হয়েছিল। আজ স্পষ্টভাবে বলছি, অবৈধ সরকার ও তার তল্পিবাহকরা জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য এবং তাদের কুকীর্তি ঢাকার জন্য মিথ্যার পর মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করছে। জাতির সামনে আমি যে রেডিও-টিভিতে ভাষণ দিয়েছিলাম, সেটি আমার ছিল না। অস্ত্রের মুখে এরশাদ আমাকে দিয়ে বলিয়েছে। জাতি আজ মহাপরীক্ষায় অবতীর্ণ। একদিকে বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন, অন্যদিকে এরশাদের স্বৈরাচারী সমর্থনহীন অবৈধ সরকারের স্থায়ী করার প্রচেষ্টা। আমি জনগণের কাছে সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আমি ও আমার সহকর্মীরা যখন দেশকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করছিলাম, তখন কোনো কারণ ছাড়াই গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এরশাদশাহী ক্ষমতা হরণ করে। আমি এও বলতে চাই—নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা সত্য-মিথ্যার বিচার করবেন।’
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশে যে গণতন্ত্র চালু করেছিলেন, এরশাদের ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসন জারির ফলে সেই বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার নির্বাসিত হলো। গণতন্ত্র পিষ্ট হলো বুটের তলায়। ক্ষমতা কুক্ষিগত করেই এরশাদ ক্ষান্ত হলেন না। বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্য, রাজনীতিকে কলুষিত করার জন্য শুরু করলেন গভীর ষড়যন্ত্র। দেশে সৃষ্টি হয় এক গভীর সংকট। জনগণের ভোটে গঠিত পার্লামেন্ট বাতিল ও সংবিধান স্থগিত করে সামরিক শাসনের আবরণে সৃষ্টি করা হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থার। রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। হুলিয়া জারি করে নির্যাতন, জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে নিপীড়নের স্টিমরোলার চালানো হয়। হরণ করা হয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। সামরিক সরকারের একমাত্র টার্গেটে পরিণত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি। শুধু বিএনপিরই তিন হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সামরিক আদালতে প্রহসনমূলক বিচার করা হয়। তখন আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ ছিল না।
সামরিক শাসন জারির পর এরশাদ শহীদ জিয়াউর রহমান ও তার দল বিএনপির গৃহীত সব বৈপ্লবিক কর্মসূচি স্থগিত করেন। অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত তৎপরতার ফলে জনজীবনে নেমে আসে অসহনীয় দুর্ভোগ। সামরিক কুশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকল। একপর্যায়ে এই ক্ষোভ বিক্ষোভে পরিণত হয়। মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ছাত্ররাই বুকের পবিত্র রক্ত দিয়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে। এই আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জয়নাল, জাফর, দিপালী সাহাসহ অনেকে গুলিতে নিহত হন।
আরও পড়ুন : শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন যারা
দেশের এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে যখন দেশব্যাপী সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র ও শক্তিশালী করা জরুরি ছিল, তখন দুঃখজনকভাবেই বিএনপির নেতৃত্বের অবস্থা ছিল নাজুক। দলের চেয়ারম্যান সদ্য ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ। অনেক নেতা-কর্মী কারাগারে বন্দি। অনেকে মাথায় হুলিয়া নিয়ে পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন। আবার কিছু নেতা স্বৈরশাসকের চাটুকারের ভূমিকায় লিপ্ত হয়ে গেছে। বেশ কিছু নেতাকর্মী সামরিক শাসকের ভয়ে চলে গেছেন নির্বাসনে। যে কয়জন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তারাও সংগঠিত হতে পারছিলেন না। এ অবস্থা চলতে থাকে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত।
এই দুঃসহনীয় অবস্থায় কি চুপ করে বসে থাকা যায়? বেগম খালেদা জিয়া বললেন, না, হয় না। এর উচিত জবাব দিতে হবে। তখনই খালেদা জিয়া জড়িয়ে পড়লেন সক্রিয় রাজনীতিতে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সামরিক শাসনের নাগপাশ থেকে দেশের জনগণকে রক্ষা ও জাতীয় কর্তব্য সম্পাদনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অবৈধ এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত জনতার সংগ্রামী মিছিলে শরিক হন তিনি। জাতি ও দলের ইতিহাসে তখন সূচনা হয় এক নতুন দিগন্তের। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে তিনি নেতাকর্মীদের সোৎসাহ সমর্থনে নির্বাচিত হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান। রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। বিএনপির নেতাকর্মীরা আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেলেন। ফুলডালায় তারা খালেদা জিয়াকে বরণ করলেন।
