শ্রদ্ধা
শহীদুল ইসলাম খোকনের মৃত্যু ও একটি প্রশ্ন
হলিউডের অভিনেতা পল ওয়াকারের মৃত্যুতে বাংলার ফেসবুকে মাতম ছিল চোখে পড়ার মতো। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর অস্কারপ্রাপ্তি উদযাপন বাংলার ফেসবুকে কেবল সামাজিক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকেনি—খাওয়া-দাওয়া, মিষ্টি বিতরণ বা উৎসবও করেছেন অনেকে। জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পরও ভিনদেশিরা আমাদের কাছ থেকে যে সম্মান-আদর পান, তার ছিটেফোঁটাও মেলে না আমাদের নিজেদের চলচ্চিত্র জগতের সত্যিকারের সংগ্রামী শিল্পীদের। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সৃজনশীল, সাহসী পরিচালকদের একজন শহীদুল ইসলাম খোকন, চলে গেছেন মাত্র ৫৯ বছর বয়সে। তাতে কিন্তু আমাদের মধ্যে তেমন কোনো দৃকপাতই নেই, কী নির্মম বোধহীন আমরা!
অথচ শহীদুল ইসলাম খোকনের একেকটা ছবির জন্য তুমুল ঢল নামত এই বাংলার সিনেমা হলগুলোতে। আমাদের অনেকেই জানেন না, আর অনেকেই মনে রাখেননি যে তাঁর 'ভণ্ড' সিনেমাটি সারা বাংলার সিনেমা হলগুলোতে টানা ২৯ দিন হাউজফুল ছিল।
সিরিয়াল কিলার নিয়ে চলচ্চিত্রের আইডিয়া তিনিই বাংলা সিনেমায় প্রথম নিয়ে আসেন। তাঁর অসাধারণ সব এক্সপেরিমেন্টের জন্য তিনি এমন একজনকে ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় নিয়ে আসেন, যার সঙ্গে তাঁর জুটি সম্ভবত বাংলা সিনেমার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক-অভিনেতা জুটির স্বীকৃতি পাবে। শহীদুল ইসলাম খোকন ও হুমায়ুন ফরীদি জুটি। এ ছাড়া রুবেল, শিমলা, তামান্না, আলেকজান্ডার বো, ড্যানি সিডাক, ইলিয়াস কোবরার মতো অনেক অভিনেতাই ঢাকাই সিনেমায় এসেছেন শহীদুল ইসলাম খোকনের হাত ধরে।
তিনি যখনই সিনেমার জন্য কোনো নতুন মুখ নিতেন, পত্রিকা বা টিভিতে উদ্ভাবনী বিজ্ঞাপন দিয়ে সিনেমা আসার আগেই নবাগতদের হিট করে ফেলতেন সাধারণ দর্শকের মনে।
অ্যাকশন হিরো রুবেলের সঙ্গেও তাঁর জুটিটি ছিল অসাধারণ! রুবেলকে সঙ্গে নিয়ে বাংলা সিনেমায় মার্শাল আর্টের প্রচলন ঘটান খোকন। শুধু তাঁর সিনেমার প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে অনেক মার্শাল আর্ট ক্লাব আত্মপ্রকাশ করে।
তিনি ছিলেন 'লড়াকু'। তাই জীবনের 'উত্থান পতন'-এ তিনি দমে যাননি, শিক্ষা নিয়েছেন। তাঁর প্রথম ছবি 'রক্তের বন্দী' ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও তিনি 'বীরপুরুষ'-এর মতো লড়াই করেছেন এবং ফিরে এসেছেন দারুণ প্রতাপে।
তিনি ছিলেন 'লাল-সবুজ' 'বাঙলা'র অকুতোভয় চলচ্চিত্র 'যোদ্ধা'। নির্ভীক 'বীরপুরুষ'। সিনেমার মাধ্যমে তিনি অনেক 'ভণ্ড', 'নরপিশাচ', 'মূর্খ মানব', 'রাক্ষস', 'অকর্মা'র মুখোশ উন্মোচিত করেছেন। সেলুলয়েডের 'বজ্রমুষ্ঠি' দিয়ে 'সতর্ক শয়তান', মৌলবাদ নামক 'পদ্মগোখরা'র 'বিষদাঁত' ভেঙে দিতে চেয়েছেন।
তিনি লড়েছেন অশ্লীলতার বিরুদ্ধে। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে তাঁর 'যোদ্ধা' সিনেমার জন্য পুরো পোস্টারে কোনো ছবি দেননি, পুরোটাই ফাঁকা ছিল। বাংলাদেশে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। তিনি সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম পরিচালক, যার সিনেমার জন্য সিনেমা হলে বোমা হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল (‘ঘাতক’ সিনেমার জন্য)।
শহীদুল ইসলাম খোকন মানেই ছিল চমক আর নতুনত্ব। শহীদুল ইসলাম খোকনের সিনেমা না দেখে দর্শক ‘পালাবে কোথায়’? 'ম্যাডাম ফুলি' থেকে 'টপ রংবাজ', 'ভণ্ড' থেকে 'বিশ্বপ্রেমিক’—তাঁর সব ছবিতেই বৈচিত্র্য পেয়েছেন দর্শক।
বেশ কিছুদিন রোগে ভুগে অনেকটা নিভৃতেই বিদায় নিলেন বাংলা সিনেমা কাঁপানো এই পরিচালক। ভিনদেশি একেক তারকার জন্য আমাদের যে উচ্ছ্বাস, তার সামান্যতম কি আমরা নিজেদের এই মানুষটির জন্য দেখাতে পারতাম না? এ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিনোদন বিভাগের খবরে কতটা স্থান দেওয়া হয়েছে শহীদুল ইসলাম খোকনকে? যতটুকু দেওয়া হয়েছে, তার পরিমাণটুকু কি প্রশ্নবিদ্ধ করে না আপনাকে?
শহীদুল ইসলাম খোকন, বিনীত শ্রদ্ধা আপনার জন্য। মৃত্যুর পরও আমাদের ক্রমবর্ধমান অসারতার প্রতি বড় এক আঘাত আর প্রশ্ন রেখে গেলেন আপনি।

কাজল আব্দুল্লাহ