ঢাকার স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে
ঢাকার স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। এতে শিশুদের ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের নানা জটিলতা তৈরী হচ্ছে বলে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) নতুন এক গবেষণায়। আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) আইসিডিডিআর,বির ওয়েবসাইটে এই গবেষণা প্রকাশ করা হয়।
আইসিডিডিআর,বির গবেষকরা ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ছয় থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা পরিচালনা করেন। এর মধ্যে তিনটি ছিল বাংলা মাধ্যম এবং তিনটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ’ (জে-এম-আই-আর) হিউম্যান ফ্যাক্টরসে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকরা শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন, ঘুমের মান, শারীরিক সমস্যা, ওজন, আচরণ এবং মানসিক সুস্থতা মূল্যায়ন করেন সরাসরি সাক্ষাৎকার, শারীরিক পরিমাপ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে। এর মধ্যে ছিল পিটসবার্গ স্লিপ কোয়ালিটি ইনডেক্স (পিএসকিউআই), স্ট্রেংথস অ্যান্ড ডিফিকাল্টিজ কোয়েশ্চেনেয়ার (এসডিকিউ) এবং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েল-বিইং অ্যাসেসমেন্ট (ডিএডব্লিউবিএ)।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজনেরও বেশি (৮৩%) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়, যা শিশুদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত সীমা অতিক্রম করে। গড়ে শিশুরা প্রতিদিন প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে সময় ব্যয় করছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার অভিযোগ করেছে। যারা প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সী শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার চেয়ে কম।
গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের প্রায় ১৪ শতাংশ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ছিল, এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে এই হার আরও বেশি দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি শিশুদের স্মৃতি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণার ফলাফলে আরও উঠে এসেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছে, যার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ, অতিচঞ্চলতা, আচরণগত সমস্যা এবং মানসিক অস্থিরতা।
গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার বিভিন্নভাবে শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। রাতে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সক্রিয় থাকে যা স্বাভাবিক ঘুমের চক্র ব্যাহত করে। দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শারীরিক কর্মকাণ্ড ও বাইরে খেলাধুলা কমে যায়, যা স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে চোখে চাপ, মাথাব্যথা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং সামনাসামনি সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ার কারণে মানসিক ও আবেগগত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের সমস্যা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যা, কম শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় খারাপ ফলাফলের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বির সহকারী বিজ্ঞানী ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, ‘অভিভাবকদের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, মাথাব্যথা বা চোখে অস্বস্তি, অস্বাভাবিক রাগ বা একাকীত্ব, বাইরে খেলাধুলায় অনাগ্রহ বা মনোযোগের ঘাটতির মতো লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। এগুলো স্ক্রিন ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত হতে পারে।’
গবেষকরা পরিবারগুলোকে ‘২০-২০-২০’ চোখের যত্নের নিয়ম অনুসরণের পরামর্শও দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকাতে হবে, যাতে চোখের চাপ কমে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমীদ আহমেদ বলেন, ‘ডিজিটাল ডিভাইস এখন আধুনিক জীবন ও শিক্ষার অংশ। তবে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্কুলগামী শিশুদের দৈনিক বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের বাইরে খেলাধুলা, শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিভাইসমুক্ত পারিবারিক সময় নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিতর্ক, দলগত পাঠ, লাইব্রেরি ব্যবহার ও গাছের যত্ন নেওয়ার মতো সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।’
গবেষকরা বলেন, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সমাধান নয় বরং পরিবার ও স্কুলে প্রযুক্তির স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন জরুরি। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ‘নীরব মহামারি’ মোকাবিলায় এখনই জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদক্ষেপ ও কার্যকর হস্তক্ষেপ শুরু করার উপযুক্ত সময়।

নিজস্ব প্রতিবেদক