বোয়াল মানসিকতায় আক্রান্ত পুরুষ!
১. ‘বসকে আকর্ষণে যে রঙে ঠোঁট রাঙাবে ন!’ ২. ‘গণধর্ষণ করে অর্ধনগ্ন মহিলাকে ঘোরানো হলো গ্রামে’ ৩. ‘একজন বিমানবালার গোপন স্বীকারোক্তি!’ ৪. ‘রগরগে যৌন দৃশ্যে শহিদ কাপুর ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়া।’
নারীকে অপদস্থ করতে এ রকম অসংখ্য সংবাদ আমাদের গণমাধ্যমে দেখি এখন। এত বেশি উদাহরণ আছে যে, কয়টার কথা বলব?
মিডিয়ায় নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নারীদের নিজেদেরও সবিশেষ ‘অবদান’ আছে। কারণ তারা নিজেরাও এ ব্যাপারে সচেতন না। অধিকার নিজেদেরই আদায় করে নিতে হয়। রবিঠাকুর যেমনটা বলেছেন, ‘আমারে তুমি করিবে ত্রাণ/ এ নহে মোর প্রার্থনা/ তরিতে পারি শকতি যেন রয়।’ পুরুষনির্ভরতা কাটিয়ে নারীকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য তার নিজেকেই সচেতন হতে হবে, জেগে উঠতে হবে। তাহলেই তার সার্থকতা। এটি তাকে কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না। কোনো কোটা সিস্টেমও না।
নারীর আজকের এই নিগ্রহ, এটা কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। একটু ভাষাচিত্রে চোখ রাখি।
নারী
রমণী, রামা, বামা, অবলা, মহিলা, স্ত্রী, মেয়ে, মেয়েমানুষ, ললনা, মানবী, মানবিকা, কামিনী, আওরত, জেনানা, যোষা, বালা, বনিতা, ভামিনী, শর্বরী, দুহিতা- আরো কত বাহারি নাম।
রমণী মানে? রমণ করিবার নিমিত্তে যারা। অবলা মানে শক্তিহীন। কামিনী শব্দে ‘কাম’-এর সরব উপস্থিতি। জেনানা মানে নিষিদ্ধ। দুহিতা অর্থ দোহনকারিণী! ভাবা যায়?! কতটা অপমানসূচক শব্দগুলো!
খেয়াল করে দেখুন, এসব নামে ইতিবাচকতা নেই। সব নেতিবাচক। কিন্তু কেন? কারা বানাল এসব শব্দবন্ধ? কবে থেকে চলে আসছে এসব? শুধু বাংলা শব্দেই নয়, ইংরেজিটাও দেখুন, Men শব্দটার আগে Wo ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ম্যানের সঙ্গে ঝুলে থাকাই যেন [Wo] নারীর নিয়তি, এটাই কি বোঝাতে চাচ্ছে কেউ?
কেন, ম্যান শব্দটার অর্থ নারী হতে পারত না? আর ওম্যান অর্থ পুরুষ। সমস্যা কী ছিল? নারীর অধিকারবঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস জানতে এই শব্দখেলার ইতিবৃত্তও জানা দরকার।
আর হ্যাঁ, এ নেতিবাচক শব্দগুলো কবুল করে নেওয়ার জন্য নারীরাও দায়ী। তারা পারফিউমের বিজ্ঞাপনে পুরুষের পঙ্গপাল হিসেবে হাজির হয়! ওদিকে গলা ফাটিয়ে অনেক ‘প্রগতিশীল নারী’ নারীবাদী হন। এর কাউন্টারে অবশ্যম্ভাবীরূপে চলে আসে পুরুষবাদ। নারীবাদ ধারণাটা এসে পুরুষবাদটাকে সমাজে অলিখিত একটা শক্ত ভিত্তি দিয়ে দেয়। কিন্তু এটা তো কোনো শান্তির কথা হলো না। নারী ও নর মিলেই তো পরিবার জগৎ সংসার দুনিয়া। তবে কেন এ বিভাজন?
