ভূমিকম্প ও আমাদের গবাদিপশু
ভূমিকম্পে হঠাৎ মাটি কেঁপে উঠলে আমরা দ্রুত নিরাপদ স্থানে ছুটে যাই, নিজের সুরক্ষা খুঁজি। কিন্তু গোয়ালে বাঁধা গরু বা ছাগল কিংবা অন্যান্য প্রাণীদের কী করার থাকে? যখন ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে চারপাশ দুলে ওঠে, তখন তাদের কেবল দিগ্বিদিক ছোটাছুটি আর অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এই গবাদিপশুকে ভূমিকম্পের আঘাত থেকে বাঁচাতে হলে নিরাপদ আশ্রয়স্থলই একমাত্র চাবিকাঠি। তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব সম্পূর্ণ মানুষের কাছে।
গত ২১শে নভেম্বর দেশব্যাপী ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা নরসিংদীতে। এতে সারাদেশে ১০ জনের প্রাণহানি ও চার শতাধিক মানুষ আহত হয়। একইসঙ্গে নরসিংদীসহ আশেপাশের জেলায় কয়েকটি খামার ও গোয়ালঘরের কিছু গবাদিপশু আহত হয়।
এর পরে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট মাত্রার কয়েক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফটার শক হিসেবে যেকোনো সময় দেশে বড় বা মাঝারি আকারের ভূমিকম্প হতে পারে, যেখানে অসংখ্য প্রাণহানি ও আবাসস্থল ধ্বংসের শঙ্কা রয়েছে। তাই ভূমিকম্পের আতঙ্ক এখনও কাটছে না।
ভূমিকম্পের অগ্রিম সতর্কবার্তা পাওয়া যায় না। কম্পন শুরু হলে তৎক্ষণাৎ মানুষ নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষা দিতে ব্যস্ত থাকবে। এই স্বল্প সময়ে পশুপালকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ সীমিত। তাই ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সময় গবাদিপশু যেন সুরক্ষিত থাকে এবং পরবর্তীতে তাদের পুনর্বাসনে করণীয় আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে। সেই সাথে যে ব্যাক্তি সার্বক্ষণিক পশুপাল রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত থাকে, তাকেও নিম্নোক্ত বিষয়ে ট্রেইনআপ করতে হবে। ভূমিকম্পের সময় গবাদিপশুর জীবনহানির প্রধান কারণ হলো পুরোনো বা দুর্বল কাঠামোর শেড ভেঙে পড়া। এছাড়াও, সংকীর্ণ স্থানে রাখা হলে আতঙ্কিত হয়ে হুড়োহুড়ি করে মারাত্মক আঘাত বা পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এজন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থলের ব্যবস্থা করা অতি জরুরি।
নতুন করে আবাসস্থল বানালে তা অবশ্যই ভূমিকম্প সহনশীল টেকসই শেড হতে হবে, যা ভারী কম্পনেও টিকে থাকতে পারে। শেড নির্মাণে স্থানীয় ইমারত বিধি (বিল্ডিং কোড) মেনে মজবুত ভিত্তি ও কলাম ব্যবহার করতে হবে। কাঠামোগত দুর্বলতা এড়াতে সিমেন্ট, কংক্রিট এবং শক্তিশালী ইস্পাতের ব্যবহার আবশ্যক। শেডের ভেতরে পশুর চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত প্রশস্ততা বজায় রাখা জরুরি, যাতে তারা কম্পনের সময় অতিরিক্ত আতঙ্কিত হয়ে একে অপরের ওপর আঘাত না করে। শেডের কাঠামো নিয়মিত পরিদর্শন করা এবং কোনো দুর্বলতা দেখা গেলে দ্রুত মেরামত করা আবশ্যক।
মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চারণভূমি বা খোলা জায়গা হলো সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তাই গোয়ালঘরের কাছে একটি চারণভূমি রাখতে হবে, অথবা দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিষ্কার এবং প্রশস্ত পথ আগে থেকেই চিহ্নিত রাখতে হবে। প্রাথমিক সংকেত পেলে বা কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশুপালকে যেন দ্রুত সেখানে সরিয়ে নেওয়া যায়। দুর্বল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বড় প্রাণীদের (গরু, মহিষ) বাইরে চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। চারণভূমির স্থান নির্বাচনে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এমন স্থান বেছে নিতে হবে যেখানে সহজে উপড়ে যাওয়া বিদেশি গাছ নেই, মাথার ওপরে বিদ্যুতের তার বা খুঁটি নেই, উড়ন্ত বা পড়ে যাওয়া আবর্জনার উৎস নেই এবং কাঁটাতারের বেড়া নেই।
সুরক্ষিত আশ্রয়স্থলের পাশাপাশি খামারিদের কিছু জরুরি প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। পশুর জন্য কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিনের পর্যাপ্ত খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি, শক্ত দড়ি এবং ছোটখাটো আঘাতের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম (ফার্স্ট এইড কিট) অবশ্যই মজুত রাখতে হবে। ভূমিকম্পের আগে গবাদিপশু বা অন্যান্য প্রাণী অস্বাভাবিক আচরণ করলে সেই সংকেতগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কম্পনের সময় পশুরা আতঙ্কিত হলে তাদের শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। ছোট জায়গা হলে শক্ত দড়ি বা শিকল দিয়ে নিরাপদ স্থানে বেঁধে রাখা যেতে পারে, যাতে তারা ছোটাছুটি করে নিজেদের ক্ষতি না করে। চারণভূমি হলে দড়ি খুলে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
ভূমিকম্প শেষে কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি আছে কি না, তা যাচাই করা। যদি কোনো পশু ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে, তবে দ্রুত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল বা প্রাণিসম্পদ বিভাগের সহায়তায় তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে। আহত পশুর যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। দীর্ঘ সময় খাদ্য ছাড়া থাকলে অল্প অল্প করে খাবার দিতে শুরু করা এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিমাণে ফিরিয়ে আনা, পশুকে বিশ্রাম এবং ঘুমের সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এখনও দেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরে বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু হারালে স্থানীয় অর্থনীতি এবং খামারিদের জীবনধারণের উপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই আগ থেকে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং উপরোক্ত পরামর্শগুলো পালন করলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

সোহাগ রাসিফ