শরীরে ভিটামিন ‘বি কমপ্লেক্স’-এর ঘাটতি নয় তো? যে ৮ লক্ষণে বুঝবেন
শরীরকে সচল, কর্মক্ষম এবং রোগমুক্ত রাখতে যে পুষ্টি উপাদানগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ‘ভিটামিন বি কমপ্লেক্স’। এটি কোনো একক ভিটামিন নয়; বরং আটটি ভিন্ন ভিন্ন দ্রবণীয় ভিটামিনের (বি১, বি২, বি৩, বি৫, বি৬, বি৭, বি৯ ও বি১২) একটি শক্তিশালী সমাহার। শরীরে এসব ভিটামিনের ঘাটতি হলে ক্লান্তি, ত্বকের সমস্যা থেকে শুরু করে স্নায়বিক নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।
আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে সচল রাখা, রক্তে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করা, খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু এটি একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন, তাই শরীর এটি অতিরিক্ত পরিমাণে জমা রাখতে পারে না। ফলে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এর অভাব ঘটলে শরীরে নানাবিধ জটিল লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। শরীরে ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের ঘাটতি হলে কোন লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে এবং খাবারের মাধ্যমে কীভাবে এর চাহিদা পূরণ করা যায়, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
যে ৮ লক্ষণে বুঝবেন ‘বি কমপ্লেক্সের’ ঘাটতি হয়েছে
মুখে ও ঠোঁটের কোণে ঘা
জিভে বা মুখের ভেতরে ছোট ছোট যন্ত্রণাদায়ক মাউথ আলসার, ঠোঁট ফেটে যাওয়া কিংবা ঠোঁটের কোণে ঘা বা অ্যাঙ্গুলার চিলাইটিস ভিটামিন বি২ (রিবোফ্লেভিন), বি৩ এবং বি১২-এর তীব্র ঘাটতির স্পষ্ট লক্ষণ।
হাত-পা ঝিনঝিন বা অবশ লাগা
যদি হাঁটাচলার সময় বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে হাত ও পায়ের পাতায় পিন ফোটার মতো অনুভূতি হয়, ঝিনঝিন করে বা অবশ লাগে, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীরে ভিটামিন বি১২-এর অভাব ঘটেছে। এই ভিটামিনগুলো স্নায়ুর সুরক্ষাবরণ বা ‘মায়েলিন শীথ’ বজায় রাখে।
অতিরিক্ত শারীরিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি সারাক্ষণ দুর্বল বা ক্লান্ত লাগে, তার একটি কারণ হতে পারে ভিটামিন বি৯ বা বি১২-এর ঘাটতি। এসব ভিটামিনের অভাবে রক্তাল্পতাও দেখা দিতে পারে।
চরম মানসিক চাপ, হতাশা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস
ভিটামিন বি১, বি৬ এবং বি১২ মস্তিষ্কের স্নায়ুর কার্যকারিতা ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা ‘সেরোটোনিন’ ও ‘ডোপামিন’ হরমোন ক্ষরণে সাহায্য করে। এর অভাবে অহেতুক উদ্বেগ, ডিপ্রেশন, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং মনযোগের অভাব দেখা দেয়।
ত্বক রুক্ষ হওয়া ও অনিয়ন্ত্রিত চুল পড়া
ভিটামিন বি৭ (বায়োটিন) এবং বি৩-এর অভাবে ত্বক অতিরিক্ত রুক্ষ ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে, চুল পাতলা হতে শুরু করে এবং দ্রুত চুল ঝরতে থাকে।
হজমের সমস্যা ও ক্ষুধামন্দা
ভিটামিন বি১ (থায়ামিন) ও বি৩-এর ঘাটতি হলে পরিপাকতন্ত্রে পাচক রস উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটে। ক্ষুধা কমে যাওয়া, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা পেটের অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ত্বকে লালচে র্যাশ বা চর্মরোগ
ভিটামিন বি৩ (নিয়াসিন)-এর চরম ঘাটতি হলে ত্বকে সূর্যালোকের স্পর্শে লালচে দাগ, ঘা বা পেলাগ্রা নামক চর্মরোগ দেখা দিতে পারে।
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও শ্বাসকষ্ট
স্নায়ু ও পেশীর সমন্বয় বিঘ্নিত হওয়ার কারণে সামান্য পরিশ্রমে বা বিশ্রামরত অবস্থায়ও হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে এবং হাঁপিয়ে ওঠার মতো সমস্যা হয়।
কীভাবে দূর করবেন ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্সের ঘাটতি?
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ খাবারের সঠিক ভারসাম্য রাখলে খুব সহজেই এই ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব—
প্রতিদিন অন্তত একটি ডিম এবং এক গ্লাস গরুর দুধ বা খাঁটি ছানা-দই খেলে ভিটামিন বি১২ ও বি২-এর জোগান মেলে। সামুদ্রিক মাছ, রুই-কাতলা, মুরগির মাংস এবং বিশেষ করে খাসি বা মুরগির কলিজায় উচ্চ মাত্রায় বি কমপ্লেক্স থাকে। পালং শাক, ব্রকলি, নটে শাক এবং বাঁধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ফোলিক অ্যাসিড (বি৯) বিদ্যমান। খোসাসমেত দানা শস্য, লাল চালের ভাত এবং ওটসে ভিটামিন বি১, বি৩ ও বি৬ পাওয়া যায়। কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, কাজুবাদাম ও সূর্যমুখী বীজে প্রচুর বায়োটিন ও নিয়াসিন থাকে। মুগ, মুসুর ও ছোলার ডালে প্রচুর পরিমাণে বি-ভিটামিন রয়েছে।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
যারা সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার খান, তাদের ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে শুধু উপসর্গ দেখে ভিটামিনের ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার ও প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে তা পূরণ করা যেতে পারে। নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করাই ভালো।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

ফিচার ডেস্ক