খালেদা জিয়ার সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার খবরে এরশাদ ভীত হয়ে পড়েন। কুচক্রী এই জেনারেল আবার শুরু করেন যড়যন্ত্র। গোপনে বিএনপির কিছু নেতাদের সঙ্গে শুরু করেন আঁতাত। এরই মধ্যে এরশাদ সামরিক শাসন জারির এক বছর সাতদিন পর ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল ঘরোয়া রাজনীতি করার অনুমতি দিলেন। এ অবস্থায় দলের কর্মসূচি প্রণয়ন ও গোটা পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুস সাত্তার ১ এপ্রিলই দলের বর্ধিত সভা আহ্বান করলেন। ইতোমধ্যেই খালেদা জিয়ার সিনিয়র সহ-সভাপতি মনোনয়নের খবরের বিরোধিতা করলেন দলের ‘হুদা-মতিন’ চক্র। তারা গোপনে জেনারেল এরশাদের সঙ্গে আঁতাত করছিলেন। তাদের মাধ্যমে এরশাদ চেষ্টা করছিলেন খালেদা জিয়া যেন রাজনীতিতে না আসেন। কিন্তু তার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। ষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হয়ে ‘হুদা-মতিন' গ্রুপ ৮৩’র ২ এপ্রিল ঢাকার গাবতলির বিউটি সিনেমা হলে দলের কনভেনশন আহ্বান করে।
অন্য দিকে ১ এপ্রিল নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেট কার্যালয়ে বিএনপির বর্ধিত সভা শুরু হলো। বর্ধিত সভার উদ্বোধন করে দলের চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুস সাত্তার বলেন, কিছুসংখ্যক লোক দলের তলবি সভা আহ্বান করেছে। আমি তাদের বলেছি, কোনো অভিযাগ থাকলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সমাধান করা যাবে। তবুও তারা তলবি সভা করছে। এতে এটাই প্রমাণিত হচ্ছে, দলকে নিয়ে তারা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে।
এর পরই বর্ধিত সভায় ভাষণ দেন দলের সদ্য মনোনীত সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া। দলীয় নেতা ও কর্মীদের উদ্দেশে এটাই রাজনীতিতে এসে প্রথম তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ। এ জন্য তিনি ১৯ দফা সনদ দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন উৎপাদনের রাজনীতি। আমি সেই জননেতার পত্নী খালেদা জিয়া। শহীদ জিয়ার আদর্শ ও পথনির্দেশনার সফল বাস্তবায়নই আমার জীবনের উদ্দেশ্য। আমি এ দেশের সব দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ইনশা আল্লাহ, জয় আমাদের হবেই।’
দলের ভাঙনের কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, 'আমাদের কিছু সাথী আলাদা বৈঠকে বসে দলের মধ্যে যে ভাঙন বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন তা দুঃখজনক। এ পার্থক্য কোনো আদর্শগত নয়। আসুন আমরা সব বিভেদ-বৈষম্য ভুলে গিয়ে শহীদ জিয়ার মহান আদর্শ বাস্তবায়ন করি।’
বর্ধিত সভায় সেদিন আবদুল মোমেন খান, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মীর্জা গোলাম হাফিজ, আ. হামিদ, আ. আলিম, মুস্তাফিজুর রহমান, ব্যারিস্টার আ. হক, জমির উদ্দিন সরকার, বেগম তসলিমা আবেদ, কাজী গোলাম মাহবুব, হারুনুর রশীদ, এল কে সিদ্দিকী, রফিকুল ইসলাম মিয়া, ফেরদৌস আহমদ কোরেশী, ক্যাপ্টেন আ. হালিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বর্ধিত সভায় ২৫১ সাবেক এমপির মধ্যে ১৮২ জন এবং জাতীয় কমিটির ১৮০ জনের মধ্যে ১৪৮ জন উপস্থিত ছিলেন।
বর্ধিত সভার পর বিচারপতি সাত্তার সক্রিয় রাজনীতি থেকে অসুস্থতাজনিত কারণে নীরব রইলেন। সাত্তার বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে মূলত খালেদা জিয়াই নেতৃত্ব দিতে থাকলেন। এরই মধ্যে সমমনা দল নিয়ে গঠিত হলো সাত দলীয় ঐক্যজোট। অপরদিকে আগেই গঠিত হয়েছে আওয়ামী লীগসহ তাদের সমমনা ১৫ দলীয় ঐক্যজোট।
খালেদা জিয়া দেশব্যাপী জনসংযোগে বের হলেন। ঘরোয়া রাজনীতির সুযোগে বেগম জিয়া ঢাকার বাইরে প্রথম সভা করেন খুলনায়। স্থানীয় ইউনাইটেড ক্লাবের দেওয়ালের ভেতর এই সভাটি হয়। ঘরোয়া সভা হলেও এটি ধীরে ধীরে পাশের রাস্তা ছাড়িয়ে এক সমাবেশে পরিণত হয়। বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে যে অনন্য সাধারণ বিকাশ ঘটে খুলনার এই ঘরোয়া রাজনৈতিক সভা ছিল তাঁর আরেকটি ‘মাইলস্টোন'।
১৯৮৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর সাতদলীয় ঐক্যজোট ও ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের মধ্যে বৈঠক বসে। বৈঠকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৫ দফা প্রণীত হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ৫ দফা ঘােষিত হয়। এবার শুধু বিএনপির নেত্রীই নয়, সাত দলের নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হলেন খালেদা জিয়া। প্রথমেই তিনি বললেন, ‘অবৈধ এরশাদকে মানি না। তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। সামরিক শাসনের অবসান ঘটাতে হবে।’
