ব্যর্থতার গ্লানি পেছনে ফেলে স্বপ্নযাত্রা: ২০২৬-এ নতুন রূপে জার্মানি
সাবেক ইংলিশ ফুটবল তারকা ও ধারাভাষ্যকার গ্যারি লিনেকার বলেছিলেন, ‘ফুটবল এমন এক খেলা যেখানে ২২ জন ৯০ মিনিট ধরে একটা বলের পেছনে ছোটে, আর শেষটায় জেতে জার্মানি।’ কিন্তু গত দুটি বিশ্বকাপে এই চেনা জার্মানিকে বড্ড অচেনা লেগেছে।
২০১৮ সালে রাশিয়ার পর ২০২২ সালে কাতারের মরুঝড়েও গ্রুপ পর্বের খাঁচায় বন্দি হয়ে বিদায় নিয়েছিল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সেই হতাশার ধূসর ক্যানভাস মুছে, সাম্প্রতিক ব্যর্থতার গ্লানি পেছনে ফেলে এবার নতুন এক ভোরের অপেক্ষায় ‘ডাই মানশাফট’রা।
আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ মঞ্চে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে নিজেদের ২১তম আসরে মাঠে নামতে যাচ্ছে জার্মানি। লক্ষ্য একটাই— হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার আর ফুটবল সাম্রাজ্যে নিজেদের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন।
নাগেলসম্যানের নতুন রসায়ন
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের অমন অপ্রত্যাশিত পারফরম্যান্সের পর জার্মানির ডাগআউটে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। হান্সি ফ্লিক বিদায় নেওয়ার পর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব পান হুলিয়ান নাগেলসম্যান। দায়িত্ব পাওয়ার পর তার সামনে ছিল ঘরের মাঠে উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর কঠিন পরীক্ষা।
ঘরের মাঠের সেই টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বে দারুণ খেলেছিল স্বাগতিকরা। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে হারে সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে। তার আগেই অবশ্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পান ৩৮ বছর বয়সী এই নাগেলসম্যান। এখন জার্মানির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান কোচ তিনি। হফেনহাইম, আরবি লাইপজিগ কিংবা বায়ার্ন মিউনিখের ডাগআউটে নিজের কৌশলের যে প্রতিচ্ছবি তিনি দেখিয়েছিলেন, তা এখন জাতীয় দলেও স্পষ্ট।
তারুণ্যের শক্তিতে জমাট রক্ষণ
নাগেলসম্যানের অধীনে জার্মানি এখন বল দখলে রাখার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি কম নেয়। ফলে রক্ষণভাগ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরেট ও জমাটবদ্ধ। তবে আক্রমণের ধার কমেনি একটুও। পরিকল্পিত ও গতিময় আক্রমণ এখনও দলটির অন্যতম প্রধান শক্তি।
নাটকীয় বাছাইপর্ব পেরিয়ে উত্তর আমেরিকার টিকিট
২০২৫ সালের নভেম্বর। পূর্ব জার্মানির লাইপজিগের রেড বুল অ্যারেনায় যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন স্লোভাকিয়া, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গকে পেছনে ফেলে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষে থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলেছে জার্মানি।
তবে বাছাইপর্বের শুরুটা ছিল হতাশায় মোড়ানো। প্রথম ম্যাচে স্লোভাকিয়ার কাছে ২-০ ব্যবধানে হেরে গিয়েছিল জার্মানরা। তবে সেই হারেই দমে যাননি নাগেলসম্যানের শিষ্যরা। দলের একঝাঁক তারকা চোটে থাকলেও বাকিরা লড়ে গেছেন সমানতালে।
বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে গোল উৎসব করে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে তারা। পুরো বাছাইপর্বে ৬ ম্যাচের ৫টিতেই জয়, ১৬টি গোল করার বিপরীতে হজম করেছে মাত্র ৩টি!