একটু মনুষ্যত্ব নিয়ে চিন্তা করলেই মিলবে এর সমাধান। ‘সবাই আগে মানুষ হ। সহজ মানুষ। এটাই বড় পরিচয় হোক।’ দেখা যাবে, সব সমস্যার সমাধান। মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা জীব-আশরাফুল মাখলুকাত। আলাদা করে পুরুষ বা নারী নয়।
পুনশ্চঃ
বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘মানুষ’ শব্দের অর্থ খুঁজলে পাওয়া যাবে মানব, মনুষ্য, লোক, জন, নৃ, নর। ‘মানুষ’ শব্দের অর্থের মধ্যে ‘নর’ বিদ্যমান কিন্তু ‘নারী’ উধাও। একইভাবে ‘মানব’ শব্দের অর্থ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে মানুষ, মনুষ্য, নৃ, নর। এখানেও ‘নারী’ শব্দটি গুম হয়ে গেছে। কিন্তু ‘নর’ শব্দটি ঠিকই টিকে আছে।
আসলে আমরা যেই আঁধারে ছিলাম, সেই আঁধারেই রয়ে গেছি। এখনো অনেক পরিবারে ছেলেসন্তানের জন্য পুরোটা ডিম, আর মেয়েসন্তানের জন্য অর্ধেক ডিম বণ্টনের রেওয়াজ রয়ে গেছে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে ছোট ইউনিট পরিবারে যখন মেয়ে এবং ছেলে দুজনই ‘মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে, তখনই নারী দিবস অর্থপূর্ণ হবে। বেগম রোকেয়া শত বছর আগে এই অঞ্চলে যে আন্দোলনের সূচনা করে গিয়েছিলেন, তা সার্থক হবে।
এবং একটি গল্প
এক ভদ্রলোক গেছেন পাগলের ডাক্তারের কাছে। গিয়ে বলছেন, তাঁর স্ত্রীর ভীষণ সমস্যা।
ডাক্তার বললেন, সেটা কী ধরনের। খুলে বলেন সব।
-না মানে, আমার স্ত্রী নিজেকে সব সময় বোয়াল মাছ মনে করেন।
-হুমম, খুবই জটিল সমস্যা।
-হ্যাঁ, ভীষণ বিপদে আছি ডাক্তার সাব। কিছু একটা করেন।
-ওনাকে একবার চেম্বারে নিয়ে আসতে পারবেন?
ভদ্রলোক বললেন, তাকে নিয়েই ত এসেছি। বারান্দাতেই আছে।
-ওহহ। গুড গুড। ভেতরে নিয়ে আসুন।
ভদ্রলোক এরপর বারান্দার রেলিংয়ে ঝুলিয়ে রাখা একটি বোয়াল নিয়ে চেম্বারে প্রবেশ করলেন।
এই ভদ্রলোকের মতো আমাদের পুরুষদের অনেকেরই নারীদের বোয়াল মাছের মতো মনে হয়। মানসিক এই সমস্যাটা যে আমাদের নিজেদেরই মধ্যে সেট হয়ে আছে, এটা আমরা বুঝতে চাই না।
দিবস বিতর্ক
দিবসের দরকার আছে। এই গতিময় যুগে সবকিছু স্মৃতির ভেলায় ভেসে যাচ্ছে মুহূর্তে। সবকিছু ভুলে যাচ্ছে মানুষ। সকালে উঠতে হবে, ঘড়ি কিংবা মোবাইল ফোনে দিয়ে রাখছে অ্যালার্ম। আগে কিন্তু এই অ্যালার্ম সিস্টেম ছিল না। দিন বদলেছে। অ্যালার্ম হিসেবে দেখলেও এই যে নারী দিবস, বছরে একটিবারের জন্য, নারীও যে মানুষ; তা মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার আছে। তবে এতে গা-জ্বালা করবে অনেক পুরুষের; যারা নিয়মিত বৌ পেটায় আর গোলটেবিল বৈঠকে গিয়ে নারী অধিকার নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেয়।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

লুৎফর রহমান হিমেল