সামরিক শাসনবিরোধী গণতন্ত্রিক আন্দোলনে স্পষ্ট ভূমিকা ও সাহসী বক্তব্যের জন্য খালেদা জিয়া অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অধিষ্ঠিত হলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের প্রধান নেত্রীর আসনে। এরই মধ্যে দুই জোটের আহ্বানে পাঁচ দফা দাবিতে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ১৯৮৩ সালের পয়লা নভেম্বর প্রথম অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয় । হরতালে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বেগম খালেদা জিয়া। সফল হরতালের পর ২৮ নভেম্বর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়। গুলি, টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে খালেদা জিয়া ঘেরাও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসে তিনি আহত।
সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেই এরশাদবিরোধী আন্দোলেন সাহসী নেতৃত্ব দিলেন খালেদা জিয়া। প্রথমে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কয়েক মাস পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। একই সময়ে সাত দলীয় জোটের নেত্রী হিসেবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৯৮৪ সালে আগস্ট মাসে বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া আর কোনো মনোনয়নপত্র জমা পড়েনি। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বজনগ্রাহ্য নেত্রী হিসেবে ১৯৮৪ সালের ১০ মে বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
খালেদা জিয়া যখন বিএনপির হাল ধরেন, তখন একদিনে যেন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, তেমনি বিএনপির ভেতর শুরু হয় বড় ধরনের ভাঙন। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে একের পর এক নেতাকে বিএনপি থেকে ভাগিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালান। বাড়ি, গাড়ি, কোটি টাকার সম্পত্তির টোপ দিয়ে ওই সব সুবিধাবাদী নেতাদের দলত্যাগের গুটি চালেন। বেগম জিয়া এরশাদের ওই সব কুকীর্তি ভালোভাবেই উপলব্ধি করছিলেন। তাই খুব শক্ত হাতে তিনি বিএনপির হাল ধরেন।
বিএনপির প্রথম ভাঙনের নেতৃত্ব দেন শামসুল হুদা চৌধুরী ও অধ্যাপক এম এ মতিন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তারা উপদলীয় কোন্দলে নিয়োজিত ছিলেন এবং স্বৈরাচার সরকারের সঙ্গে আঁতাতে জড়িয়ে পড়েন। খালেদা জিয়াকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন তাদের ক্ষুব্ধ করেছিল। রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ, উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মী কারাগারে, দেশব্যাপী নির্যাতন– এমন অবস্থার মধ্যেও বিএনপি সংগঠিত হতে পেরেছিল।
১৯৮৩ সালের ২৭ নভেম্বর কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত এরশাদের ‘জনদল’-এ যোগদানের মাধ্যমে হুদা-মতিন গ্রুপ বিলুপ্ত হয়। তারা পরবর্তীকালে এরশাদের অবৈধ সরকারে যোগ দেন। এই অবস্থায় দলের হাল ধরে এগিয়ে যাওয়া খুব কঠিন ছিল। তখন দলে আবার ভাঙনের সৃষ্টি করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান। ১৯৮৫ সালের ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাহ আজিজ গ্রুপ দলের ভাঙন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দল যখন ১৫ দলের সঙ্গে যৌথভাবে বিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই শাহ আজিজ গোপনে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তথাকথিত জাতীয় ফ্রন্ট গঠনের কাজ শুরু হয়। অব্যাহত আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদ নির্বাচন স্থগিত করেন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। খালেদা জিয়া অন্তরীণ হন ১৯৮৫ সালের ১ মার্চ। এর ফলে শাহ আজিজ আবার সুযোগে পেয়ে যান। একই সঙ্গে সাত দলীয় জোটেও ভাঙন ধরান এরশাদ। কাজী জাফর, সিরাজুল হোসেন খান, আনোয়ার জাহিদের সঙ্গে ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নেন শাহ আজিজ। তার নেতৃত্বে গোপনে কাজী জাফরের ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, মুসলিম লীগ (সিদ্দিকী), ক্ষমতাসীন জনদলের সমন্বয়ে ১৯৮৫ সালের ১৩ জুন ফ্রন্ট গঠিত হয়। কিন্তু এর খবর গোপন রাখা হয়। এরই মধ্যে ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে খালেদা জিয়া দলের স্ট্যান্ডিং কমিটি নতুন করে গঠন করেন। দলের নাম ভাঙিয়ে যাতে কেউ সরকারের সঙ্গে দর কষাকষি করতে না পারে সেজন্যেই সাহসী উদ্যোগটি নেন বেগম জিয়া। তিনি পার্টির নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার অভিযোগে শাহ আজিজ, ব্যারিস্টার মওদুদ, এ.