জেট ফুয়েল ও সারচার্জের চাপ: দেশীয় এয়ারলাইন্স বাঁচাতে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন
দীর্ঘ প্রায় ২৯ বছর ধরে এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশনস) মো. কামরুল ইসলাম। বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বর্তমান চিত্র, পরিচালন ব্যয় ও চ্যালেঞ্জ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নানা আলোচনা উঠে এসেছে এনটিভি অনলাইনের এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে। অ্যারোনটিক্যাল চার্জ, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য, একক রানওয়ের সীমাবদ্ধতা এবং থার্ড টার্মিনাল কেন্দ্রিক ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন শাহজালাল রোহান।
এনটিভি অনলাইন: আপনার এভিয়েশন খাতের অভিজ্ঞতা এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের সঙ্গে আপনার যাত্রা সম্পর্কে কিছু বলুন।
মো. কামরুল ইসলাম: প্রায় দীর্ঘ ২৯ বছর যাবৎ আমি এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি। বাংলাদেশের স্বীকৃত যেসব প্রাইভেট এয়ারলাইন্স শুরু থেকে কাজ করেছে, সেগুলোর সাথেই আমার সম্পৃক্ততা ছিল। বর্তমানে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সে প্রায় ১১ বছর ধরে জনসংযোগ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
এনটিভি অনলাইন: দীর্ঘ এই পথচলায় বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্পের সার্বিক পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জগুলোকে কীভাবে দেখছেন?
মো. কামরুল ইসলাম: এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ কিছু সমস্যা যেমন ছিল, তেমনি সমাধানের রাস্তাও সরকার ও রেগুলেটরি অথরিটি দেখিয়ে দিয়েছে। সে কারণেই আজকে দেশের এভিয়েশন খাত ৫৫ বছরে এসে পৌঁছাতে পেরেছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স গত ১২ বছর ধরে অপারেশনে আছে। শুরুতে ডোমেস্টিক ফ্লাইট দিয়ে শুরু করলেও দুই বছরের মাথায় আমরা আন্তর্জাতিক রুটে কার্যক্রম শুরু করি। বর্তমানে ১০টি দেশের ১৪টি গন্তব্যে এবং দেশের ভেতরের প্রায় প্রতিটি বিমানবন্দরে আমরা ফ্লাইট পরিচালনা করছি।
এনটিভি অনলাইন: দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বা পরিচালন ব্যয়ের চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
মো. কামরুল ইসলাম: আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা অ্যারোনটিক্যাল (ল্যান্ডিং, পার্কিং, সিকিউরিটি, রুট নেভিগেশন) ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের এই চার্জ অনেক বেশি পে করতে হয়। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি যেন এগুলো যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে আনা হয়। বিগত দিনে দেশের ৮ থেকে ৯টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল অতিরিক্ত অ্যারোনটিক্যাল চার্জ এবং জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য। যেকোনো রুটে মোট অপারেশন খরচের প্রায় ৪০% এর বেশি চলে যায় জেট ফুয়েলে, যা কখনো কখনো ৫০%, ১০০% বা ২০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এয়ারলাইন্সগুলোর স্থায়িত্বের জন্য রেগুলেটরি অথরিটিসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তরের ইতিবাচক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
এনটিভি অনলাইন: সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত বা অবকাঠামোগত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে কি?
মো. কামরুল ইসলাম: ২০২২ সালের আগে আমাদের নিজস্ব হ্যাঙ্গার ফ্যাসিলিটি ছিল না, যা এয়ারক্রাফটের সেফটি ও মেইনটেন্যান্সের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ২০২২ সালের পর সরকার ও সিভিল এভিয়েশন অথরিটি আমাদের সেই সুবিধা প্রদান করেছে। এ ছাড়া, গত ২৯ বছর ধরে আমাদের সারচার্জ মাসিক ৬% (বার্ষিক প্রায় ৭২%) হারে দিতে হতো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে তা কমিয়ে ১৪.২৫% নির্ধারণ করেছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সমপর্যায়ের।
এনটিভি অনলাইন: দেশীয় এভিয়েশন খাতকে আরও গতিশীল করতে সরকারের কাছে আপনার চূড়ান্ত প্রত্যাশা কী?
মো. কামরুল ইসলাম: আন্তর্জাতিক বা বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা/ভর্তুকি দেওয়া হলে দেশীয় এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।
এনটিভি অনলাইন: ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের শুরুর দিকের যাত্রা এবং বহরে এয়ারক্রাফট সংযোজন সম্পর্কে কিছু বলুন।
মো. কামরুল ইসলাম: এটিআর ৭২-৬০০ দিয়ে ডোমেস্টিক রুটে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। দুই বছর পর বোয়িং ৭৩৭-৮০০ যুক্ত করে আমরা আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু করি। মূলত প্রবাসী অধ্যুষিত গন্তব্য যেমন-মাসকাট, দোহা, দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি, কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আমাদের বহরে ৯টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়ারক্রাফট রয়েছে।
এনটিভি অনলাইন: আপনাদের বহর সম্প্রসারণ এবং নতুন রুট নিয়ে বর্তমান পরিকল্পনা কী?
