ঈদ যায় ঈদ আসে, বাড়ি ফেরা হয় না রোহিঙ্গাদের
দশ বছর আগে ঠিক এই ঈদুল আজহার দিনটিতেই নিজের প্রিয় মাতৃভূমি মিয়ানমার ছেড়ে সপরিবারে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন রাখাইনের মংডু শহরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী (৬০)। রোহিঙ্গা এই বৃদ্ধ পরিবার নিয়ে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও, জীবনের শেষ সময়ে এসে এখন প্রতি মুহূর্তে প্রহর গুণছেন স্বদেশে ফেরার। আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) পবিত্র ঈদুল আজহার সকালে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে একযোগে মোহাম্মদ আলীর মতো লাখো আশ্রিত মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।
ক্যাম্পের খোলা মাঠে বা অস্থায়ী মসজিদে নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাতে ছিল নিজ দেশে মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসনের আশা নিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অশ্রুসিক্ত করুণ আকুতি এবং ২০১৭ সালের সহিংসতায় প্রাণ হারানো প্রিয় স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা। বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী চোখ মুছতে মুছতে বলেন, এক কাপড়ে এই কোরবানির ঈদের দিনই ঘর ছেড়েছিলাম, দেখতে দেখতে দশ বছর হয়ে গেল। জানি না আর কয়দিন বাঁচব। আমার শেষ ইচ্ছে—কবরটা যেন অন্তত আরাকানের মাটিতেই হয়, আল্লাহর কাছে আজ মোনাজাতে শুধু সেটাই চেয়েছি।
সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু রোহিঙ্গা পরিবার কোরবানি দিলেও, এখানকার অধিকাংশ মানুষই সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। মিয়ানমারে ফেলে আসা নিজেদের কোরবানির স্মৃতি চারণ করে রোহিঙ্গা শিক্ষক আব্দুল্লাহ বলেন, দেশে আমাদের নিজেদের জমি ছিল, কৃষিকাজ করে ভালো আয়-রোজগার হতো। আমরা অনেক বড় গরু কোরবানি দিতাম, উৎসব করতাম। আর এখানে আমাদের অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটছে, এবার কোরবানিও দিতে পারিনি।
গত এক দশকে অন্তত প্রায় দুই লাখ শিশু এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নিয়েছে। তাদের নতুন পোশাকে ঈদের কিছুটা খুশি থাকলেও, অবুঝ চোখেমুখে লেগে আছে ভবিষ্যৎ নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা।
রোহিঙ্গাদের নাগরিক সংগঠন 'ইউনাইটেড কাউন্সিল ফর রোহিঙ্গা' (ইউসিআর)-এর সংগঠক মোহাম্মদ ফোরকান বলেন, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ প্রয়োজন, আর মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই তার একমাত্র স্থায়ী সমাধান। বাংলাদেশ আমাদের মানবিক আশ্রয় দিয়ে বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, আমরা তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তবে এটা তো আমাদের নিজেদের দেশ নয়, আমরা এখানে সারাজীবন থাকতেও চাই না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অবিলম্বে অধিকার নিয়ে আমাদের দেশে ফেরা নিশ্চিত করা।
এদিকে রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দিন দিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েই চলেছে। স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোছাইন বলেন, মানবিক বিবেচনায় আমরা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু নানা বাস্তবতার কারণে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখন আমাদের বহুমুখী ক্ষতির সম্মুখীন করছে। কার্যত দ্রুত প্রত্যাবাসন ছাড়া এর আর কোনো বিকল্প সমাধান নেই। তবে মিয়ানমারের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল প্রেক্ষাপটে সেটিও অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদে প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে বিভিন্ন এনজিও ও দাতা সংস্থার মাধ্যমে কোরবানির মাংস বিতরণ করা হচ্ছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক সহায়তা আগের চেয়ে অনেক কমতে থাকলেও আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোরবানি ঈদে এই মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রতি পরিবার অন্তত ১ কেজি করে মাংস পাবে এবং স্ব-স্ব ক্যাম্পে ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) কার্যালয় এই কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করছে। প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার সবসময় জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে, যেন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও মানবিক সহযোগিতা পাওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ৪৪ হাজার ৩৫৪ জন। তবে স্থানীয় অন্যান্য পরিসংখ্যান বলছে, ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান করছে।

নোমান অরুপ, কক্সবাজার (টেকনাফ)