২০২৬ বিশ্বকাপের রূঢ় বাস্তবতা: গ্রুপ ‘ম্যাচ ডে’
উত্তর আমেরিকার মাটিতে গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে লড়তে হবে তিনটি ভিন্ন মহাদেশীয় শক্তির বিরুদ্ধে। সূচি অনুযায়ী আগামী ১৪ জুন কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে জার্মানি। এরপর ২০ জুন দ্বিতীয় ম্যাচে জার্মানদের প্রতিপক্ষ আইভরি কোস্ট। ২৫ জুন ইকুয়েডরের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করবে নাগেলসম্যানের দল।
গৌরবের অতীত এবং কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত
জার্মান ফুটবলের ইতিহাস ঘাটলে চোখে পড়ে সোনালী ট্রফির ঝলকানি আর রূপকথার গল্প। ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং সর্বশেষ ২০১৪—চারবার বিশ্বসেরার মুকুট পরেছে তারা।
১. ১৯৫৪ সালের দ্য মিরাকল অব বার্ন
জার্মানির ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা সাফল্য এসেছে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে। ফাইনালে শক্তিশালী হাঙ্গেরির মুখোমুখি হওয়ার আগে গ্রুপ পর্বে তাদের কাছেই ৮-৩ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হয়েছিল জার্মানরা। ফাইনালেও প্রথম ১০ মিনিটে ২ গোল হজম করে বসে তারা। কিন্তু সেখান থেকেই হেলমুট রানের সেই ঐতিহাসিক জয়সূচক গোলে ৩-২ ব্যবধানের এক অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে এনেছিল সেপ হারবার্গারের দল।
২. ২০১৪ সালে বেলো হরিজন্তের সেই তাণ্ডব
জার্মানির বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় স্তম্ভ মিরোস্লাভ ক্লোসা। যিনি ১৬টি গোল করে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তার কীর্তিতেই জার্মানদের জন্য দারুণ এক টুর্নামেন্ট ছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলের ঘরের মাঠে তাদেরই ৭-১ ব্যবধানে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সেই ৩০ মিনিটের ৫ গোলের ঝড় ফুটবলপ্রেমীরা কোনোদিন ভুলবে না।
৩. সেভিলের রাত ও শতাব্দীর সেরা ম্যাচ
১৯৮২ সালের ‘নাইট অব সেভিল’ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও পেনাল্টি শুটআউটে জয় কিংবা ১৯৭০ সালের মেক্সিকোর ‘গেম অব দ্য সেঞ্চুরি’—যেখানে অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চ শেষে ইতালি ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল।
এসব ম্যাচ জার্মান ফুটবলকে এক লড়াকু জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে চিনিয়েছে। এছাড়া ২০০২ সালে সৌদি আরবকে ৮-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া ম্যাচটি এখনো বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড।
লক্ষ্য এবার পঞ্চমবারের বিশ্বজয়
২০০৬ সালের ঘরের মাঠের ‘সামার ফেয়ারিটেল’ বা গ্রীষ্মকালীন রূপকথায় জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল। কিন্তু বর্তমান ফুটবলের বাস্তবতা ভিন্ন। গত এক দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি ২৫টি ম্যাচ খেলার লোথার ম্যাথুসের যে অনন্য রেকর্ড ছিল, তাও কাতার বিশ্বকাপে ভেঙে দিয়েছেন লিওনেল মেসি।
খোলস বদলে যাওয়া এই নতুন জার্মানির সামনে এখন কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে তৈরি হওয়া নাগেলসম্যানের এই দলটির লক্ষ্য এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া রাজত্ব ফিরে পাওয়া।
জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার: মানুয়েল নয়্যার, অলিভার বাউমান, আলেকজান্ডার ন্যুবেল।
ডিফেন্ডার: অ্যান্টোনিও রুডিগার, জোনাথন টাহ, নিকো শ্লটারবেক, ভালডেমার আন্টন, ডেভিড রাউম, মালিক থিয়াও, নাথানিয়েল ব্রাউন।
মিডফিল্ডার: ফেলিক্স এনমেচা, পাসকাল গ্রস, ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস, জামাল মুসিয়ালা, লিয়ন গোরেৎসকা, অ্যাঞ্জেলো স্টিলার, লেনার্ট কার্ল, নাদিম আমিরি, ইয়োশুয়া কিমিখ, আলেকজান্ডার পাভলোভিচ, জেমি লেভেলিং।
ফরোয়ার্ড: কাই হাভার্টজ, ডেনিজ উনদাভ, লিরয় সানে, নিকোলাস ভোল্টেমাড, মাক্সিমিলিয়ান বায়ার।

ক্রীড়া প্রতিবেদক