কে.এম. মাঈদুল ইসলাম, আবদুল আলীম এবং ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরীকে ২৫ জুন দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেন। তাদের শোকজ করা হয়, কিন্তু তারা এর জবাব দেননি। তারা শাহ আজিজকে চেয়ারম্যান ও মাঈদুল ইসলামকে মহাসচিব করে তারা পাল্টা বিএনপি গঠন করেন। এরই মধ্যে মন্ত্রিত্বের দর কষাকষি চলে। জাফর ইমাম, মওদুদ, সুলতান আহমদ চৌধুরী, মাঈদুল ইসলাম একে একে এরশাদের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রিত্ব না পেয়ে শাহ আজিজ জাতীয় ফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যান।
এরপর শাহ আজিজ বিভিন্ন সময়ে বিএনপিতে যোগ দিতে চাইলেও খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে কোনো উৎসাহ দেখানো হয়নি। অবশেষে ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই শাহ আজিজ তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি বিলুপ্ত করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি শর্তহীন সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করেন। ২৬ আগস্ট ৮৮ তাকে সদস্যপদ দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।
বিএনপিতে তৃতীয় ভাঙন হয় মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান জামালউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আবুল হাসনাতের নেতৃত্বে। খালেদা জিয়া যখনই জানতে পারেন, তারা দল ভাঙার ষড়যন্ত্র করছেন এবং এরশাদের সঙ্গে আঁতাতে লিপ্ত, তখনি তিনি ১৯৮৮ সালের ২১ জুন দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দলের নির্বাহী ও স্থায়ী কমিটি বাতিল করেন। তিনি দলের মহাসচিব করেন ব্যারিস্টার সালাম তালুকদারকে।
একদিকে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নিরলস ও আপসহীন সংগ্রাম, অন্যদিকে দলের ভেতরে একের পর এক চাক্রান্ত। এসব মোকাবিলা করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রমাণ দিচ্ছিলেন খালেদা জিয়া। পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির প্রকৃত বিকাশ ঘটেছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই। তিনি কেবল দলকেই রক্ষা করেননি, বরং আন্দোলনের প্রতিকূল পথ বেয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি প্রধান শক্তি হিসেবে।
চুরাশি, পঁচাশি, ছিয়াশি সালে যখন অন্যান্য দল এরশাদের কূটচালে আটকা পড়েছে, তখন বিএনপির প্রবীণ নেতারাদের অনেকে ছিলেন বিভ্রান্ত। তখনই খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্ব পায় বিএনপি। খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা চাইলে এখানে, ঠিক এখানে এসে হাজির হবে। কিন্তু ক্ষমতা নয়, সংগ্রাম।’
সততা, নিষ্ঠা, লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে সংগ্রামে অনমনীয় মনোভাব, দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞায় এবং সর্বোপরি শহীদ জিয়ার স্ত্রী হিসেবে সহজেই খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয় আন্দোলিত করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া সত্যিই একটা বিস্ময়। ১৯৮৪ সালের ২ মার্চ সংখ্যায় বিচিত্রার পক্ষ থেকে তাকে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি (খালেদা জিয়া) কাকে বা কোন দলকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, কোনো ব্যক্তি বা দল আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আমি যে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করি তার আশু ও সফল বাস্তবায়নই আমার লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে যে ব্যক্তি বা যে দল বাধার সৃষ্টি করবে সে ব্যক্তি বা সেই দল আমাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে রাজনৈতিক।'
রাজনীতিতে এসে প্রথমে বেগম খালেদা জিয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখতেন। পরে তিনি দীর্ঘ বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। প্রথমদিকের বক্তব্যগুলোর ধার কম ছিল। কিন্তু আন্দোলন যতেই তীব্র হতে লাগলে, তাঁর বক্তব্য ততই জ্বালাময়ী হয়ে উঠল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সারা দেশে ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এরশাদের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

নিজস্ব প্রতিবেদক