মো. কামরুল ইসলাম: আমাদের বহরে আরও ২১টি বোয়িং ৭৩৭-৮ এবং বোয়িং ৭৩৭-৮০০ নেক্সট জেনারেশন এয়ারক্রাফট যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো দিয়ে কাঠমান্ডু, কলম্বো, বাহরাইন, কুয়েত, পেনাং ও জোহর বারু রুটে নতুন ফ্লাইট এবং বিদ্যমান রুটগুলোতে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো হবে। আমাদের বহরে ৪৩৬ সিট ক্যাপাসিটির এয়ারবাস এ ৩৩০-৩০০ রয়েছে, যা দিয়ে জেদ্দা, রিয়াদ ও কুয়ালালামপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে বহরকে আরও সুসংগঠিত করতে বোয়িংয়ের পাশাপাশি বাড়তি এয়ারবাস যুক্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এনটিভি অনলাইন: ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ নিয়ে ইউএস-বাংলার দূরদর্শী লক্ষ্য কী?
মো. কামরুল ইসলাম: ২০২৮ সাল নাগাদ লন্ডন ও রোমে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অচিরেই মদিনা ও দাম্মাম রুটেও সরাসরি ফ্লাইট চালু করা হবে। নির্দিষ্ট কোনো ফ্লাইটের ওপর নির্ভর না করে ইউএস-বাংলা সবসময় মাল্টি-অপশন নীতিতে বিশ্বাসী।
এনটিভি অনলাইন: ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের অন-টাইম ফ্লাইট পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক রুটের অভিজ্ঞতা কেমন?
মো. কামরুল ইসলাম: ২০১৬ সালের ১৫ই মে ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের ৯০ শতাংশের বেশি ফ্লাইট অন-টাইমে পরিচালিত হয়েছে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম- ‘লাগেজের জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে না, লাগেজ আপনার জন্য অপেক্ষা করবে।’ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ল্যান্ড করার ১৫ মিনিটের মধ্যে প্রথম লাগেজ বেল্টে পৌঁছে দেওয়ার সংস্কৃতি আমরা চালু করেছি, যা এখন অন্য এয়ারলাইন্সগুলোও অনুসরণ করছে।
এনটিভি অনলাইন: এয়ারক্রাফটের মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় ইউএস-বাংলার নীতি কী?
মো. কামরুল ইসলাম: ইউএস-বাংলাই প্রথম ব্র্যান্ড-নিউ এয়ারক্রাফট দিয়ে ডোমেস্টিক কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের বহরে থাকা ২৫টি এয়ারক্রাফটের গড় বয়স ১০ বছরেরও কম, যা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এনটিভি অনলাইন: আন্তর্জাতিক রুটে ইউএস-বাংলার উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো কী কী?
মো. কামরুল ইসলাম: চীন (গুয়াংজু রুট): ২০১৮ সালের ২৬শে এপ্রিল থেকে চীনের কঠোর নিয়মকানুন পূরণ করে প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশী ক্যারিয়ার হিসেবে গুয়াংজু রুটে একটানা ৮ বছর ধরে সফলভাবে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। ভারত (চেন্নাই রুট): প্রথম বাংলাদেশী এয়ারলাইন্স হিসেবে ঢাকা-চেন্নাই সরাসরি ফ্লাইট চালু করে কম খরচে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার পথ সুগম করা হয়েছে। মালদ্বীপ (মালে রুট): ২০২১ সালের ১৯শে নভেম্বর থেকে মালে রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা হয়, যার মাধ্যমে মালদ্বীপে থাকা প্রায় দেড় লাখ প্রবাসী মাত্র ৪ ঘণ্টার মধ্যে যাতায়াতের সুবিধা পাচ্ছেন।
বিমানবন্দর অবকাঠামো ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
এনটিভি অনলাইন: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রজেক্টের বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে দেখছেন?
মো. কামরুল ইসলাম: শাহজালাল বিমানবন্দরের চাপ কমাতে থার্ড টার্মিনাল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প ছিল। এর ভেতরের সুযোগ-সুবিধা আগের দুটি টার্মিনালের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রায় তিন বছর আগে ‘সফট ওপেনিং’ হওয়া সত্ত্বেও অবকাঠামোগত পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির অভাবে এয়ারলাইন্স বা যাত্রী-কেউই এখনও এর সুফল পাচ্ছে না।
এনটিভি অনলাইন: থার্ড টার্মিনাল চালু হলেও ফ্লাইট পরিচালনার প্রধান চ্যালেঞ্জটি কী?
মো. কামরুল ইসলাম: মূল চ্যালেঞ্জ রানওয়ে। বিমানবন্দরে মাত্র একটি একক রানওয়ে থাকায় টেক-অফ ও ল্যান্ডিং জটের কারণে ২০-৩০ মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য ফ্লাইটগুলোতেও অতিরিক্ত ২০-২৫ মিনিট বিলম্ব হচ্ছে। পৃথক রানওয়ে সুবিধা না বাড়ালে থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফ্লাইট পরিচালনা জটিলতায় পড়বে।
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের চাহিদা মেটাতে সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
মো. কামরুল ইসলাম: সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা ও এয়ারপোর্টের সুবিধাদি প্রপার ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনলে সাময়িক স্বস্তি মিলবে। তবে আগামী ৫ বছরের মধ্যে থার্ড টার্মিনালের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়ে গেলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ এবং প্রায় দেড় কোটি প্রবাসীর নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোকে সঠিকভাবে সেবা দিতে হলে ভবিষ্যতে হয়তো নতুন একটি বিমানবন্দরের বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি ও আকাশপথকে মসৃণ রাখতে সরকারের এখনই দূরদর্শী ও আগাম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

শাহজালাল রোহান