একজন খালেদা জিয়া
একটি নাম, একটি অধ্যায়, একটি প্রতিরোধের প্রতীক। স্বৈরাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যিনি আপস করেননি, কারাবরণ করেও নত হননি। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানুষের অধিকার রক্ষায় যাঁর অবস্থান অবিচল। নারী নেতৃত্বের সাহসী দৃষ্টান্ত, রাজনীতির কঠিন ময়দানে দৃঢ় কণ্ঠ।
সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়—কিন্তু ইতিহাসে থেকে যায় একজন খালেদা জিয়া। ভোরের আলো ফোটার আগেই এমন এক মহানেত্রীর বিদায়। এক মাসেরও বেশি সময় এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা খালেদা জিয়া আজ বৃহস্পতিবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
আরও পড়ুন : কেউ বলল রাজকন্যা, কেউ লাল টুকটুকে মেয়ে!
খালেদা জিয়ার মৃত্যু খবর এনটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন।
স্বৈরাচার এরশাদের সামরিক শাসনে দেশের মানুষ যখন নাভিঃশ্বাস ফেলছে তখন রক্ষণশীল এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। টানা নয় বছর স্বৈরাশাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে দুই দফা কারাবরণের কারণে খ্যাতি পান দেশেনেত্রী, আপসহীন নেত্রী হিসেবে।
দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা হয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে। ১৯৮৩ সালের খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। তার আপসহীন চরিত্রকে ধারণ করে প্রায় পঞ্চাশ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক দলকে হারিয়ে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
আরও পড়ুন : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় খালেদা জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে সাত দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাঁধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙে আটদল ও পাঁচদল হয়। আট দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে সাতদল পাঁচদলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন।
পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। অবশেষে দীর্ঘ আট বছর একটানা নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়া মোট পাঁচটি আসনে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই জয়লাভ করেন।
কঠিন বাস্তবতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি দেশকে নেতৃত্ব দেননি নারী মুক্তির জন্য নিয়েছেন অসংখ্য পদক্ষেপ। নারীদের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার নেওয়া অনেক উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম হলো মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যাবস্থা চালু করা। মেয়েদের ন্যূনতম মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপবৃত্তি ব্যবস্থা চালু করেন তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার উদ্যোগেই প্রাথমিক শিক্ষায় নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের আগ্রহ তৈরিতে খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়।
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও এসিড সন্ত্রাস দমন আইন প্রনয়ণও হয় বেগম খালেদা জিয়ার সময়। একই সময়ে সমাজে নারীদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যৌতুকবিরোধী আইন প্রণয়ন করেন তিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠনের মাধ্যমে নারী শিক্ষায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার প্রচেষ্টারই অংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মহিলা শিক্ষকের নিয়োগে কোটা আরোপের মাধ্যমে মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। এছাড়া খালেদা জিয়ার প্রয়াসে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের ক্ষেত্রে স্পেশাল ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। দ্রুততম বিচার এবং তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়। অপরাধ ভেদে সাত বছর কিংবা ১৪ বছর অথবা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিল পাস হয় তার আমলেই।
আরও পড়ুন : আপসহীন নক্ষত্রের বিদায়
নারীদের অধিকার রক্ষা কর্মক্ষমতাকে পূর্ণ মর্যাদায় কাজে লাগানোর লক্ষ্যে ন্যাশনাল ফর উইমেন গঠন করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মেয়েদের শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য জিয়াউর রহমানের নেওয়া পদক্ষেপ পুলিশ বিভাগে মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি পুনরায় চালু করেছেন বিএনপি প্রধান। তৃণমূল পর্যায়ের বস্তি এলাকা, দুস্থ নারী এবং গ্রামীণ মেয়েদের ক্ষেত্রে নিজস্ব তহবিল গঠনের মাধ্যমে স্বল্পকালীন ঋণ পদ্ধতি চালু করে নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে খালেদা জিয়ার অবদান রয়েছে।
আরও পড়ুন : শেষ সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন যারা
বেগম খালেদা জিয়া নারী স্বাস্থ্যসেবা নারী উন্নয়ন, নারী শিক্ষা সর্বোপরি নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে খালেদা জিয়া এবং মিসেস লনের যৌথ প্রয়াসে কার্যযাত্রা শুরু করেছিল এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ফান্ড গঠনসহ চট্টগ্রামে ১০০ একর জায়গা দানের ব্যাবস্থা করেছিলেন। তারই উদ্যোগে নারী বিজ্ঞানীদের সংগঠন উইস্টারকে সহায়তার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও ব্যাবহারিক কর্মকাণ্ডে কম্পিউটারের ব্যবহার ও নারী সংস্থাকে পূর্ণ সহায়তায় পৃষ্ঠপোষকের মাধ্যমে অসংখ্য নারীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
৮০ বছর বয়সী বিএনপির চেয়ারপারসন ডায়াবেটিস আর্থারাইটিস, হৃদ্রোগ, ফুসফুস, লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন।

মাহমুদুল হাসান