রাজনৈতিক উত্তাপ পেরিয়ে বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ে চোখ ইরানের
মাঠের বাইরে যখন যুদ্ধংদেহী মনোভাব আর কূটনীতির চরম উত্তেজনা, মাঠের ভেতরের ৯০ মিনিট তখন কেবলই একটি খেলা থাকে না-- রূপ নেয় এক মনস্তাত্ত্বিক মহাযুদ্ধে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত দুই প্রতিদ্বন্দ্বী— যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আর সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই এবার পা রাখছে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল, ‘টিম মেল্লি’।
ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতা এবং স্নায়ুযুদ্ধের চরম চাপকে পেছনে ফেলে লস অ্যাঞ্জেলেস আর সিয়াটলের সবুজ ঘাসে যখন ইরানি ফুটবলাররা বুটজোড়া বাঁধবেন, তখন প্রতিটি ম্যাচ কেবল বিশ্বকাপের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হয়ে ওঠবে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর যুদ্ধে নিহত হাজারো মানুষের লড়াই।
এশিয়ান ফুটবলের তিনবারের চ্যম্পিয়ন ইরান। মহাদেশীয় স্তরে অপ্রতিরোধ্য হলেও, বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের অতীত রেকর্ড একেবারেই মলিন। এর আগে ছয়বার বিশ্বকাপ খেললেও কখনোই গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পার হতে পারেনি পারস্যের এই প্রতিনিধিরা। তবে এবার গল্পটা ভিন্ন হতে পারে।
বাছাইপর্বের চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স এবং একঝাঁক প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ তারকার ওপর ভর করে নিজেদের সপ্তম বিশ্বকাপ অভিযানে ইতিহাস বদলাতে মরিয়া ইরান। মাঠের বাইরের রাজনৈতিক বারুদকে পায়ে পিষে, বিশ্বমঞ্চে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বের টিকিট কেটে এক নতুন অধ্যায় রচনার লক্ষ্যেই এবার মাঠে নামবে ইরান।
ডাগআউটের ‘দ্য জেনারেল’ আমির ঘালেনোই
ইরান জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে এটি আমির ঘালেনোইয়ের দ্বিতীয় মেয়াদ। খেলোয়াড়ি জীবনে দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব এস্তেঘলাল এবং জাতীয় দলের মাঝমাঠ সামলানোর কারণে তিনি ‘দ্য জেনারেল’ বা সেনাপতি নামে পরিচিত ছিলেন। ঘরোয়া লিগে এস্তেঘলাল এবং সেপাহান উভয় ক্লাবের হয়ে দুবার করে লিগ শিরোপা জেতা ঘালেনোই ২০২৩ সালের মার্চ মাসে আবারও জাতীয় দলের দায়িত্বে ফেরেন। তার অধীনেই ইরান এএফসি এশিয়ান কাপের সেমিফাইনালে খেলে।
বাছাইপর্বে এশিয়ান জায়ান্ট ইরান
এশিয়ান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দুর্দান্ত সময় পার করেছে ইরান। এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় দল হিসেবে বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করে ইরান। বাছাইপর্বে নিজেদের প্রথম আট ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতে জয় পেয়েছে ইরান। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ ঐতিহাসিক আজাদি স্টেডিয়ামে উজবেকদের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্রয়ের ম্যাচে তারেমির জোড়া গোলের ওপর ভর করে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করে ইরান। পুরো বাছাইপর্বের ১৬ ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে হেরেছে ইরান।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের ম্যাচ সূচি
উত্তর আমেরিকার মূল মঞ্চে ইরানকে লড়তে হবে ইউরোপ, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দলগুলোর বিপক্ষে। আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরুর করবে ইরান। ২১ জুন একই স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের শক্তিশালী দেশ বেলজিয়াম। ২৬ জুন সিয়াটল স্টেডিয়ামে আফ্রিকার দেশ মিসরের বিপক্ষে খেলবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস
আমির ঘালেনোইয়ের এই স্কোয়াডটি অভিজ্ঞতায় ভরপুর, যেখানে তারকা ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমিসহ প্রায় এক ডজন খেলোয়াড় রয়েছেন যাদের দেশের হয়ে ৫০ বা তার বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে এই স্কোয়াডে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা সরদার আজমুন, বেলজিয়ান ক্লাবে খেলা উইঙ্গার আল্লাহইয়ার সায়াদমানেস কিংবা তরুণ মিডফিল্ডার মোহাম্মদ জাভাদ হোসেইননেজাদের জায়গা হয়নি।
২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি সেভ করা বিখ্যাত গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দই থাকছেন পোস্টের নিচে প্রথম পছন্দ। বড় ম্যাচের স্নায়ুচাপ সামলানোর ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা দলের বড় সম্পদ।
তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপ আসরে (২০১৪, ২০১৮, ২০২২) অংশ নেওয়া অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার অধিনায়ক এহসান হাজসাফি এই দলের মেরুদণ্ড। লেফট উইঙ্গার, লেফট-ব্যাক এবং সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার—এই তিনটি পজিশনেই সমান দক্ষ হাজসাফি দেশের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। তার সঙ্গে কানায়ানি ও মিলাদ মোহাম্মাদির রক্ষণভাগ প্রতিপক্ষের জন্য ভাঙা বেশ কঠিন হবে।
ইন্টার মিলানের তারকা স্ট্রাইকার মেহেদি তারেমি বর্তমান ইরানের আক্রমণের মূল সমীকরণ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে মাত্র ১১ জন ইরানি খেলোয়াড় গোল করতে পেরেছেন এবং তাদের মধ্যে কেবল তিনিই একাধিক গোল (কাতার ২০২২-এ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২টি গোল) করার কীর্তি গড়েছেন। মাঝমাঠে সামান ঘোদ্দোস ও আলিরেজা জাহানবাখশের অভিজ্ঞতা এবং রুজবেহ চেশমির ফিজিক্যালিটি তারেমিকে আক্রমণে দারুণ সহায়তা করবে।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
তারেমির বক্সে পজিশনিং ও ক্লিনিক্যাল পোচিং দক্ষতা এশিয়ান ফুটবলের অন্যতম সেরা অস্ত্র। অন্যদিকে, এই স্কোয়াডের বড় শক্তির জায়গা হলো ফুটবলারদের অভিজ্ঞতা। স্কোয়াডের বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই পঞ্চাশের অধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এছাড়াও বিগত বিশ্বকাপগুলোতে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে অনেকের। যা বড় মঞ্চের স্নায়ুচাপ সামলাতে সাহায্য করবে।
তবে ইরানের এই স্কোয়াডে কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা আজমুন স্কোয়াডে না থাকায় তারেমির ওপর আক্রমণের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য মার্কিং করা সহজ করে তুলতে পারে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
ইরানের বিশ্বকাপ ইতিহাস শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের বরাদ্দকৃত একমাত্র টিকিটটি নিজেদের করে নেওয়ার মাধ্যমে। আজাদি স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গাফুর জাহানীর একমাত্র জয়সূচক গোলের ওপর ভর করে তারা মূল পর্ব নিশ্চিত করেছিল। সেই আসরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের ম্যাচে প্রয়াত ইরাজ দানাইফার্দ গোল করে বিশ্বমঞ্চে ইরানের প্রথম গোলদাতা হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সেরা বিশ্বকাপ ও বড় জয় : ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আল রাইয়ানের মাঠে ওয়েলসের বিপক্ষে পাওয়া ২-০ ব্যবধানের জয়টিই এখন পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে ইরানের সবচেয়ে বড় জয়। ম্যাচের ৯৮তম মিনিটে রুজবে চেশমির ২৫ গজ দূর থেকে করা বুলেট গতির গোল এবং ১০১তম মিনিটে রামিন রেজাইয়ানের চিপ শট গ্যালারিতে থাকা হাজারো ইরানি সমর্থককে উল্লাসে ভাসিয়েছিল।
সবচেয়ে স্মরণীয় ঐতিহাসিক মুহূর্ত : মাঠের বাইরের রাজনৈতিক বৈরিতার পটভূমিতে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে লিওনের মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হয়েছিল ইরান। ম্যাচ শুরুর আগে শান্তির প্রতীক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের সাদা ফুলের তোড়া উপহার দেয় ইরানিরা। সেই ম্যাচে হামিদ এস্তিলির চমৎকার লুপড হেড এবং মেহেদি মাহদাভিকিয়ার কাউন্টার-অ্যাটাক গোলের ওপর ভর করে ইরান ২-১ বগোলের এক ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছিল।
২০১৮ সালের সেই ‘১ পয়েন্ট’ ট্র্যাজেডি : রাশিয়ার মাটিতে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোর কঠিন গ্রুপে পড়েও দুর্দান্ত লড়েছিল ইরান। মরক্কোকে ১-০ গোলে হারানোর পর শেষ ম্যাচে পর্তুগালের সঙ্গে ১-১ ড্র করে তারা। যেখানে গোলরক্ষক বেইরানভান্দ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি শট সেভ করেছিলেন। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে মেহেদি তারেমির শটটি জালের বাইরের অংশে লাগায় মাত্র ১ পয়েন্টের জন্য সেবার নকআউটে ওঠা হয়নি ইরানের।
২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের লক্ষ্য
আমির ঘালেনোইয়ের এই অভিজ্ঞ ও লড়াকু ইরান দলটি এবার মাঠের বাইরের যুদ্ধ এবং মাঠের ভেতরের ফুটবলীয় লড়াই—উভয় মঞ্চেই ইতিহাস বদলাতে বদ্ধপরিকর। মেহেদি তারেমির গোল করার ক্ষুধা আর হাজিসাফির মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর ক্ষমতার ওপর ভর করে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাটিতে ইরান এবার ইতিহাস বদলাতে চায়।
ইরানের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : আলিরেজা বেইরানভান্দ, সৈয়দ হোসেইন হোসেইনি, পায়াম নিয়াজমান্দ।
ডিফেন্ডার : দানিয়াল এইরি, এহসান হাজসাফি, সালেহ হার্দানি, হোসেইন কানায়ানি, শোজা খালিলজাদেহ, মিলাদ মোহাম্মাদি, আলি নেমাতি, রামিন রেজায়িয়ান।
মিডফিল্ডার : রুজবেহ চেশমি, সাইদ এজাতোলাহি, মেহদি ঘায়েদি, সামান ঘোদ্দোস, মোহাম্মদ ঘোরবানি, আলিরেজা জাহানবাখশ, মোহাম্মদ মোহেবি, আমির মোহাম্মদ রাজ্জাঘিনিয়া, মেহদি তোরাবি, আরিয়া ইউসেফি।
ফরোয়ার্ড : আলি আলিপুর, ডেনিস দারগাহি, আমিরহোসেইন হোসেইনজাদেহ, মেহদি তারেমি, শাহরিয়ার মোঘানলু।

ক্রীড়া প্রতিবেদক