শুধু ডাক্তার-হাসপাতাল নয়, পরিবার-সমাজও প্রভাবিত করে সিজারের সিদ্ধান্ত : গবেষণা
বাংলাদেশে সিজারিয়ান সেকশনের হার বেড়ে যাওয়ার পেছনে শুধু চিকিৎসাগত কারণ নয়, পরিবার, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে নতুন একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হাওয়ার্ড জার্নাল অব কমিউনিকেশনসে প্রকাশিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাদের প্রায় ৯১ শতাংশ প্রাথমিকভাবে এ পদ্ধতিতে আগ্রহী ছিলেন না।
‘কালচারাল নর্মস অ্যান্ড ম্যাটারনাল হেলথ বিহেভিয়ার : সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সেস অন সিজারিয়ান সেকশন ইনটেনশনস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫০৩ জন বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণে গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশি গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. জামাল উদ্দিন। বর্তমানে তিনি সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান মিডিয়া অ্যান্ড কালচারের ফ্যাকাল্টি রিসার্চ ফেলো। তার গবেষণাটি এ সপ্তাহে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
চিকিৎসার প্রয়োজনে সিজার মা ও শিশু উভয়ের জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে, বিশেষত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে, এই হার দ্রুত বেড়েছে। আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কিছু বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের হার প্রায় ৮৪ শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ১০ থেকে ১৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমান গবেষণার অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেও এই ব্যবধান স্পষ্ট—বেসরকারি হাসপাতালে প্রসব করা নারীদের ৮৫ শতাংশ সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, যেখানে সরকারি হাসপাতালে এই হার ৪৬ শতাংশ। এই প্রবণতা মাতৃস্বাস্থ্য, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, অনেক নারী সিজার করলেও শুরুতে তারা এটি চাননি। যারা সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন, তাদের ৯১ শতাংশ শুরুতে সি সেকশনে করাতে আগ্রহী ছিলেন না। পরিবার, সমাজ ও সামাজিক অবস্থান সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণায় অংশ নেন ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫০৩ জন বাংলাদেশি নারী, যারা গবেষণা চলাকালীন সময় দুই বছরের মধ্যে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। গবেষক জানতে চেয়েছিলেন, নারীরা সিজার নিয়ে কী ধারণা পোষণ করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের স্বাধীনতা কতটুকু, চিকিৎসকের পরামর্শ কীভাবে কাজ করে এবং পরিবার-সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এই সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় উঠে আসা কিছু প্রচলিত ধারণার মধ্যে রয়েছে, ‘আজকাল সবাই সিজার করছে’, ‘নরমাল ডেলিভারির ব্যথা সহ্য করার দরকার নেই’, ‘আমাদের পরিবারে আগেও সিজার হয়েছে, কোনো সমস্যা হয়নি’ এবং সিজারকে আধুনিক, নিরাপদ বা সচ্ছল পরিবারের প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা। এসব বিশ্বাস নারীদের সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, সিজারের সিদ্ধান্ত কেবল একটি চিকিৎসাগত বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রত্যাশা, ভয় ও মর্যাদাবোধ এবং নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা।
গবেষণাটি সিজারের প্রবণতার জন্য চিকিৎসক বা হাসপাতালের ভূমিকা অস্বীকার করছে না। এটি দেখাচ্ছে, চিকিৎসকের পরামর্শও একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে কাজ করে, যেখানে পারিবারিক চাপ, ভয়, হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, সামাজিক অবস্থান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি একযোগে প্রভাব ফেলে।
গবেষকের সুপারিশ, বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজার কমাতে শুধু গর্ভবতী নারীকে তথ্য দেওয়াই যথেষ্ট নয়। স্বামী, মা, শাশুড়ি এবং পরিবারের অন্য প্রভাবশালী সদস্যদেরও মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত আলোচনায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় নির্ভরযোগ্য মাতৃস্বাস্থ্য তথ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো, চিকিৎসক-রোগী যোগাযোগ উন্নত করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং হাসপাতালভিত্তিক সিজারের হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়।
গবেষকের মতে, অপ্রয়োজনীয় সিজার কমানো কেবল চিকিৎসাশাস্ত্রের বিষয় নয়, এটি একই সঙ্গে পরিবার, যোগাযোগ, সচেতনতা ও সংস্কৃতিরও বিষয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক