পক্সের দাগ যাচ্ছে না? জানুন সহজ ও কার্যকর উপায়
বৈশাখের মাঝামাঝি। এবছর তাপমাত্রার পারদ বেশ চড়া। এ সময়ে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। ঘরে ঘরে সর্দি, কাশি, জ্বর ইত্যাধি লেগেই আছে। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের হামের পাশাপাশি সব বয়সীদের জলবসন্ত বা পক্সে আক্রান্তের খবর শোনা যাচ্ছে। চিকেন পক্স বা জলবসন্ত হলে অনেক বেশি স্বাস্থ্য সচেতন হতে হয়। চিকেন পক্স হলে শরীরে যে গুটি গুটি দেখা যায়, তরল পদার্থ ভরা ওই ভ্যাসিকুলার র্যাশগুলো প্রচণ্ড চুলকায় এবং অনেক সময় জ্বরও আসে। বায়ুবাহিত অসুখটি থেকে সেরে উঠলে শরীরের ত্বকে দাগ দেখা যায়। অনেকে দুঃশ্চিন্তায় থাকেন।
পক্স হলে ও তার পরবর্তী সময়ে কী করা উচিৎ, কী করা উচিৎ নয়, কীভাবে ত্বকের যত্ন নেওয়া উচিৎ—তা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন রিজুভা ওয়েলনেসে বিউটি পেজেন্ট অ্যান্ড ওয়েলনেস কনসালট্যান্ট, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ, বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জন ডা. তাওহীদা রহমান ইরীন।
চুলকানি কমানোর জন্য নিরাপদ উপায়
পক্স হলে চুলকানি খুব স্বাভাবিক একটি সমস্যা, তবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি যাতে দাগ বা ইনফেকশন না হয়।
চুলকানি কমানোর জন্য নিরাপদ উপায়গুলোর মধ্যে ক্যালামাইন লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে—এটি ত্বককে ঠান্ডা অনুভূতি দেয় এবং চুলকানি অনেকটাই উপশম করে। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিহিস্টামিন ওষুধ দেওয়া হয়, যা ভেতর থেকে চুলকানি কমাতে সাহায্য করে।
এ সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ত্বক না খোঁচানো বা পিক না করা। খোঁচালে স্কার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। চুলকানি বাড়ায় এমন ফ্যাক্টর যেমন অতিরিক্ত গরম, ঘাম বা টাইট কাপড় এড়িয়ে চলা উচিত। ঢিলেঢালা, নরম কাপড় পরা এবং ত্বক ঠান্ডা রাখা চুলকানি কমাতে সহায়ক।
এ ছাড়া কিছু খাবার চুলকানি বাড়াতে পারে, তাই খুব বেশি মশলাযুক্ত, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত অ্যালার্জি-প্রবণ খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং হালকা, সহজপাচ্য খাবার খাওয়া ত্বকের দ্রুত সুস্থতায় সহায়তা করে।
পক্স সেরে গেলে দাগ বা স্কার কমানোর কার্যকর ক্রিম ও চিকিৎসা
চিকেনপক্স সেরে যাওয়ার পর ত্বকে দাগ বা স্কার হওয়া খুবই সাধারণ। তবে সব স্কার এক রকম নয়—কিছু শুধু কালচে দাগ (পিগমেন্টেশন), আবার কিছু গর্তের মতো (অ্যাট্রোফিক স্কার)। তাই স্কারের ধরন বুঝে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্কার জেল (Scar gel) এই ক্ষেত্রে একটি সহায়ক অপশন। এতে সাধারণত অ্যালানটয়েন (Allantoin) ও অনিয়ন এক্সট্র্যাক্ট (onion extract) থাকে, যা ত্বকের টেক্সচার ও রঙ কিছুটা উন্নত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত ব্যবহার করলে নতুন এবং পুরনো দুই ধরনের স্কারেই কিছুটা উপকার পাওয়া যায়, যদিও গভীর স্কারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। হালকা দাগ সাধারণত সঠিক ক্রিম ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে ভালোভাবে কমে যায়, কিন্তু গর্ত বা গভীর স্কার সম্পূর্ণভাবে কমাতে শুধুমাত্র ক্রিম যথেষ্ট নয় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন ডার্মাটোলজিক্যাল প্রোসিডিউর প্রয়োজন হয়। তাই যত দ্রুত সম্ভব সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে ফলাফল সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায় এবং স্কিন দ্রুত আগের অবস্থার দিকে ফিরে আসে।
সূর্যের আলো থেকে ত্বকের সুরক্ষা
Sunblock ব্যবহার করা পক্সের পর ত্বকের যত্নে অত্যন্ত জরুরি। কারণ সূর্যের UV রশ্মি দাগকে আরও গাঢ় করে ফেলতে পারে এবং স্কিনের রিকভারি প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। তাই প্রতিদিন অন্তত SPF 50 সানস্ক্রিন ব্যবহার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে না গেলেও এটি ব্যবহার করা উচিত, কারণ নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে দাগ দ্রুত হালকা হয় এবং নতুন দাগ পড়ার ঝুঁকিও কমে।
লেজার বা অন্য ডার্মাটোলজিকাল ট্রিটমেন্ট
যদি স্কার গভীর হয়, বিশেষ করে গর্ত বা পিটেড টাইপের হয়, তাহলে শুধুমাত্র ক্রিম ব্যবহার করে তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। এ ধরনের স্কার ত্বকের গভীর স্তরে কোলাজেন লসের কারণে হয়, তাই শুধু উপরের লেয়ার ট্রিটমেন্টে সম্পূর্ণ উন্নতি আসে না।
এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো ডার্মাটোলজিক্যাল প্রোসিডিউর যেমন: মাইক্রোনিডলিং, কেমিক্যাল পিল এবং লেজার রিসারফেসিং। এসব ট্রিটমেন্ট ত্বকের ভেতরে কোলাজেন প্রোডাকশন বাড়িয়ে স্কিনকে ধীরে ধীরে মসৃণ করে এবং গর্তের গভীরতা কমাতে সাহায্য করে। সঠিকভাবে ও সময়মতো এই চিকিৎসাগুলো নিলে স্কারের দৃশ্যমানতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কতদিন পর থেকে স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করা যায়?
চিকেনপক্স পুরোপুরি সেরে যাওয়ার পর, অর্থাৎ সব ফোসকা শুকিয়ে খোসা পড়ে গেলে এবং নতুন ত্বক উঠে এলে সাধারণত ৭–১০ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার শুরু করা যায়।
শুরুতে খুব মাইল্ড ও জেন্টল ফেসওয়াশ এবং হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো, যাতে নতুন সংবেদনশীল ত্বকে কোনো জ্বালা বা রিঅ্যাকশন না হয়। হার্শ কেমিক্যাল, স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েটিং প্রোডাক্ট শুরুতে এড়িয়ে চলা উচিত। ত্বক পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২–৩ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, তাই এই সময়টা যত্নসহকারে সিম্পল ও স্যুথিং রুটিন ফলো করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক